টেলিকম খাতের সংস্কারে ইতিবাচক নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতের উন্নয়নে অন্তত ১০টি বিষয়ে বিশেষভাবে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে মোবাইল সিমকার্ডের ওপর কর প্রত্যাহার, নেটওয়ার্ক সেবায় উৎসে কর হ্রাস, মোবাইল ফোন উৎপাদনে কাঁচামাল আমদানিতে কর ছাড়সহ নানা প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। তবে টেলিকম খাতে এসব কর ছাড় ও প্রণোদনা দিলেও তাদের সেবায় কি কোনো উন্নতি আসবে নাকি আগের মতোই অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে গ্রাহক ভোগান্তি থেকে যাবে- এমনটা সংশয় প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা। একই সাথে কর ছাড় ও প্রণোদনা দেয়ার পরও কি ডেটা আসলেই সস্তা ও সহজলভ্য হচ্ছে নাকি মোবাইল কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের চোখ ফাঁকি দিয়ে হিডেন চার্জের খেলায় মত্ত থাকবে- এমন প্রশ্নও দেখা দিয়েছে গ্রাহক ও খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মধ্যে।
বাজেট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সাধারণ মানুষের কাছে মোবাইল সেবা সহজলভ্য করতে প্রতিটি মোবাইল সিমের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকা হারে সুনির্দিষ্ট কর সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারি হিসেব বলছে, এই কর প্রত্যাহারের ফলে আগামী অর্থবছরে প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব হ্রাস পাবে। মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা খাতে উৎসে কর কাটার হার ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এই পদক্ষেপ অপারেটরদের আর্থিক চাপ কিছুটা কমবে এবং নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও সেবার মান উন্নয়নে সহায়ক হবে। মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদনে ব্যবহৃত ২২ ধরনের কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ ও ২ শতাংশ অগ্রিম কর কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সাথে দেশে মোবাইল ফোন উৎপাদনের কাঁচামাল ও উপকরণ আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ক ও কর অব্যাহতি সুবিধা ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বর্ধিত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
গ্রাহকরা বলছেন, বাজেটে যে কর ছাড় ও প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে তাতে মূলত ব্যবসায়ীদের সুবিধা হয়েছে। গ্রাহক পর্যায়ে এর সুফল একেবারে কম। গ্রাহকরা একটি সিম একবারে ক্রয় করে। কিন্তু ওই সিমটি পরিচালনা করতে গেলে তাকে মোবাইল কিনতে হয়, আবার সিম সক্রিয় রাখতে হলে রিচার্জ করতে হয়, অথবা কোনো প্যাকেজ ক্রয় করে সক্রিয় রাখতে হয়। প্যাকেজের মধ্যে ডেটা ও মিনিট একসাথে থাকে আবার পৃথকভাবে ক্রয় করার সুযোগ রয়েছে। এখানে তো গ্রাহক সুবিধা একেবারে নেই বললে চলে। আগের মতোই প্যাকেজ রেট ও কল রেট রয়েছে। বাড়তি টাকা দিয়েই তো এগুলো ক্রয় করতে হচ্ছে। আবার হিডেন কিছু চার্জও অপারেটররা যুক্ত করে দেয় তা গ্রাহকরা সহজে ধরতে পারে না। ফলে বাজেটের কোনো প্রভাব এখনো পর্যন্ত গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছেনি। আর ভবিষ্যতে যদিও প্রভাব পড়ে তা খুবই নগণ্য, যা উল্লেখ করার মতো নয়।
