সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক যেন ভয়ঙ্কর মৃত্যুফাঁদ

বেপরোয়া গতি ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিংয়ে বাড়ছে দুর্ঘটনা

Printed Edition

এমজেএইচ জামিল সিলেট ব্যুরো

সড়কজুড়ে গর্ত, কোথাও উঠে গেছে পিচ, আবার কোথাও সংস্কারকাজের কারণে সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে চলাচলের পথ। এর সাথে চালকদের বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং আর সড়ক দখল করে গড়ে ওঠা বাজার-সব মিলিয়ে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের সিলেট অংশ যেন পরিণত হয়েছে এক ভয়ঙ্কর মৃত্যুফাঁদে।

হবিগঞ্জের মাধবপুর থেকে সিলেট পর্যন্ত প্রায় ১৩০ কিলোমিটার মহাসড়কে গত ১৫ দিনেই পৃথক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে অন্তত ১৯ জনের। এর মধ্যে একই পরিবারের মা-বাবা ও শিশুকন্যাসহ একসাথে চারজনের মৃত্যুর ঘটনাও রয়েছে। একের পর এক দুর্ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে- আর কত প্রাণ গেলে নিরাপদ হবে এই মহাসড়ক?

জানা গেছে, সবশেষ শনিবার (২২ আগস্ট) দুপুরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ওসমানীনগর উপজেলার ব্রাহ্মণগ্রাম এলাকায় তেলবাহী ট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে একই পরিবারের মা-বাবা ও মেয়েসহ চারজন নিহত হন। এর মাত্র কয়েক দিন আগে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে বাস-পিকআপের সংঘর্ষে তিনজন এবং মাধবপুরে ত্রিমুখী সংঘর্ষে দু’জন নিহত হন।

তবে এসব দুর্ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। গত ৭ আগস্ট ওসমানীনগরের কাশিকাপন এলাকায় দু’টি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান ১০ জন। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের এই অংশের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৫ দিনে হবিগঞ্জের মাধবপুর থেকে সিলেট পর্যন্ত মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে একাধিক ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় অন্তত ১৯ জন নিহত হয়েছেন। বেশির ভাগ দুর্ঘটনাই ঘটেছে মুখোমুখি সংঘর্ষ, অতিরিক্ত গতি কিংবা বিপজ্জনকভাবে ওভারটেকিংয়ের সময়।

১০ আগস্ট সকাল ৬টা ১০ মিনিটে নবীগঞ্জ উপজেলার রুকুনপুর বাজারের দক্ষিণ পাশে বড়চর এলাকায় বাস ও পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজন নিহত হন। তাদের একজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। পরে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরো দু’জন। এর আগের দিন ৯ আগস্ট মাধবপুর উপজেলার বেজুরা এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে তিনটি যানবাহনের ত্রিমুখী সংঘর্ষে দু’জন নিহত হন। আর ৭ আগস্ট ওসমানীনগরের কাশিকাপন এলাকায় দু’টি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হন ১০ জন। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে আরো প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ দিন ধরে সংস্কার ও উন্নয়নকাজ চললেও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সিলেট অংশের বিভিন্ন জায়গার অবস্থা এখন নাজুক। কোথাও বড় বড় গর্ত, কোথাও ভাঙা পিচ, আবার কোথাও বৃষ্টির পানি জমে সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ বোঝার উপায় থাকে না। বর্ষায় টানা বৃষ্টিতে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে।

চালক ও যাত্রীদের অভিযোগ, সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে এক দিকে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে, অন্য দিকে গর্ত এড়িয়ে চলতে গিয়ে অনেক সময় যানবাহন পাশের লেনে চলে যাচ্ছে। এতে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ছে।

জানা গেছে, সড়কের অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে চালকদের বেপরোয়া গতি ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সিলেট অঞ্চলে আসার সময় অনেক চালক ক্লান্ত হয়ে পড়েন। আবার দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়ায় তারা ঝুঁকি নিয়ে ওভারটেক করেন। ফলে মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ পরিস্থিতি। এর সাথে মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে সড়কের ওপর বসা বাজার, অবৈধ পার্কিং, ফুটপাথ ও সড়ক দখল করে ব্যবসা পরিচালনার কারণে যান চলাচলে তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু গত ১৫ দিনের হিসাবই নয়, দীর্ঘ সময়ের পরিসংখ্যানও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কসহ সিলেট অঞ্চলের মহাসড়কগুলোর ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে।

শেরপুর হাইওয়ে থানা-পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে সিলেটের মহাসড়কগুলোতে ১৮৫টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ১১৭ জন নিহত এবং ১০৯ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।

অন্য দিকে গত সাত মাসে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সিলেট অংশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৫০ জনের প্রাণহানি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

শেরপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনিসুর রহমান বলেন, চালকদের বেপরোয়া গতি ও বিপজ্জনক ওভারটেকিংয়ের কারণে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ভয়াবহ দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে। শেরপুর থেকে সিলেট পর্যন্ত মহাসড়কের কয়েকটি এলাকা দুর্ঘটনাপ্রবণ হয়ে উঠেছে। তিনি আরো বলেন, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ছয় লেনের কাজসম্পন্ন হলে দুর্ঘটনা অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জানা গেছে, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার কাজ শেষ হলে সড়কের সক্ষমতা ও নিরাপত্তা বাড়বে- এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামত, নির্মাণকাজে নিরাপদ ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক ও স্থানগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, সড়ক দখলমুক্ত রাখা, অবৈধ পার্কিং বন্ধ এবং বেপরোয়া গতি ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ এখন জরুরি।