সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্রশ্নবিদ্ধ প্রয়োগ

পুরনো অভ্যাসের পুনরাবৃত্তি নয়

ফ্যাসিবাদী আমলে ডিজিটাল কিংবা সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ করে গণমানুষের কণ্ঠ রোধ করা হতো। ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের পর বাকস্বাধীনতার আশা ছিল নাগরিকদের; কিন্তু সিফাতের ঘটনা বলে দেয়, পুলিশের সেই পুরনো বদভ্যাস এখনো রয়ে গেছে। যে অপরাধে সিফাতের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, প্রচলিত কোনো সাইবার বা সাধারণ আইনে সেটি সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞায় পড়ে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অপছন্দনীয় কথা বললেই সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ফাঁসিয়ে দেয়ার এই ‘সহজ পথ’ ফ্যাসিবাদী শাসনামলে অহরহ দেখা যেত। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে তার পুনরাবৃত্তি শুভ লক্ষণ নয়।

কয়েক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ-বিলে অস্বাভাবিকতা দেখা যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে অতিরিক্ত ও ভৌতিক বিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও প্রধানমন্ত্রীকে গালাগালি করেন গাজীপুরের কলেজছাত্র ভুক্তভোগী সিফাত আব্দুল্লাহ। এ কারণে তার বিরুদ্ধে হাসিনা আমলের সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে।

গালিগালাজ বা অশালীন ভাষা কখনো সমর্থনযোগ্য নয়। আমাদের সংস্কৃতিতে এর স্থান নেই। এ নিয়ে দ্বিমতেরও অবকাশ নেই; কিন্তু বিদ্যুৎ বিলের অনিয়ম ও সাধারণ এক শিক্ষার্থীর মেজাজ হারিয়ে করা অশালীন মন্তব্যকে রাষ্ট্র যখন ‘সন্ত্রাসবাদী কাজ’ হিসেবে চিহ্নিত করে, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় গ্রেফতার দেখায়, তখন বাকস্বাধীনতার অধিকার ও আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য।

ফ্যাসিবাদী আমলে ডিজিটাল কিংবা সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ করে গণমানুষের কণ্ঠ রোধ করা হতো। ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের পর বাকস্বাধীনতার আশা ছিল নাগরিকদের; কিন্তু সিফাতের ঘটনা বলে দেয়, পুলিশের সেই পুরনো বদভ্যাস এখনো রয়ে গেছে। যে অপরাধে সিফাতের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, প্রচলিত কোনো সাইবার বা সাধারণ আইনে সেটি সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞায় পড়ে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অপছন্দনীয় কথা বললেই সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ফাঁসিয়ে দেয়ার এই ‘সহজ পথ’ ফ্যাসিবাদী শাসনামলে অহরহ দেখা যেত। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে তার পুনরাবৃত্তি শুভ লক্ষণ নয়।

সিফাতের গ্রেফতারের ঘটনায় প্রতিবাদে সরব হয়েছেন অনেকে। তারা বাকস্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এক ফেসবুক পোস্টে আলোচিত অ্যাক্টিভিস্ট ডা: তাসনিম জারা লিখেছেন, ‘সিফাতের ভাষা ভদ্র ছিল না। এটা নিয়ে তর্ক করার কিছু নেই; কিন্তু প্রশ্নটা ভদ্রতার নয়। কারণ সিফাতকে অভদ্রতার জন্য গ্রেফতার করা হয়নি। মামলা দেয়া হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে’। তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘তাহলে গালি দেয়া কি সন্ত্রাস’? বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কেউ কেউ এর সমালোচনা করেন। এ ঘটনার পেছনে পুলিশের অতি উৎসাহকে দায়ী করছেন তারা।

সিফাতের এক মিনিট ২৪ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা গেছে, তিনি বিদ্যুৎ-বিল নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন। ভিডিওতে দাবি করেন, চলতি মাসে তার বাসায় চার হাজার টাকা এবং আগের মাসে পাঁচ হাজার টাকা বিদ্যুৎ-বিল এসেছে। এ বিলকে অতিরিক্ত বলে দাবি করেন তিনি। এমন দাবি যে শুধু সিফাতই প্রথম করেছেন, তা নয়। এর আগেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুতুড়ে বিল নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছেন অনেকে। মূলধারার সংবাদমাধ্যমেও এ নিয়ে খবর প্রকাশ করা হয়েছে। বিদ্যুৎসঙ্কট এবং ভুতুড়ে বিল এখন চরম জনদুর্ভোগ হয়ে দেখা দিয়েছে। এ বাস্তবতা স্বীকার করে সমাধানে মনোযোগ দেয়াই সরকারের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ। সেই সাথে নাগরিকদেরও ক্ষোভ প্রকাশে যৌক্তিক ও শালীন ভাষা ব্যবহার করা উচিত। তবে পুলিশের অতি-উৎসাহ গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল করতে পারে।

আমরা মনে করি, সাধারণ কোনো অপরাধে অযৌক্তিক ও মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ রাষ্ট্রীর ক্ষমতা অপব্যবহারের নামান্তর। বর্তমান সরকারের উচিত অবিলম্বে এ ধরনের পুরনো ও দমনমূলক চর্চা থেকে বেরিয়ে আসা। একই সাথে সিফাত আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করে নেয়া।