বিশেষ সংবাদদাতা
রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দু’টি সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো গতি আসেনি। উল্টো বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার নেমে এসেছে বিগত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) চূড়ান্ত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ৬৭.৫২ শতাংশ। এটি টানা দ্বিতীয়বারের মতো এডিপি বাস্তবায়ন ৭০ শতাংশের নিচে নামার ঘটনা, যা বৈশ্বিক মহামারী ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আন্দোলনকালের হারকেও ছাড়িয়ে গেছে।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পের এই স্থবিরতার পেছনে বড় প্রকল্পগুলোর ক্রয়প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা, জমি অধিগ্রহণ জটিলতা, বৈদেশিক ঋণের অর্থ ছাড়ের ধীরগতি, প্রশাসনিক পরিবর্তন এবং আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তহীনতাই মূলত দায়ী। বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও পরিবেশের মতো স্পর্শকাতর খাতগুলোতে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ের তীব্র অপারগতা দেখা গেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বরাদ্দের চিত্র
আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত এডিপির মোট বরাদ্দ ছিল দুই লাখ আট হাজার ৯৩৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। তবে বছর শেষে ব্যয় করা সম্ভব হয়েছে মাত্র এক লাখ ৪১ হাজার ৭০৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর মধ্যে-বৈদেশিক ঋণ/অর্থায়ন : ৬৯.২০%; সরকারি তহবিল : ৬৫.৭৯% ও সংস্থার নিজস্ব তহবিল : ৭৮.৮৬%। প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে বাজে অবস্থায় রয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ খাত। এর মধ্যে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের বাস্তবায়ন হার ৩১.১৫%, স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের ৩৬.৭২% এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন হার মাত্র ৩২.৪৫%।
বিগত এক দশকের এডিপি বাস্তবায়ন : অতীত বনাম বর্তমান
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, করোনা মহামারীর মতো বৈশ্বিক সঙ্কট ও লকডাউনের মধ্যেও দেশের এডিপি বাস্তবায়ন ৮০ থেকে ৯২ শতাংশের ঘরে ছিল, যা পরবর্তী সময়কাল, বিশেষ করে রাজনৈতিক অস্থিরতার ২০২৪-২৫ বা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চেয়ে অনেক ভালো ছিল।
২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৯২.৭২%; ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৮৯.৭৬%; ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯৪.১১%; ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৯৪.৬৬%; ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৮০.৩৯% (করোনা প্রাদুর্ভাব) ২০২০-২১ অর্থবছরে ৮২.১১% (করোনা তীব্রতা); ২০২১-২২ অর্থবছরে ৯২.৭৪% (করোনা পরবর্তী) ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮৫.১৭%; ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮০.৬৩%; ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬৮.১৮% (জুলাই আন্দোলনকাল); ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৬৭.৫২% (গত ১০ বছরের সর্বনিম্ন)।
সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত ১৫ মন্ত্রণালয়ের কার্যকারিতা
এডিপিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অনুকূলে ছিল মোট এক লাখ ৫৪ হাজার ৮৮২ কোটি ১০ লাখ টাকা, যার মধ্যে ব্যয় হয়েছে এক লাখ ২১ হাজার ৮১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।
শীর্ষ মন্ত্রণালয়গুলোর বাস্তবায়নের হার : জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ : ৯৩.৭৩%; বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় : ৮৮.৬০%; পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় : ৮৮.৭৭%; কৃষি মন্ত্রণালয় : ৮৭.২৩%; বিদ্যুৎ বিভাগ : ৮৩.৭৩%; বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় : ৮২.৬১%; স্থানীয় সরকার বিভাগ (থোকসহ) : ৮২.০৪%; গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়: ৭৮.৭৫%; নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় : ৭৬.০৯%; রেলপথ মন্ত্রণালয় : ৭৪.২১%; সেতু বিভাগ : ৭৩.৮১%; সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ : ৭১.১৮%; মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ : ৬৬.৩০%; প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় : ৬০.৮৭%; কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ: ৫০.৩৩%।
বরাদ্দ পেয়েও বৈদেশিক অর্থ ব্যবহারে ব্যর্থ যারা
বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও পুরো বছরে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের ৩০ শতাংশ অর্থও খরচ করতে পারেনি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ ও মন্ত্রণালয়। এ তালিকায় রয়েছে-স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (থোক বরাদ্দসহ), পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, সংসদবিষয়ক সচিবালয়, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)।



