সঙ্কট সমাধানে সহযোগিতার প্রস্তাব বিরোধী দলের

জ্বালানি সঙ্কট আ’লীগ সরকারের ভুল নীতির ফল : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

দেশে অব্যাহত জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎসঙ্কটের চিত্র জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান। সঙ্কট সমাধানে সরকারের কাছে কোনো কৃতিত্ব না চেয়ে জাতির স্বার্থে নিঃস্বার্থভাবে কারিগরি বিশেষজ্ঞ দলের সহায়তা দেয়ার প্রস্তাব দেন তিনি। একই সাথে আশ্বাস না দিয়ে সঙ্কট কাটাতে বাস্তবসম্মত ও সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রকাশের দাবি জানান।

সংসদ প্রতিবেদক
Printed Edition

দেশে অব্যাহত জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎসঙ্কটের চিত্র জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান। সঙ্কট সমাধানে সরকারের কাছে কোনো কৃতিত্ব না চেয়ে জাতির স্বার্থে নিঃস্বার্থভাবে কারিগরি বিশেষজ্ঞ দলের সহায়তা দেয়ার প্রস্তাব দেন তিনি। একই সাথে আশ্বাস না দিয়ে সঙ্কট কাটাতে বাস্তবসম্মত ও সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রকাশের দাবি জানান।

গতকাল জাতীয় সংসদে ‘তীব্র জ্বালানি ও গ্যাস সঙ্কটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে বেকারত্ব সৃষ্টি এবং দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে মারাত্মক বিপর্যয় রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ’সংক্রান্ত জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশের ওপর আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

‘আশ্বাস যেন বাতাসে মিলিয়ে না যায়’

সরকারের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবের মিল না থাকার অভিযোগ তুলে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘সরকারের পদেক্ষেপ আমরা আশাবাদী হলেও সংসদে দেয়া আশ্বাস বাস্তবায়ন না হওয়ায় কনফিউশন তৈরি হয়। মিটার চার্জ ও ডিমান্ড চার্জ না নেয়ার কথা বলা হলেও তা নেয়া হচ্ছে, ভুতুড়ে বিলের সমস্যাও চলছে। জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা না থাকলে সব পরিকল্পনা ব্যর্থ হবে।’

তিনি আরো বলেন, ক্যাপাসিটি চার্জের নামে জনগণের টাকা ডাকাতি হচ্ছে। কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে এই দুষ্টচক্র থেকে জাতিকে বের করে আনা উচিত।

লোডশেডিংয়ের চিত্র তুলে ধরে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘গ্রামের ৮০ ভাগ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ। কোথাও কোথাও ১২-১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। লংমার্চের সময় সীতাকুণ্ড পৌঁছানোর পর বিদ্যুতের দেখা পেয়েছি, মাঝখানে কোথাও পাওয়া যায়নি। সঙ্কট গোপন না করে সত্য স্বীকার করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সংসদ দাঁড়িয়ে সঙ্কট নেই বলা তামাশার শামিল। আসল পরিস্থিতি জানালে জাতি মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে পারবে।

মুখের তেল বন্ধ হলে দেশের তেলের সঙ্কট হবে না

তোষামোদী রাজনীতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সাদামাটা জীবনযাপন দেখে প্রেরণা পেলেও যারা তাকে আইকন বলেন, তারা তাকে অনুসরণ করেন না। তেল নিয়ে সঙ্কট চলছে, তবে মুখের তেল (তোষামোদ) বন্ধ হলে তেলের সঙ্কট থাকবে না।

তিনি আরো বলেন, আগে বলা হতো নেত্রী ভালো, চার পাশের লোক খারাপ; এখন বলা হচ্ছে লোক ভালো, নেত্রীর জন্য দেশ ধ্বংস হয়েছে। এই সংস্কৃতি বদলাতে হবে, ক্ষমতা কারো জন্য চিরস্থায়ী নয়।

