রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২ লাখ কোটি টাকা

সংসদে অর্থমন্ত্রী

ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের কথা জানিয়েছে সরকার। একই সাথে রাজস্ব ফাঁকি রোধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে চার লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় এবং ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপনে সরকারের ৯৮২ কোটি ৯১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা ব্যয়ের তথ্য জাতীয় সংসদে তুলে ধরা হয়েছে।

সংসদ প্রতিবেদক
Printed Edition

  • বিদায়ী অর্থবছরে ৪ লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়
  • কাস্টমস-সংক্রান্ত কর ফাঁকির দায়ে ১ হাজার ৭০২টি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা
  • মুজিববর্ষে ব্যয় ৯৮২ কোটি টাকা

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়ে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের কথা জানিয়েছে সরকার। একই সাথে রাজস্ব ফাঁকি রোধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে চার লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় এবং ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপনে সরকারের ৯৮২ কোটি ৯১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা ব্যয়ের তথ্য জাতীয় সংসদে তুলে ধরা হয়েছে।

গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর পর্বে বিভিন্ন সংসদ সদস্যের লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এসব তথ্য জানান। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহারের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, গত ৩১ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি ডাটাবেজে রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি ব্যাংকের পাঠানো তথ্যানুযায়ী খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক লাখ ৮৮ হাজার ৭০১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এসব ব্যাংক হলো অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি, জনতা ব্যাংক পিএলসি, রূপালী ব্যাংক পিএলসি, সোনালী ব্যাংক পিএলসি, বেসিক ব্যাংক পিএলসি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক।

তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বিদ্যমান খেলাপি ঋণের উচ্চ হার কমানো বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

অর্থমন্ত্রী আরো জানান, ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি, তারল্যসঙ্কট ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকের কার্যকর সমাধানে ‘ব্যাংক রেজুলিউশন আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় ‘আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সংশোধনী আইন-২০২৬ প্রণয়ন এবং নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট আইন সংশোধনের মাধ্যমে চেক জালিয়াতি ও চেক ডিসঅনার মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে।

নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো: ফজলে হুদার প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ না বাড়িয়ে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের কর ফাঁকি রোধে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। খুব শিগগিরই করপোরেট করদাতাদের জন্য ই-রিটার্ন ব্যবস্থা আরো সম্প্রসারণ করা হবে। পাশাপাশি এপিআই সংযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তথ্য সমন্বয়, ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা, অনলাইনে উৎসে কর কর্তনের পরিধি বৃদ্ধি এবং ইচ্ছাকৃত কর ফাঁকিদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো: গোলাম রছুলের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে সাময়িকভাবে চার লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। তিনি জানান, কাস্টমস-সংক্রান্ত কর ফাঁকির দায়ে এক হাজার ৭০২টি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে এক হাজার ২৯২টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে।

গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলনের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া উচ্চ মূল্যস্ফীতি ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে কমতে শুরু করে এবং ২০২৫ সালের অক্টোবরে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে আসে। তবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কারণে তা আবার বেড়ে ২০২৬ সালের মে মাসে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে।

তিনি বলেন, চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার (রেপো রেট) ১০ শতাংশে বহাল রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে। একই সাথে সরবরাহ সঙ্কট কাটিয়ে উৎপাদন বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য থেকে এবং ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব উৎস থেকে সরবরাহ করবে। পাশাপাশি বাজারভিত্তিক নমনীয় বিনিময় হারব্যবস্থা অব্যাহত রেখে ডলারের বাজার স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো: মাহবুবুর রহমানের (বেলাল) প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ‘মুজিববর্ষ’ পালন উপলক্ষে জেলা ও উপজেলায় বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন, শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ও বেদি নির্মাণ, সরকারি দফতরে ব্রোঞ্জ, তামা ও মার্বেল পাথরের মূর্তি নির্মাণ এবং জাতীয় পর্যায়ে সময় গণনার ডিজিটাল বোর্ড স্থাপনসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের মোট ব্যয় হয়েছে ৯৮২ কোটি ৯১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। এ-সংক্রান্ত ব্যয়ের বিস্তারিত বিবরণ সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে।

তিনি জানান, ৬২টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে ৪৩টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এ ব্যয় করেছে। এর মধ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ ২৮৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। এ ছাড়া রেলপথ মন্ত্রণালয় ২০৬ কোটি ৭৩ লাখ ৭১ হাজার, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ১৪০ কোটি ৪৫ লাখ ৫০ হাজার, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ১৩৩ কোটি তিন লাখ ২০ হাজার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৪৭ কোটি ৬৬ লাখ ৫৬ হাজার, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ২৬ কোটি ২৬ লাখ ৪১ হাজার, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ২৪ কোটি ৩০ লাখ ৪৩ হাজার, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ২৩ কোটি ২০ হাজার এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ২০ কোটি ৪৯ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয় করেছে।

সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, মুজিববর্ষের ব্যয় নিরীক্ষা বা তদন্তের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। তিনি বলেন, মুজিববর্ষ ছাড়াও আগের প্রধানমন্ত্রীর এক বছরের খাওয়া-দাওয়ার পেছনে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। শুধু একটি খাত নয়, আরো বিভিন্ন খাতের ব্যয় সরকার পর্যালোচনা করছে।

৫ ব্যাংকের অনিয়মে ফরেনসিক অডিট, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা:

ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ঋণ জালিয়াতি ও আর্থিক অনিয়ম রোধে সরকার একটি সুসংগঠিত রেজুলিউশন কাঠামো বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, এ লক্ষ্যে পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ গঠন করা হয়েছে। একই সাথে এসব ব্যাংকের অনিয়ম তদন্তে বিশেষ ফরেনসিক অডিট চলছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দায়ীদের নিয়োগ বাতিলসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে । চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো: নূরুল ইসলাম বুলবুলের লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী সংসদকে এ তথ্য জানান। অর্থমন্ত্রী বলেন, একীভূতকরণের ফলে পাঁচটি ব্যাংকের সব আমানতকারীর দাবি ও স্বার্থ নতুন ব্যাংকে সংরক্ষিত হয়েছে। পাশাপাশি ‘আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬’-এর মাধ্যমে সুরক্ষিত আমানতের সর্বোচ্চ সীমা এক লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই লাখ টাকা করা হয়েছে। একই সাথে রেজুলিউশনের আওতায় অবসায়নাধীন ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরা বাংলাদেশ ব্যাংকের রেজুলিউশন স্কিম অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে তাদের অর্থ ফেরত পাচ্ছেন। আগে আমানত সুরক্ষা আইনের আওতায় না থাকা ফাইন্যান্স কোম্পানির আমানতকারীদেরও এখন এই সুরক্ষার আওতায় আনা হয়েছে।

তিনি আরো জানান, একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের বিনিয়োগ-সংক্রান্ত অনিয়মে দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে বিশেষ ফরেনসিক অডিট চলছে। ওই অডিট প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দায়ী ব্যক্তিদের নিয়োগ বাতিলসহ অন্যান্য উপযুক্ত প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের শেষ দিকে ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (২০২৩ পর্যন্ত সংশোধিত)-এর ৪৭(১) ও ৪৮(১) ধারার ক্ষমতাবলে ১১টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করা হয়। একই সাথে আইনের ৪৫ ধারার আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংক মনোনীত পরিচালক ও স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের মাধ্যমে এসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়।