প্রথম ১০০ দিনেই প্রশ্নের মুখে আইনশৃঙ্খলা

টিআইবির প্রতিবেদন

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition
টিআইবির সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন ড. ইফতেখারুজ্জামান : নয়া দিগন্ত
টিআইবির সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন ড. ইফতেখারুজ্জামান : নয়া দিগন্ত

  • ৬০৫ খুন, ধর্ষণ ২০৯ নারী-শিশু, অপহরণ ১৯৬
  • পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ১২৯টি
  • মেয়াদ শেষের আগেই ১৯ ভিসিকে অব্যাহতি
  • ব্যাংক খাতে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন
  • দুদক-মানবাধিকার কমিশন গঠনে অগ্রগতি নেই

‘মব সংস্কৃতি বরদাশত নয়’, ‘চাঁদাবাজিতে শূন্য সহনশীলতা’ -এই ঘোষণাগুলো দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বিএনপি সরকার। কিন্তু ক্ষমতার প্রথম একশ দিনের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন বলছে ভিন্ন কথা। প্রতিদিন গড়ে ছয়টি খুন, প্রতিরাতে ছিনতাই-ডাকাতির আতঙ্ক আর নারী-শিশুর ওপর যৌন সহিংসতার অব্যাহত ধারা, এই বাস্তবতাই উঠে এসেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার এই বিস্তর ফারাক এখন সাধারণ মানুষের মনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

প্রতিবেদনে এক দিকে যেমন কিছু ইতিবাচক প্রশাসনিক উদ্যোগের প্রশংসা করা হয়েছে, অন্য দিকে অপরাধ পরিস্থিতি, শিক্ষা ও আর্থিক খাতের নানা বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ঘাটতির বিষয়গুলোও তুলে ধরা হয়েছে।

রোববার রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সরকারের ১০০ দিন : সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবি। প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সংস্থার সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো: জুলকারনাইন ও রিসার্চ ফেলো রাজিয়া সুলতানা। বক্তব্য রাখেন নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

অপরাধের ভয়াবহ চিত্র

টিআইবির প্রতিবেদনের সাথে সংযুক্ত অপরাধ ও মানবাধিকার পরিস্থিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে ১৯৬টি অপহরণ, ২৯৪টি ছিনতাই এবং ৯০টি ডাকাতির ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আলোচিত সময়ে দেশে দুই হাজার ২১৪টি চুরির ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১২৯টি। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে তিন হাজার ৪৯৬টি।

ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার চিত্রও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে টিআইবি। সংস্থাটির তথ্যমতে, এই সময়ে ৭৮ থেকে ১০২ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। সঙ্ঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩০ থেকে ৩৬ জন এবং ধর্ষণের শিকার শিশু রয়েছে ৪৯ থেকে ৭১ জন। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটাই নাজুক ছিল। খুন, ডাকাতি, চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, লুটপাট ও অরাজকতার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে অব্যাহত রয়েছে।

চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা

প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিলেও বিভিন্ন হাটবাজার, পরিবহন খাত, বাসস্ট্যান্ড, ট্রাকস্ট্যান্ডসহ নানা ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ দৃশ্যমান রয়েছে।

এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগও রয়েছে বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। এমনকি চাঁদাবাজিকে বৈধতা দেয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে একজন মন্ত্রীর মন্তব্য ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

শিক্ষা খাতে দলীয় প্রভাব

টিআইবির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, সরকার গঠনের আগেই এবং পরবর্তী সময়ে দেশের ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগে সার্চ কমিটির বিধান থাকলেও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা একজন নেতাকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে নিয়োগের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রো-ভিসি, ট্রেজারার, ডিন ও প্রভোস্ট নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা, পদোন্নতিতে দীর্ঘসূত্রতা এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন ও সহিংসতার ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে।

সংসদ ও সংস্কার প্রশ্নে মতপার্থক্য

টিআইবির মতে, সংসদ সদস্যদের শপথ, সংবিধান সংস্কার এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যের সংস্কৃতি এখনো গড়ে ওঠেনি। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের কার্যক্রম এবং বিশেষ কমিটি গঠন নিয়েও বিরোধ অব্যাহত রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বারবার জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও দলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, ‘সংস্কারের বাহানায় যদি নির্বাচন হতে না দেয়, সে জন্য সবকিছুতে আপস করে জুলাই সনদে সই করেছি।’ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্যে অসঙ্গতি থাকায় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়েও জনমনে সংশয় তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।

আর্থিক খাতে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত

টিআইবির প্রতিবেদনে ব্যাংকিং খাতে বেশ কয়েকটি বিতর্কিত উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পূর্বে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত এবং ত্রয়োদশ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ব্যাংক রেজুলিউশন আইন ২০২৬-এ দুর্বল ব্যাংকের পুরনো শেয়ারধারীদের কোনো জবাবদিহি ছাড়াই পুনরায় মালিকানায় ফেরার সুযোগ দেয়া হয়েছে- যাকে টিআইবি ‘চিহ্নিত লুটেরাদের পুনর্বাসন’ বলে অভিহিত করেছে। এ ছাড়া ঋণখেলাপিদের মাত্র ১ শতাংশ নগদ ডাউন পেমেন্টে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ এবং একক গ্রাহক ঋণসীমা ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার মতো সিদ্ধান্তও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে সরকারকে।

জরুরি কমিশন গঠনে অনীহা

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন এবং তথ্য কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও আধা-সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন বা কার্যকর করার বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। ফলে দুর্নীতি প্রতিরোধ, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

ইতিবাচক উদ্যোগেরও প্রশংসা

তবে সমালোচনার পাশাপাশি সরকারের বেশ কয়েকটি পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবেও মূল্যায়ন করেছে টিআইবি। এর মধ্যে রয়েছে, সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট সুবিধা বাতিল, প্রধানমন্ত্রীর জন্য ভিভিআইপি প্রটোকল সীমিতকরণ, সরকারি বাসভবন ও সরকারি গাড়ির বিশেষ সুবিধা পরিহার, মন্ত্রীদের জন্য জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের প্রটোকল সংস্কৃতি বাতিল এবং ব্যক্তিগত সফরে সরকারি সুবিধা নিলে ব্যয় পরিশোধের নির্দেশনা।

এ ছাড়া বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে একাধিক দেশের সাথে চুক্তি, সরকারি কর্মকর্তাদের সময়মতো অফিসে উপস্থিতি নিশ্চিত করা, প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি মন্ত্রণালয় তদারকি, মন্ত্রীদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের ঘোষণা, কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, ক্রীড়া ও ধর্মীয় ভাতা কর্মসূচিকেও ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে ফারাক’

সংবাদ সম্মেলনে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী ও প্রশাসনিক সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে, যা ইতিবাচক বার্তা দেয়। কিন্তু একই সাথে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, শিক্ষা ও আর্থিক খাতে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ কমিশন গঠনে অনীহা সরকারের ঘোষিত সুশাসনের প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তার ভাষায়, ‘প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে এখনো উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়ে গেছে।’