সরকারকে সহযোগিতার প্রস্তাব

জ্বালানি ও বিদ্যুৎসঙ্কট সমাধানে সরকারকে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়ে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, সরকার চাইলে আমাদের টেকনিক্যাল এক্সপার্ট টিমকে যুক্ত করতে পারে। এখানে ক্রেডিট বা ডিসক্রেডিটের বিষয় নেই, সব ক্রেডিট সরকার নিক। আমরা শুধু সমাধান চাই। একটি দেশ যখন পাওয়ার ক্রাইসিসে ভোগে, তখন তা পাওয়ারলেস হয়ে যায়; আমরা শক্তিশালী জাতি চাই।

এরপর আলোচনায় অংশ নিয়ে জামায়াতের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস জনগণের মৌলিক অধিকার, কোনো সরকারের দয়া নয়। কৃষক, শ্রমিক ও প্রবাসীদের করের টাকায় হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া সত্ত্বেও ভুল নীতি ও দুর্নীতির কারণে অর্থনীতি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। সরকার পথ না খুঁজে বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপায় বলেই কার্যকর বিরোধী দল হিসেবে সমন্বিত নীতিমালা প্রস্তাব করা হচ্ছে। এটি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ নয়, বরং সঙ্কটটি সমতার নয়- দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্তহীনতার ফল।

একনজরে সঙ্কট ও মূল চিত্র :

উৎপাদন সমতা ও লোডশেডিং : ২৯,৫০০ মেগাওয়াট স্থাপিত ক্ষমতার বিপরীতে সর্বোচ্চ চাহিদা ১৭,৫০০ মেগাওয়াট হলেও ৩,০০০ মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হচ্ছে।

বকেয়া ও ক্যাপাসিটি চার্জ : উৎপাদকদের কাছে সরকারের বকেয়া ৫২,৩০০ কোটি টাকা। বকেয়ার কারণে তারা জ্বালানি কিনতে পারছে না, অথচ অলস বসিয়ে রেখে প্রায় ৪৮,০০০ কোটি টাকা ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ দিতে হচ্ছে।

গ্যাসের ঘাটতি ও এলএনজি নির্ভরতা : গত ১৭ বছরে অনশোর/অফশোর কূপ না খনন করায় দেশীয় উৎপাদন কমে দাঁড়িয়েছে ৭০৯ মিলিয়ন ঘনফুটে, ফলে ঘাটতি দৈনিক ১,৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। গত অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৯,০০০ কোটি টাকা।

জ্বালানি তেলের মজুদ : নিরাপদ মজুদ নেমে এসেছে ৩০ দিনের নিচে।

সঙ্কট নিরসনে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ ও সমাধান :

১. বকেয়া পরিশোধ ও ‘ওপেন অ্যাক্সেস’ ব্যবস্থা: জ্বালানি কেনার বিল পরিশোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে উৎপাদন সচল করতে হবে। শিল্পকারখানাকে সরাসরি উৎপাদকদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার ‘ওপেন অ্যাক্সেস’ দিলে অর্থ প্রবাহ বাড়বে এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত হবে।

২. কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পূর্ণ ব্যবহার : পায়রা, রামপাল ও মাতারবাড়ীর ৬,৯০০ মেগাওয়াট সমতার কেন্দ্রগুলো থেকে নিয়মিত জ্বালানি সরবরাহ ও এলসি অর্থায়নের মাধ্যমে দ্রুত সাড়ে ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব।

৩. সমন্বিত ব্যবস্থাপনা : ভুতুড়ে বিল, অবৈধ মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। ভোলা, জামালপুর, জকিগঞ্জ ও নোয়াখালীর আটকে থাকা ৭৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দ্রুত জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে হবে। সমুদ্রে নিয়মিত জরিপ চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদে আমদানিকৃত এলএনজি নির্ভরতা কমাতে হবে।

৪. আর্থিক সুশাসন ও জবাবদিহিতা : সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ‘জাতীয় জ্বালানি জরুরি সেল’ গঠন করতে হবে। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে অবৈধ ঘোষিত ক্যাপাসিটি চার্জ পুনর্বিবেচনা করতে হবে এবং এলএনজি ক্রয়ে দলীয় প্রভাব ও দুর্নীতি বন্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

