সরকারের অভ্যন্তরে মন্ত্রিসভার কলেবর বাড়ানোর আলোচনা

সম্ভাব্যদের আমলনামাসহ ভেরিফিকেশন রিপোর্ট প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে

প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পেতে পারেন এমন ৮-১০ জনের আমলনামা প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে রয়েছে। এদের বিষয়ে প্রশাসনিকভাবে আনুষ্ঠানিক সব ভেরিফিকেশনও সম্পন্ন হয়েছে। সূত্রগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রী যেকোনো সময় মন্ত্রিসভার রদবদলের পাশাপাশি সম্প্রসারণের ঘোষণা দিতে পারেন। তবে কাউকে বাদ দেয়া হচ্ছে না বলে তারা জানিয়েছেন। জানা গেছে, নতুন রদবদলে কাউকেই একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হবে না।

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
Printed Edition

আগামী মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হতে যাচ্ছে। এই সময়কালকে সামনে রেখে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কাজের একটি অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন করা হচ্ছে। একইসাথে মন্ত্রিসভায় রদবদল, কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পুনর্বণ্টনসহ মন্ত্রিসভার পরিধি বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পেতে পারেন এমন ৮-১০ জনের আমলনামা প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে রয়েছে। এদের বিষয়ে প্রশাসনিকভাবে আনুষ্ঠানিক সব ভেরিফিকেশনও সম্পন্ন হয়েছে। সূত্রগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রী যেকোনো সময় মন্ত্রিসভার রদবদলের পাশাপাশি সম্প্রসারণের ঘোষণা দিতে পারেন। তবে কাউকে বাদ দেয়া হচ্ছে না বলে তারা জানিয়েছেন। জানা গেছে, নতুন রদবদলে কাউকেই একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হবে না।

রদবদল বা পরিধি বাড়ানোর বিষয়ে জানতে একাধিক মন্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হলেও এ বিষয়ে কোনো মন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাদের ভাষ্য, মন্ত্রিসভায় রদবদল বা দায়িত্ব পুনর্বণ্টন বা পরিধি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার একমাত্র প্রধানমন্ত্রীর। এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ সম্পর্কে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানেন না।

জাতীয় নির্বাচনের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান। শুরুতে তার মন্ত্রিসভায় ৪৯ জন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। তাদের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে গত ১ জুন পদত্যাগ করেন। সরকার গঠনের পর বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অনেক ক্ষেত্রে ছয় মাসের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। এ ছাড়া দলের অনেকেই বলেছেন, ছয় মাস পর সরকারের নেয়া পদক্ষেপগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মূল্যায়ন করা হবে। একইসাথে মন্ত্রিসভার সদস্যদের কার্যকলাপেরও মূল্যায়ন করা হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রতিমন্ত্রী এ প্রতিবেদককে বলেন, সরকার গঠনের সময়ই জানানো হয়েছিল, প্রথম ছয় মাস মন্ত্রীদের কর্মদক্ষতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

জানা গেছে, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রমের গতি এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ধীরগতিতে সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে যেসব মন্ত্রী একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন, তাদের কাজের চাপ কমাতে দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। একইসাথে চাপ কমাতে নতুন কয়েকজনকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এ ছাড়া এই সময়কালের মধ্যে যেসব মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে সমন্বয়হীনতা দৃশ্যমান হয়েছে অথবা প্রশাসনিক কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতি পায়নি, সেসব ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হতে পারে।

জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি মনে করেন, মন্ত্রিসভার কোনো সদস্য ভালো ‘পারফর্ম’ করতে পারছেন না, তাহলে তার জায়গায় দফতর পুনর্বণ্টন অথবা নতুন কাউকে দায়িত্ব দেবেন। তবে এটি সরকারের ১৮০ দিনের পরপর, নাকি আরো সময় লাগবে, নাকি তারও আগে, সেটা নিশ্চিত নয়। রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের মন্ত্রণালয় বা বিভাগের দায়িত্ব বণ্টন করেন।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রিসভার আকার বাড়ানো হলে কয়েকটি নতুন মুখ অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। আলোচনায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন মো: আবুল কালাম, জয়নুল আবদিন ফারুক, বরকত উল্লাহ বুলু, অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, এ বি এম মোশাররফ হোসেন, শহীদুল ইসলাম বাবুল, এরশাদ উল্লাহ, সংরক্ষিত মহিলা আসনের মাহমুদা হাবিবা, রেহানা আক্তার রানু, খায়রুল কবির খোকন, দিনাজপুর-৫ আসন থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য এ জেড এম রেজওয়ানুল হক। এ ছাড়া বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব তানভীর আহমেদ রবিনের নামও টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির জন্য বিবেচনায় রয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। অন্য দিকে বিএনপির সাথে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলোর মধ্য থেকেও একজনকে টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে বলে জানা গেছে।

বর্তমান মন্ত্রিসভায় নোয়াখালী অঞ্চলের কোনো প্রতিনিধি না থাকায় নোয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুকের নাম বেশি আলোচনায় রয়েছে। নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে তিনি ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এ ছাড়া ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের সময়ে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্বারা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হন। তখন সংসদে যে কয়জন সদস্য সরকারের সমালোচনায় মুখর ছিলেন, তাদের মধ্যে ফারুক ছিলেন অন্যতম। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন। বর্ধিত মন্ত্রিসভায় তাকেও দেখা যেতে পারে।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান নয়া দিগন্তকে বলেন, এ বিষয়ে দলীয় ফোরামে কোনো আলোচনা হয়নি। এটি দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভালো বলতে পারবেন। তিনি কখন কাকে নেবেন, কোথায় দায়িত্ব দেবেন, সেটি সম্পূর্ণ তার এখতিয়ার। তিনি বলেন, মন্ত্রিসভার রদবদল বা পরিধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে কোনো সময় নির্দিষ্ট নেই। এটি প্রয়োজন হলে যেকোনো সময় করা যায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, তারেক রহমান সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যসংখ্যা বাড়বে, একইসাথে কয়েকটিতে রদবদল হতে পারে। এর মধ্যে দুর্যোগকালীন সময়ে পরীক্ষা গ্রহণ নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর নেয়া কয়েকটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ও বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বিব্রত বলে জানা গেছে। এ কারণে বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে অন্য মন্ত্রণালয়ে সরিয়ে শিক্ষার দায়িত্ব অন্য কাউকে দেয়া হতে পারে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়েও রদবদলের হাওয়া লাগতে পারে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের ‘অতিকথনে’ প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ। নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স স্থগিতের পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের লোকজন লাইসেন্স বাঁচাতে কোটি টাকা নিয়ে তার পেছনে ঘুরেছে। পরে ওই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডা: শেখ মহিউদ্দিন। এ ছাড়া কয়েকদিন আগে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য চলাকালে তাকে মূল বিষয়ের বাইরে কথা বলতে নিষেধ করেন প্রধানমন্ত্রী। সব মিলিয়ে তাকে অন্য মন্ত্রণালয়ে সরিয়ে দেয়ার জোরালো গুঞ্জন রয়েছে। পরিবর্তন আসতে পারে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়েও। এক্ষেত্রে প্রতিমন্ত্রী রাশেদুজ্জামান মিল্লাতকে পূর্ণমন্ত্রী করা হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান নয়া দিগন্তকে বলেন, সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু তার মানে এই না যে, এটা হবেই বা এখন হবে কিংবা তখন হবে। এগুলো নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা একমাত্র প্রধানমন্ত্রীর আছে। তিনি যখন উপযুক্ত বিবেচনা করবেন, তখন কাউকে দায়িত্ব দিতে পারেন বা কারও থেকে দায়িত্ব নিয়ে নিতে পারেন।