নতুন কমিশনের অধীনে প্রথম দিনেই রেকর্ড লেনদেন

মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় চেয়ারম্যানের ছেড়ে আসা গ্রুপের ২ কোম্পানি

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুনর্গঠনের পর প্রথম কার্যদিবস ছিল গতকাল। আর এদিনই লেনদেনে রেকর্ড গড়েছে দেশের দুই পুঁজিবাজার। গতকাল রোববার ঢাকা শেয়ারবাজারে এক হাজার ৫২৯ কোটি টাকা লেনদেন হয় যা ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তৃতীয় সর্বোচ্চ। ওই বছর ৮ আগস্ট এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা ও ১১ আগস্ট ডিএসইর লেনদেন দুই হাজার কোটি টাকার ঘর অতিক্রম করে। পরবর্তীতে লেনদেনের এ ধারাবাহিকতা আর বজায় থাকেনি। সে হিসেবে গতকাল পট পরিবর্তনের পর তৃতীয় সর্বোচ্চ লেনদেন হলো।

গতকাল শুরুতেই দুই পুঁজিবাজারে সূচক ও লেনদেনের বড় ধরনের উন্নতি হতে দেখা যায়। ঢাকা শেয়ারবাজারে ৫ হাজার ৪৭৫ পয়েন্ট থেকে সকাল সাড়ে ১১টায় পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৫৬৩ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে সূচকটির উন্নতি রেকর্ড করা হয় ৮০ পয়েন্টের বেশি। তবে বেশ কয়েকবার বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হওয়ায় বৃদ্ধি পাওয়া সূচকের দিনশেষে তার অর্ধেকই টিকে থাকে। ৫ হাজার ৫১৬ দশমিক ১৫ পয়েন্টেই স্থির হয় ডিএসইএক্স সূচক। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ১৮ দশমিক ৮৬ ও ৬ দশমিক ৫৬ পয়েন্ট।

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১৩১ দশমিক ৪১ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। ১৫ হাজার ২৬৮ দশমিক ০২ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিন স্থির হয় ১৫ হাজার ৩৯৯ দশমিক ৪৩ পয়েন্টে। এ সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ১২৯ দশমিক ৮৮ ও ৮৩ দশমিক ৪৯ পয়েন্ট।

ঢাকা শেয়ারবাজার গতকাল এক হাজার ৫২৯ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ১৭৮ কোটি টাকা বেশি। গত বৃহস্পতিবার ডিএসইর লেনদেন ছিল এক হাজার ৩৫১ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেন হয় ৫৭ কোটি টাকা যা আগের দিন থেকে ৩০ কোটি টাকা বেশি। বৃহস্পতিবার সিএসইর লেনদেন ছিল ২৭ কোটি টাকা।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল নতুন কমিশন পুনর্গঠন। এটি বাস্তবায়িত হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উৎসাহ সৃষ্টি হয়েছে যার প্রতিফলন ঘটেছে দুই পুঁজিবাজারের লেনদেন ও সূচকের। তবে তারা মনে করেন, এই ধারাবাহিকতা তখনই টিকে থাকবে যখন বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক আচরণ ধরে রাখার চেষ্টা করবে। বিনিয়োগকে ঝুঁকিমুক্ত রাখতে এ মুহূর্তে সবার উচিত যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেয়া। শুধুমাত্র ভালো তথা মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগের মাধ্যমেই তা সম্ভব।

