ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও সেন্টার ফর অল্টারনেটিভসের নির্বাহী পরিচালক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেছেন, ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ এবং ভারতের সাথে দ্বিপক্ষীয় সফরকে এক করে দেখা উচিত নয়। ব্রিকস একটি বহুপক্ষীয় ফোরাম; তাই সেখানে অংশ নিয়ে রাশিয়া, চীন, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সাথে বৈঠকের সুযোগ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সাথে কিছু বিষয়ে দূরত্বের কারণে এই সুযোগ হারালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি আবারো ভারতকেন্দ্রিক হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ব্রিকস-বিরোধী অবস্থান থাকলেও আউটরিচে যোগ দিলে বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক অবনতি হবে- এমন আশঙ্কার যথেষ্ট ভিত্তি নেই। অন্য দিকে গঙ্গা চুক্তির নবায়ন, তিস্তার পানিবণ্টন, বাণিজ্যবাধা দূরীকরণ ও প্রত্যর্পণসহ জটিল বিষয়গুলো ভারতের সাথে পৃথক দ্বিপক্ষীয় সফরে আলোচনার জন্য রাখা উচিত। তার মতে, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি বাস্তবায়নে ভারসাম্যপূর্ণ ও পেশাদার পররাষ্ট্রনীতি অপরিহার্য।
দৈনিক নয়া দিগন্তের সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। নিচে তার সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত-
প্রশ্ন : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে যোগ দেয়ার পাশাপাশি ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ : ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনে যোগ দেয়া এবং ভারতের সাথে দ্বিপক্ষীয় সফর- এই দু’টিকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। ব্রিকস একটি বহুপক্ষীয় ফোরাম, এটি ভারতের একার কোনো উদ্যোগ নয়। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য নয় বলেই আউটরিচ অধিবেশনে আমন্ত্রণ পেয়েছে। ফলে এখানে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের সামনে অন্য সদস্য ও অংশীদার দেশগুলোর সাথে উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হবে।
প্রশ্ন : ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ কোথায়?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ : সম্মেলনের সাইডলাইনে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সুযোগ থাকে। রাশিয়া, চীন, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোর সাথে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইডলাইনে এ ধরনের সুযোগ পাওয়া যায় না। কারণ সংশ্লিষ্ট অনেক নেতা নিউ ইয়র্কের সেই অধিবেশনে উপস্থিত থাকেন না। তাই এই সুযোগ বাংলাদেশ কেন হারাবে?
প্রশ্ন : ভারতের সাথে কিছু ইস্যুতে দূরত্ব থাকলে ব্রিকস আউটরিচে যোগ দেয়া কি সেই দূরত্বকে আরো বাড়াবে না?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ : বরং উল্টোটা হতে পারে। ভারতের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কিছু সমস্যা থাকতেই পারে। কিন্তু সেই কারণে একটি বহুপক্ষীয় ফোরামে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বন্ধ করা উচিত নয়। এতে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি অজান্তেই ভারতকেন্দ্রিক হয়ে যেতে পারে। গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের একটি আকাক্সক্ষা ছিল ভারতের প্রভাববলয় থেকে বের হয়ে এসে আরো ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলা। সেই জায়গা থেকে ব্রিকসের মতো ফোরামে সক্রিয় থাকা জরুরি।
প্রশ্ন : ভারত কি চাইতে পারে বাংলাদেশ শুধু ভারতের সাথেই আলোচনা করুক?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ : সেটি ভারতের স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। বাংলাদেশকে ব্রিকস আউটরিচে আমন্ত্রণ জানানোর ক্ষেত্রে ভারতকে অন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সাথেও আলোচনা করতে হয়েছে। বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানোর পেছনে ভারতের একটি স্বার্থ অবশ্যই রয়েছে। পাকিস্তানের সাথে সঙ্ঘাতের প্রেক্ষাপটে সার্কের বিকল্প হিসেবে বিমসটেককে এগিয়ে নেয়ার উদ্যোগ ভারত নিয়েছিল। কিন্তু ভারতের স্বার্থ থাকা মানেই বাংলাদেশের ক্ষতি হবে- এমন নয়। আমাদের জাতীয় স্বার্থ যেখানে আছে, সেখানে আমাদের সুযোগ নিতে হবে।
প্রশ্ন : ব্রিকস আউটরিচে যোগ দিলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে কি?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ : যুক্তরাষ্ট্রের ব্রিকস-বিরোধী অবস্থান আছে এটা পরিষ্কার। কিন্তু ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য ইন্দোনেশিয়া, মিসর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রেরও ভালো সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ তো এখনো ব্রিকসের সদস্য নয়। তাই ব্রিকসের আউটরিচে যোগ দিলেই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর অসন্তুষ্ট হবে- এমনটা ধরে নেয়ার কারণ নেই।
