ডলার স্থিতিশীল হলেও কমছে না নিত্যপণ্যের দাম

মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ‘অদৃশ্য শুল্ক’

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে না আসার পেছনে রয়েছে সরবরাহ শৃঙ্খলের অদক্ষতা, সীমিত প্রতিযোগিতা, অতিরিক্ত মুনাফা এবং এক ধরনের ‘অদৃশ্য শুল্ক’। পরিবহন ব্যয়, গুদামজাতকরণ, উচ্চ সুদ, কমিশন এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের অতিরিক্ত মুনাফার কারণে আমদানি ব্যয় কমলেও তার সুফল শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছায় না।

শাহ আলম নূর
Printed Edition

ঢাকার বাজারে গত কয়েক মাস ধরে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার তুলনামূলক স্থিতিশীল। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পদক্ষেপে আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলাও আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। তবু চাল, ভোজ্যতেল, ডাল, চিনি, পেঁয়াজ, রসুনসহ অধিকাংশ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েই চলছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, ডলার স্থিতিশীল এবং আমদানি প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হওয়ার পরও কেন বাজারে স্বস্তি ফিরছে না?

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে না আসার পেছনে রয়েছে সরবরাহ শৃঙ্খলের অদক্ষতা, সীমিত প্রতিযোগিতা, অতিরিক্ত মুনাফা এবং এক ধরনের ‘অদৃশ্য শুল্ক’। পরিবহন ব্যয়, গুদামজাতকরণ, উচ্চ সুদ, কমিশন এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের অতিরিক্ত মুনাফার কারণে আমদানি ব্যয় কমলেও তার সুফল শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছায় না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে আগের অস্থিরতা অনেকটাই কমেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ধীরে ধীরে শক্তিশালী হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, আগের মতো ডলার সংগ্রহে অতিরিক্ত প্রিমিয়াম দিতে হচ্ছে না। গত ছয় মাসে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বড় ধরনের ওঠানামা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত পদক্ষেপের ফলে জানুয়ারি ২০২৬-এ প্রতি ডলারের বিনিময় হার যেখানে ছিল প্রায় ১২৪-১২৫ টাকা, জুলাইয়ে তা ১২৩-১২৪ টাকার মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ এ সময়ে ডলারের দাম বাড়েনি; বরং সামান্য কমতির প্রবণতা দেখা গেছে।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজারদর বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ছয় মাসে ভোজ্যতেলের দাম ৮-১২ শতাংশ, মশুর ডালের দাম ১০-১৫ শতাংশ, চিনির দাম ৫-১০ শতাংশ এবং পেঁয়াজ ও রসুনের দাম ১০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। আমদানিনির্ভর নিত্যপণ্যের দাম গড়ে ৮-১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পণ্য আমদানির পর ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হয়। পরিবহন ব্যয়, গুদামজাতকরণ, ব্যাংক ঋণের সুদ, কমিশন এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের অতিরিক্ত মুনাফা মিলিয়ে মূল্য বেড়ে যায়। ফলে আমদানি ব্যয় কমলেও তার সুবিধা ভোক্তা পান না।

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, শুধু ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখলেই বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত না হলে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা না থাকলে ব্যবসায়ীরা সহজেই উচ্চ মুনাফা ধরে রাখতে পারেন। মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশাও অনেক সময় ব্যবসায়ীদের দাম কমাতে নিরুৎসাহিত করে।

তিনি বলেন, আমদানি পর্যায়ে ব্যয় কমলেও পাইকারি ও খুচরা বাজারে সেই সুবিধা কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। আমদানি মূল্য, পাইকারি মূল্য ও খুচরা মূল্যের ব্যবধানের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে কোথায় অতিরিক্ত মুনাফা হচ্ছে, তা সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক এই কর্মকর্তা বলেন, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে বাজার তদারকি জোরদার, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, সরবরাহ শৃঙ্খলের অদক্ষতা দূর এবং অস্বাভাবিক মুনাফা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় ডলারের স্থিতিশীলতার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে প্রয়োজনীয় পণ্যের এলসি খোলায় বড় কোনো সঙ্কট নেই। তবে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পণ্য আমদানি, খালাস ও বাজারজাত করতে সময় লাগায় ডলারের স্থিতিশীলতার প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বাজারে প্রতিফলিত হয় না।

টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, এক বছর আগের তুলনায় ভোজ্যতেল, ডাল, মসলা ও অন্যান্য আমদানিনির্ভর খাদ্যপণ্যের দাম এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এ দিকে আমদানিকারকদের সংগঠনের নেতারা বলছেন, ডলারের দাম ছাড়াও বন্দরে কনটেইনার খালাসে বিলম্ব, পরিবহন ব্যয়, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ এবং ব্যবসা পরিচালনার অন্যান্য খরচ মূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই ডলার স্থিতিশীল হলেও বাজারে দ্রুত দাম কমে না।

অন্য দিকে পাইকারি ব্যবসায়ীদের দাবি, অতিরিক্ত মুনাফা অনেক ক্ষেত্রে খুচরা পর্যায়ে যোগ হয়। আবার খুচরা বিক্রেতাদের বক্তব্য, পাইকারি বাজার থেকেই বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। ফলে প্রকৃত মুনাফা কোন স্তরে বেশি হচ্ছে, সে বিষয়ে স্বচ্ছ তথ্যের অভাব রয়েছে।

ঢাকার মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী সৈয়দ মো: বশির উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন, সমস্যা শুধু আমদানি ব্যয়ে নয়, বাজার কাঠামোতেও। ডলারের দাম কমলেও যদি বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা না থাকে এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে ভোক্তা তার সুফল পাবে না। তাই আমদানি ব্যয় কমার সুবিধা নিশ্চিত করতে বাজার তদারকি আরো কার্যকর করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, ভবিষ্যতে ব্যয় বাড়ার আশঙ্কায় অনেক ব্যবসায়ী আগেভাগেই দাম বাড়িয়ে রাখেন। পাশাপাশি সরবরাহ শৃঙ্খলের অদক্ষতা ও প্রতিযোগিতার ঘাটতিও মূল্য কমার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সরকার বিভিন্ন সময়ে আমদানি শুল্ক ও সম্পূরক শুল্ক সমন্বয় করেছে, যাতে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। তবে শুধু শুল্ক কমানোই যথেষ্ট নয়; সেই সুবিধা ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে কি না, তাও নিশ্চিত করতে হবে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান নয়া দিগন্তকে বলেন, আমদানি, পাইকারি ও খুচরা মূল্যের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক ব্যবধান রয়েছে। এই ব্যবধানের সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ ও নিয়মিত তথ্য প্রকাশ ছাড়া বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, নিত্যপণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে আমদানি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত মূল্যশৃঙ্খলের তথ্য প্রকাশ, নিয়মিত বাজার তদারকি, অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগী কমানো, প্রতিযোগিতা কমিশনের সক্রিয় ভূমিকা এবং ডিজিটাল মূল্য পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলারের স্থিতিশীলতা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে বাজারে অস্বচ্ছতা, অতিরিক্ত মুনাফা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর না হলে সে সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু বিনিময় হার নয়, বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সংস্কারই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।