এদিকে গতকালের পুঁজিবাজার আচরণ বিশ্লেষণে দেখা যায় বরাবরের মতো দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির কাছে মার খাচ্ছে ভালো ও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলো। বাজারে এ ধরনের কোম্পানির সংখ্যা খুবই কম থাকার পরও লেনদেনে ভালো কোম্পানিগুলোর উপস্থিতি দেখা যায়নি। তবে মূল্যবৃদ্ধিতে কিছটা ব্যতিক্রমি চিত্র দেখা যায়। দীর্ঘদিন বিনিয়োগকারীদের সাড়া না পেলেও গতকাল ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় উঠে আসে বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যানের ছেড়ে আসা ক্রাউন গ্রুপের দুই সিমেন্ট কোম্পানি ক্রাউন সিমেন্ট ও প্রিমিয়ার সিমেন্ট। অথচ বাজারে অপেক্ষাকৃত অনেক ভালো কোম্পানি থাকলেও এমন ভালো দিনেও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কাড়তে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের কোনো ভালো কোম্পানির দাম বাড়েনি। অন্যান্য খাতের যেসব কোম্পানি ভালো লভ্যাংশ প্রদানের ইতিহাস রয়েছে এগুলোও যথার্থ সাড়া পায়নি। উপরন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব কোম্পানি দরপতনের শিকার হয়েছে যা পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক আচরণের সাথে যায় না।

বাজার আচরণের এ দিকটি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ খুবই ক্ষুব্ধ। তারা মনে করেন, বিনিয়োগকারীদের একটি ক্ষুদ্র অংশ এখনো নিজেদের সক্ষমতা ব্যবহার করে দুর্বল ও স্বল্প মূলধনের কোম্পানি নিয়ে খেলায় মেতে উঠেছে। পুঁজিবাজারকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সর্বপ্রথম এ কারসাজি বন্ধ করতে হবে। তা না হলে এখানে দেশী বা বিদেশী ভালো কোনো বিনিয়োগকারী বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাবে না। আর এভাবে চলতে থাকলে বর্তমান অর্থমন্ত্রীর ভাষায় সবাই এটাকে ক্যাসিনো হিসেবেই ধরে নেবে।

গতকাল ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসা দশ কোম্পানির ৪টিই ‘বি’ ক্যাটাগরির। এদের মধ্যে শীর্ষে ছিল ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস। কোম্পানিটি গত অর্থবছরে দশমিক ৩৫ শতাংশ তথা শেয়ারপ্রতি ৩৫ পয়সা লভ্যাংশ দিয়ে কোনোভাবে ‘বি’ গ্রুপে টিকে আছে। ৭ জুন কোম্পানিটির মূল্য আয় অনুপাত ছিল এক হাজার ৬০৬ যা পুঁজিবাজারের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি নির্দেশ করে। যেখানে বিভিন্ন কোম্পানি এরই মধ্যে অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিক প্রকাশ করেছে সেখানে ডমিনেজ স্টিল গত বছরের নভেম্বরে প্রথম প্রান্তিক প্রকাশ করেছে যেখানে শেয়ারপ্রতি লোকসান দেখানো হয়েছে ২ পয়সা। অথচ গত একটি বছর ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধিতে ৯ টাকা ৮০ পয়সা থেকে গতকাল ৮০ টাকা ৪০ পয়সার পৌছেছে দর। গতকাল ৩৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকায় ৫০ লাখ ৭৫ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় কোম্পানিটির। ২৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকায় ১ কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইপিডিসি ছিল দ্বিতীয় স্থানে। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে জেনেক্স ইনফোসিস লিঃ, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স, জিকিউ বলপেন, আনোয়ার গ্যালভেনাইজিং, নাভানা ফার্মা, মীর আকতার হোসাইন, লাভেলো আইসক্রিম ও অগ্নি সিস্টেমস।

লেনদেনের মতো ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ দশ কোম্পানির চারটিই র্ছিল ‘বি’ ক্যাটাগরির। দিনের মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষে ছিল সিমেন্ট খাতের ক্রাউন সিমেন্ট। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ১০ শতাংশ। মূল্যবৃদ্ধিতে দ্বিতীয় স্থানে ছিল ‘বি’ ক্যাটাগরিতে লেনদেন হওয়া সোনারগাঁও টেক্সটাইল। ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স, আইপিডিসি, মার্কেন্টাইল ইসলামি ইন্স্যুরেন্স, প্রিমিয়ার সিমেন্ট, সিলকো ফার্মা, দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স ও নাহি অ্যালুমিনিয়াম কম্পোজিট।