এ প্রসঙ্গে আইটি বিশেষজ্ঞ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির অধ্যাপক ড. ফজলুল করিম পাটোয়ারী নয়া দিগন্তকে বলেন, মোবাইল অপারেটরগুলোকে সরকার যে ছাড় দিয়েছে তাতে ডেটার ওপরে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না, গ্রাহক পর্যায়ে তেমন সুফল ভোগ করতে পারবে না। তার কারণ হলো আমি যদি ধরি, এক কেজি লবণের ওপর সরকার কর ছাড় দিয়েছে। এই লবণ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে মানুষের কী পরিমাণ প্রয়োজন, প্রতিদিন কতটুকু ব্যবহার করা হয়। তেমনিভাবে সিমের ওপর কর ছাড়, মোবাইল উৎপাদনে কাঁচামালের ওপর কর ছাড়- এগুলো ডেটা ব্যবহারের সাথে বা মোবাইল অপারেটরগুলোর ডেটা বিক্রির সাথে কতটুকু সাম্যঞ্জস্যপূর্ণ সেটা দেখার বিষয়। তিনি মনে করেন, বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় আমাদের দেশে ডেটার মূল্য অনেক বেশি। সরকার চাইলে তা সহজলভ্য করতে পারে। মোবাইল কোম্পানিগুলোও কম লাভ করে সহজলভ্য করতে পারে, কিন্তু তারা সেটা করছে না বরং কৌশলে বহুগুণে লাভ করছে। যেমন ধরুন- ১ মেগাবাইট ডেটা মোবাইল কোম্পানিগুলো ১০০ টাকা দিয়ে ক্রয় করছে। তারা ওই ডেটা বিক্রয় করছে ১২০ টাকায়। কিন্তু এখানে একটি বড় ধরনের ফাঁক রয়ে গেছে। তারা অন্তত ৫০ জনের কাছে এই ১ মেগাবাইট ডেটা ১২০ টাকা করে বিক্রি করছে। যাতে তাদের আয় হচ্ছে ৬ হাজার টাকা। আর হিডেন চার্জতো আছেই। তাহলে এখানে বোঝা গেল ১০০ টাকার ডেটা মোবাইল কোম্পানিগুলো কৌশলে ছয় হাজার টাকায় বিক্রি করছে। ঠিক এইভাবে মানুষের পকেট কাটছে মোবাইল কোম্পানিগুলো। সরকার এখানে কাজ করতে পারে, কাজ করার একটা বড় সুযোগ রয়েছে। অধ্যাপক ড. ফজলুল করিম পাটোয়ারী বলেন, ডেটা ও কলরেট হলো মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মতো আরেকটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেটার ব্যবহার এর গ্রাহকদের সবচেয়ে বেশি করতে হয়। এখানে যদি করছাড় দেয়, তদারকি করে তাহলে মানুষ উপকৃত হবে। অন্যথায় সরকার টেলিকম খাতের সংস্কারে যে উদ্যোগ নিয়েছে তাতে বেশি মানুষের ওপর প্রভাব যেমন পড়েনি, ভবিষ্যতেও পড়বে না।
এ প্রসঙ্গে আইটি বিশেষজ্ঞ নাজমুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, বাজেটে মোবাইল কোম্পানিগুলোকে সরকার যে করছাড়সহ নানা সুবিধা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে এটি আসলে দেখার বিষয় যে, মোবাইল কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের জন্য কতটুকু সুবিধা দিচ্ছে। বাজেট ঘোষণার পর এ খাতে একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ার কথা ছিল, আমরা সেটা তো দেখছি না। বাজেট ঘোষণার আগে ডেটা ব্যবহারে যে পরিমাণ টাকা গ্রাহকদের গুণতে হতো এখনো সেটাই রয়েছে, আগে থেকেই ডেটার মূল্য মোবাইল কোম্পানিগুলো বাড়িয়েছিল, সেটা তো কমেনি। তার মানে কোনো প্রভাব পড়েনি। ভবিষ্যতেও প্রভাব পড়বে এমনটা আশা করা দুরূহ। তিনি আরো বলেন, সরকার যদি একটি মনিটরিং সেল গঠন করে কঠোরভাবে মোবাইল অপারেটরগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তাহলে হয়তো গ্রাহকরা কিছুটা করছাড়, কর অব্যাহতিসহ যে সুযোগ সুবিধাগুলোর সুফল ভোগ করতে পারবে। অন্যথায় বাড়তি টাকা দিয়েই গ্রাহকদের ডেটা ক্রয় করতে হবে।



