ক্ষেত থেকে থালা : মধ্যস্বত্বভোগী ও চাঁদাবাজির চক্রে পণ্যের দাম দ্বিগুণ

কৃষকের ক্ষেত থেকে ভোক্তার থালায় পৌঁছাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যকে পার হতে হয় একাধিক ধাপ। এই দীর্ঘ সরবরাহ ব্যবস্থায় কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের দাম প্রায়ই দ্বিগুণ, কখনো তারও বেশি হয়ে যায়। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পণ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে শুধু মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফা নয়, পরিবহন খাতে নতুন ধরনের চাঁদাবাজি, আড়তভিত্তিক সিন্ডিকেট, কোল্ড স্টোরেজ নিয়ন্ত্রণ এবং কিছু পণ্যে করপোরেট পর্যায়ের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

শাহ আলম নূর
Printed Edition

কৃষকের ক্ষেত থেকে ভোক্তার থালায় পৌঁছাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যকে পার হতে হয় একাধিক ধাপ। এই দীর্ঘ সরবরাহ ব্যবস্থায় কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের দাম প্রায়ই দ্বিগুণ, কখনো তারও বেশি হয়ে যায়। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পণ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে শুধু মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফা নয়, পরিবহন খাতে নতুন ধরনের চাঁদাবাজি, আড়তভিত্তিক সিন্ডিকেট, কোল্ড স্টোরেজ নিয়ন্ত্রণ এবং কিছু পণ্যে করপোরেট পর্যায়ের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রকাশ্য সড়ক চাঁদাবাজির ধরন কিছুটা বদলালেও এটি পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। বরং বিভিন্ন এলাকায় নতুন প্রভাবশালী গোষ্ঠী, স্থানীয় পরিবহন নিয়ন্ত্রক, বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটি ও অনানুষ্ঠানিক আদায়ের মাধ্যমে সেই ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাঁধেই চাপছে।

কৃষি বিপণন অধিদফতর, ব্যবসায়ী, পরিবহন মালিক, বাজার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং অর্থনীতিবিদদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, একটি সবজি বা কৃষিপণ্য ক্ষেত থেকে খুচরা বাজারে পৌঁছানোর আগে সাধারণত কৃষক, স্থানীয় ফড়িয়া, পাইকার, আড়তদার এবং খুচরা বিক্রেতা এমন চার থেকে পাঁচটি ধাপ অতিক্রম করে। প্রতিটি স্তরে যুক্ত হয় পরিবহন ব্যয়, কমিশন, গুদামজাত খরচ, পচনজনিত ঝুঁকি এবং অতিরিক্ত মুনাফা।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, উত্তরাঞ্চলের এক কৃষক টমেটো বা বেগুন ২৫ থেকে ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করলেও রাজধানীর বাজারে সেই একই পণ্য ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়। পরিবহন ও স্বাভাবিক বিপণন ব্যয় থাকলেও এই ব্যবধানের বড় অংশ সৃষ্টি হয় বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব এবং মধ্যস্বত্বভোগী নিয়ন্ত্রিত সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিবহন খাতে দৃশ্যমান চাঁদাবাজি কমলেও এখন বিভিন্ন নামে ‘লোডিং-আনলোডিং ফি’, ‘টার্মিনাল চার্জ’, ‘লাইন খরচ’, ‘ম্যানেজমেন্ট ফি’ কিংবা স্থানীয় সমন্বয় ব্যয়ের মতো অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায় করা হচ্ছে। তারা বলছেন, বিভিন্ন জেলায় এসব খরচ পরিশোধ না করলে পণ্য খালাস বা দ্রুত পরিবহনে বাধার মুখে পড়তে হয়। ফলে অতিরিক্ত ব্যয় যোগ হয় পণ্যের মূল্যে।

পরিবহন সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যবসায়ী জানান, অনেক ক্ষেত্রে আগের মতো প্রকাশ্যভাবে রাস্তা আটকে টাকা আদায় না হলেও বিভিন্ন বাজার, ঘাট, টার্মিনাল ও গুদাম এলাকায় অনানুষ্ঠানিক অর্থ প্রদান এখনো বাস্তবতা। এসব ব্যয়ের কোনো সরকারি হিসাব নেই; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা পণ্যের দামের সাথে যুক্ত হয়।