প্রশ্ন : যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আপনি কোন বিষয়গুলোকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ : যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে। বাংলাদেশের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক কমানোর ক্ষেত্রে তারা বিভিন্ন শর্ত দিয়েছে। অভিবাসন ভিসা স্থগিতের বিষয়ও আছে। পর্যটন ও ব্যবসায়ী ভিসায় বাংলাদেশীদের জন্য বন্ডের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় রাখতে হবে। একই সাথে মনে রাখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা অনুকূল পরিবেশ না পেলে শুধু সরকারের অনুরোধে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে না।
প্রশ্ন : তাহলে চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে পার্থক্যটা কোথায়?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ : চীনের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভিন্ন। জাতীয় স্বার্থে নির্দিষ্ট কোনো দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীন সরকার তাদের বেসরকারি খাতকে প্রভাবিত করতে পারে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কাজ করার ক্ষেত্রেও তারা অভ্যস্ত। প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ক্ষেত্রেও চীনের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি সাশ্রয়ী। ফলে বাংলাদেশের উচিত কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে নিজের স্বার্থ অনুযায়ী বিভিন্ন দেশের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা।
প্রশ্ন : ভারতের সাথে তাহলে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বিষয়গুলো কিভাবে এগোনো উচিত?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ : এসব বিষয় দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য তুলে রাখা উচিত। গঙ্গা চুক্তির নবায়ন, তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি, বাণিজ্যবাধা দূর করা- এসব জাতীয় স্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। একই সাথে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য অপরাধীর প্রত্যর্পণ এবং হাদি হত্যার অভিযুক্তদের হস্তান্তরের মতো বিষয়ও আলোচনায় থাকতে পারে। তবে এগুলো নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা করতে হলে পর্যাপ্ত সময় ও অপেক্ষাকৃত অনুকূল পরিবেশ দরকার।
প্রশ্ন : ব্রিকস সম্মেলনের সাইডলাইনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে তারেক রহমানের বৈঠক হলে কি কোনো সুফল পাওয়া সম্ভব?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ : অবশ্যই। এ ধরনের বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কের দূরত্ব কিছুটা কমাতে পারে এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের একটি নতুন পরিবেশ তৈরি করতে পারে। কিন্তু স্বল্প সময়ের সাইডলাইন বৈঠকে জটিল ও দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলোর সমাধান সম্ভব নয়। তাই সেখানে সম্পর্কের বরফ গলানোর চেষ্টা করা যেতে পারে, কিন্তু সুনির্দিষ্ট ইস্যুভিত্তিক দরকষাকষি দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য রেখে দেয়া ভালো।
প্রশ্ন : বর্তমান সরকারের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’- এই পররাষ্ট্রনীতিকে বাস্তবায়নের জন্য কী প্রয়োজন?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ : প্রচণ্ড পেশাদারিত্ব প্রয়োজন। আমাদের দুই পা বাংলাদেশের ভেতরে রাখতে হবে। এক পা অন্য দেশে রেখে জাতীয় স্বার্থের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা সম্ভব নয়। অন্য দেশে রাখা সেই পা দরকষাকষির ক্ষেত্রে আমাদের দুর্বল করে দিতে পারে। তাই সব পক্ষের সাথে সম্পর্ক রাখতে হবে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে হবে বাংলাদেশের স্বার্থ বিবেচনা করে।
প্রশ্ন : আপনার বক্তব্যের সারকথা কী?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ : ব্রিকস আউটরিচে অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জন্য একটি বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক সুযোগ। এটিকে ভারতের দ্বিপক্ষীয় সফরের সাথে এক করে ফেলা উচিত নয়। ব্রিকসের সাইডলাইনে রাশিয়া, চীন, ব্রাজিলসহ গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সাথে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগ হারানো বাংলাদেশের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। একই সাথে ভারতের সাথে যেসব অমীমাংসিত ও স্পর্শকাতর দ্বিপক্ষীয় ইস্যু রয়েছে, সেগুলো একটি পৃথক ও পর্যাপ্ত সময়ের দ্বিপক্ষীয় সফরে আলোচনা করাই বেশি কার্যকর হবে।