নাজিব মোমেন বলেন, মূল সমস্যা সম্পদের চেয়ে ‘সিদ্ধান্তের গতি ও ইচ্ছাশক্তির ঘাটতি’। বিদ্যমান কাঠামোর সঠিক ব্যবহার ও দুর্নীতি দূর করলে সঙ্কট উত্তরণ সম্ভব।

সরকারি দলের পক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বোরো মৌসুমে চাষিদের রক্ষায় ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত তেলের দাম এক পয়সাও বাড়ানো হয়নি, যদিও বিশ্ববাজারে দাম দ্বিগুণ হয়েছিল। পরবর্তীতে পাচার রোধে সহনীয় মাত্রায় মূল্যবৃদ্ধি করা হয়।

তিনি বলেন, বর্তমান সঙ্কট বিগত ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার রেখে যাওয়া ফল। অনশোর বা অফশোর অনুসন্ধান না করে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা তৈরি করে নিজস্ব টাইকুন লালন করা হয়েছিল। গ্যাসের পাইপলাইন ছাড়াই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও ক্যাপাসিটি চার্জের মাধ্যমে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। বর্তমানে ২৯ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিপরীতে গড়ে ১৫ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদিত হচ্ছে। সরকার ‘নো ক্যাপাসিটি চার্জ’ নীতিতে বিশ্বাসী এবং নতুন রিগ স্থাপন, ভোলায় সার কারখানা নির্মাণ ও বড়পুকুরিয়ার কয়লা দিয়ে ৬২০ মেগাওয়াটের নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। সমাপনী বক্তব্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বিগত সরকারের ভুল নীতির কারণে তৈরি এই সঙ্কট উত্তরণে সরকারের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। মেয়াদ শেষে অবসরে যাওয়া পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ ছাড়াই ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দ্রুত গ্রিডে যুক্ত হবে।

উই হ্যাভ এ প্ল্যান

প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ১৯৭১ সালে জিয়াউর রহমান যেমন ‘উই রিভোল্ট’ বলেছিলেন, তেমনি সঙ্কট সমাধানে প্রধানমন্ত্রী যখন বলেছেন ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’, আমরাও তার সাথে বলছি- ‘উই হ্যাভ এ প্ল্যান’!

জরুরি প্রয়োজনে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ছয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। রামপাল কেন্দ্র থেকে চলতি সপ্তাহেই ৬৬০ মেগাওয়াট যুক্ত হওয়ার আশা প্রকাশ করেন তিনি। এ ছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ পাঁচটি পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ ছাড়াই ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা জানান।

গত ২৪ মে অফশোর বিডিং রাউন্ড উন্মুক্ত করা হয়েছে এবং দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে ১০৬টি কূপ খননের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে (৩০টির কাজ চলমান)। এ বছরের মধ্যে ন্যূনতম দু’টি নতুন এফএসআরইউ চুক্তি এবং মাতারবাড়িতে ল্যান্ড বেইজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে।

ইস্টার্ন রিফাইনারির সমতা বৃদ্ধি

ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ সম্পন্ন করে ক্রুড অয়েল পরিশোধন সমতা ১৫ লাখ থেকে ৪৫ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করা হবে। অব্যবহৃত ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং’ প্রকল্প চালু করতে ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

মিটার ভাড়া ও ভুতুড়ে বিল

মিটার ভাড়া সম্পূর্ণ মওকুফে ২৯ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হলেও গ্রাহকরা চাইলে নিজ খরচে মিটার কিনে ভাড়া এড়াতে পারেন। ভুতুড়ে বিল বন্ধে ২০ ৩০ সালের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রাহককে স্মার্ট প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনা হবে।

রুফটপ সোলারে শিল্পোদ্যোক্তা ও বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের জন্য ১ শতাংশ শুল্ক সুবিধা দেয়া হয়েছে এবং ৬ মাস আয়কর/ভ্যাট মওকুফ করা হয়েছে। উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ আগামী ৩ বছরের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে সরকারের কাছে বিক্রির সুযোগ থাকবে।

স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত ১৫ হাজার ৩৫০ কোটি টাকায় এলএনজি কেনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন, আগামী বছর স্বস্তি ফিরবে এবং ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের জ্বালানি খাতে কোনো সঙ্কট থাকবে না।