এদিকে, পেঁয়াজ, আলু ও কিছু মৌসুমি কৃষিপণ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কোল্ড স্টোরেজের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। বাজার বিশ্লেষকদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত সরকারি নজরদারির অভাবে কিছু এলাকায় গুদামজাত পণ্য একসাথে বাজারে না ছাড়ার প্রবণতা দেখা যায়। এতে কৃত্রিম সঙ্কটের ধারণা তৈরি হয়ে দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। যদিও কোল্ড স্টোরেজ মালিকদের সংগঠন বরাবরই এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতেই পণ্য ছাড়া হয়।

একইভাবে ডিম ও পেঁয়াজের বাজার নিয়েও প্রায়ই সিন্ডিকেটের অভিযোগ ওঠে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর এবং প্রতিযোগিতা কমিশন অতীতে বিভিন্ন সময়ে কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত ও অভিযান পরিচালনা করেছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত নজরদারি।

এদিকে বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে প্রকাশিত বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছে, খাদ্যপণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে দক্ষ সরবরাহ ব্যবস্থা, স্বচ্ছ বাজার তথ্য এবং প্রতিযোগিতামূলক বিপণন কাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংক বলছে, সরবরাহ ব্যবস্থায় অদক্ষতা, সংরক্ষণ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং বাজারে প্রতিযোগিতার ঘাটতি খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ প্রফেসর গোলাম হাফিজ কেনেডি নয়া দিগন্তকে বলেন, বিশ্বব্যাংকের এই পর্যবেক্ষণের সাথে বাংলাদেশের বাস্তবতার মিল রয়েছে। এখানে এক দিকে কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত হয় না, অন্য দিকে ভোক্তাকেও বেশি দাম দিতে হয়। অর্থাৎ লাভের বড় অংশ উৎপাদক বা ভোক্তা নয়, বরং মধ্যবর্তী পর্যায়ের কিছু গোষ্ঠীর হাতে চলে যায়।

তিনি বলেন, কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি সংগ্রহের ব্যবস্থা বাড়ানো, ডিজিটাল কৃষি বাজার চালু করা, কৃষক সমবায় শক্তিশালী করা এবং আধুনিক কোল্ড চেইন গড়ে তুলতে পারলে মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমানো সম্ভব। একই সাথে প্রতিটি পর্যায়ে পণ্যের ক্রয়-বিক্রয় মূল্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করলে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান নয়া দিগন্তকে বলেন, বাজারে প্রতিযোগিতা কমে গেলে অল্প কয়েকজন ব্যবসায়ীর সিদ্ধান্তেই দাম বাড়া-কমার প্রবণতা তৈরি হয়। বিশেষ করে ডিম, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেল বা কিছু কৃষিপণ্যে বড় সরবরাহকারীদের বাজার প্রভাব নিয়ে নিয়মিত প্রশ্ন ওঠে।

তিনি বলেন, শুধু বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রয়োজন পরিবহন থেকে পাইকারি বাজার পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যয় বিশ্লেষণ, অবৈধ অর্থ আদায়ের উৎস শনাক্ত করা, প্রতিযোগিতা কমিশনের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা এবং কোল্ড স্টোরেজ ও বৃহৎ মজুদ ব্যবস্থার ওপর তথ্যভিত্তিক নজরদারি জোরদার করা।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষকের ক্ষেত থেকে ভোক্তার থালা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছ না হলে এবং অবৈধ ব্যয় ও বাজার কারসাজির সুযোগ বন্ধ না হলে নিত্যপণ্যের দাম কমানোর সরকারি উদ্যোগও কাক্সিক্ষত ফল দেবে না। উৎপাদক ন্যায্যমূল্য এবং ভোক্তা সহনীয় দামে দুই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সরবরাহ শৃঙ্খলে জবাবদিহি ও প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।