প্রধানমন্ত্রীর ওপর দায় চাপিয়ে কৃচ্ছ্রতা সাধনের উদ্যোগ

অর্থ মন্ত্রণালয়ে শেখ হাসিনার সুবিধাভোগী কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলেও এসব কর্মকর্তা বহাল থেকে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে কাজ করছেন। এই চিঠি সেই প্রক্রিয়ারই একটি অংশ।

শামছুল ইসলাম
Printed Edition

রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি বা হ্রাসের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। কিন্তু সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ওপর দায় চাপিয়ে কর্মকর্তাদের আর্থিক সুবিধা হ্রাসের চিঠি পাঠিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। আর্থিক সুবিধার মধ্যে রয়েছে কর্মকর্তাদের মোটরযান রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মাসিক ৫০ হাজার টাকার পরিবর্তে ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ এবং স্কলারশিপ-ফেলোশিপপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ডেপুটেশন প্রদানের পরিবর্তে শিক্ষা ছুটি প্রদান। কর্মকর্তাদের আর্থিক সুবিধা কমিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ওপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করতে এমন চিঠি প্রেরণ করা হয়েছে বলে মনে করছে প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সম্প্রতি পরিচালন ব্যয় কমাতে বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। এর ধারাবাহিকতায় গত ৯ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয় মোটরযান রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমনোর ব্যবস্থা নিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায়।

অর্থ বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, সীমিত সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা যারা সুদমুক্ত ঋণ গ্রহণের পর গাড়িসেবা নগদায়নের আওতায় মোটর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় হিসেবে যে আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন তা কিছুটা হ্রাস করার সুযোগ রয়েছে। মোটরযান রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মাসিক ৫০ হাজার টাকার পরিবর্তে ২৫ হাজার টাকা হারে নির্ধারণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সদয় নির্দেশনা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সদয় নির্দেশনার প্রেক্ষিতে উক্ত মোটরযান রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় সঙ্কোচনের বিষয়ে পরীক্ষানিরীক্ষাপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

স্কলারশিপ-ফেলোশিপপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ডেপুটেশন প্রদানের পরিবর্তে শিক্ষা ছুটি প্রদান বিষয়ে অপর এক চিঠিতে বলা হয়, দেশে ও বিদেশে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি অর্জনের জন্য অধ্যয়নের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্কলারশিপ- ফেলোশিপের আওতায় পড়াশোনা, আবাসন এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ভার নির্বাহের জন্য আর্থিক সহায়তাপ্রাপ্ত হন। পূর্ণ স্কলারশিপ-ফেলোশিপপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ডেপুটেশন প্রদানের ফলে স্কলারশিপের পাশাপাশি পূর্ণ বেতন-ভাতা সুবিধাও পেয়ে থাকেন। এ ক্ষেত্রে ডেপুটেশন/পূর্ণ বেতন-ভাতাদি প্রদানের পরিবর্তে শিক্ষা ছুটি প্রদানের সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সদয় নির্দেশনা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সদয় নির্দেশনার প্রেক্ষিতে পূর্ণ স্কলারশিপ- ফেলোশিপপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ডেপুটেশন প্রদানের পরিবর্তে শিক্ষা ছুটি প্রদানের বিষয়টি পরীক্ষানিরীক্ষাপূর্বক প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো দু’টা চিঠিতেই সিদ্ধান্তের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ওপর দায় চাপানো হয়েছে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনপ্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্তই সরকার নিয়ে থাকে। কিন্তু কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা কমানোর এই চিঠিতে বারবার প্রধানমন্ত্রীর ওপর দায় চাপিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এতে করে কর্মকর্তাদের মনে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে।

সরকারের অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ে শেখ হাসিনার সুবিধাভোগী কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলেও এসব কর্মকর্তা বহাল থেকে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে কাজ করছেন। এই চিঠি সেই প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। ফ্যাসিস্ট আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তাদের বিষয়ে সতর্ক দৃর্ষ্টি রাখা দরকার বলে মনে করেন ঐ কর্মকর্তা।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সূত্র জানায়, আর্থিক খাত ধ্বংসকারী সাবেক অর্থসচিব আব্দুর রউফ তালুকদারের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও অনুগত হিসেবে তার সুপারিশে প্রথমে জ্বালানী সচিব এবং পরে অর্থসচিব হিসেবে পদায়ন করা হয় অর্থসচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদারকে। অর্থ বিভাগে যোগদান করার পর বক্তব্য-বিবৃতিতে জয় বাংলার সাথে জয় বঙ্গবন্ধু বলা শুরু করে। ৫ আগস্টের আগে ফেসবুকে লাল প্রোফাইলের বিরুদ্ধে কর্মকর্তাদের প্রোফাইল কালো করার নির্দেশ দেয়া এই কর্মকর্তা এখনো অর্থসচিব হিসেবে বহাল রয়েছেন।

আট বছরেরও বেশি সময় ধরে অর্থ মন্ত্রণালয়ে বহাল আছেন অতিরিক্ত সচিব দিলরুবা শাহীন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় আন্দোলনকারীদের টোকাই এবং ভাড়ায় এসেছে বলে প্রচার করা এই কর্মকর্তা এখনো অর্থ মন্ত্রণালয়ে বহাল রয়েছেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ে বহাল আছেন শেখ হাসিনার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামালের দীর্ঘদিনের একান্ত সচিব ড. ফেরদৌস আলম, দীর্ঘ ছয় বছর ধরে থাকা অতিরিক্ত সচিব সাহানা, অতিরিক্ত সচিব হাসানুল মতিন, যুগ্মসচিব মো: তারিকুল ইসলাম খান, আশরাফুল আলম, দিল্লিতে দীর্ঘ ছয় বছর দায়িত্ব পালন করা যুগ্মসচিব মোহাম্মদ রাশেদুল আমীন প্রমুখ।