বাংলাদেশ-ভারত নৌচলাচল

সবার আগে দেশের স্বার্থ

আমরা ভারতের সাথে বাণিজ্য ও যোগাযোগ বন্ধের পক্ষপাতী নই। তবে তা হতে হবে দেশের স্বার্থ শতভাগ রক্ষা করে। শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা ছিল যুক্তিযুক্ত; কিন্তু দু’বছরেও তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এখন আমাদের প্রত্যাশা— নির্বাচিত সরকার চুক্তিগুলো সংসদে তুলে আলোচনার মাধ্যমে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে দেশের স্বার্থ প্রাধান্য দিয়ে নতুন করে মূল্যায়ন করবে।

নৌপথে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনে ভারতের সাথে বাংলাদেশের তিনটি চুক্তি ও সমঝোতাস্মারক রয়েছে। পতিত হাসিনা আমলে করা চুক্তির মধ্যে আছে, অ্যাগ্রিমেন্ট অন দ্য ইউস অব চট্টগ্রাম অ্যান্ড মোংলা পোর্টস ফর মুভমেন্ট অব গুডস টু অ্যান্ড ফ্রম ইন্ডিয়া (এসিএমপি), কোস্টাল শিপিং অ্যাগ্রিমেন্ট (সিএসএ) এবং দু’দেশের মধ্যে নৌপথে যাত্রী ও পর্যটক যাতায়াতসংক্রান্ত সমঝোতাস্মারক প্রটোকল অন ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রেড (পিআইডব্লিউটিটি)। এর মধ্যে পিআইডব্লিউটিটিতে পুরনো চুক্তি নবায়ন করা হলেও অন্য দু’টি নতুন। কিন্তু এসব চুক্তি ও সমঝোতায় ভারতকে একতরফা সুবিধা দেয়া এবং বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্নের অভিযোগ আছে।

পত্রিকান্তরে প্রকাশ, চুক্তিগুলো নবায়নে ভারত দুই দেশের নৌ সচিব পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠানের তাগিদ দিচ্ছে। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ কিছুটা ধীরে চলো নীতি অনুসরণ করছে। নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের সচিব সংশ্লিষ্ট দৈনিককে বলেছেন, ভারতের সাথে বিদ্যমান সমঝোতা ও চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

সচিব পর্যায়ের ওই বৈঠক না হওয়ায় নৌ-প্রটোকল (পিআইডব্লিউটিঅ্যান্ডটি) চুক্তির আওতাধীন ‘স্ট্যান্ডিং কমিটি’ এবং চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে ট্রান্সশিপমেন্ট-সংক্রান্ত চুক্তির আওতাধীন আন্তঃসরকার কমিটির সভাও হচ্ছে না। এসব সভা সচিবদের মধ্যে বৈঠকে একই সাথে হয়ে থাকে। সব শেষ বৈঠক হয় ঢাকায় ২০২৩ সালে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আর বৈঠক হয়নি। ২০২৩ সাল থেকে দু’দেশের মধ্যে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ। চব্বিমের পর ভারতের পণ্য ট্রান্সশিপমেন্টও বন্ধ আছে। তবে পিআইডব্লিউটিঅ্যান্ডটি চুক্তির আওতায় নৌপথে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পণ্য আমদানি-রফতানি চালু আছে।

এসিএমপির মাধ্যমে মূলত ভারত কর্তৃক তার পণ্য বাংলাদেশের ওপর দিয়ে দেশটির অন্য অংশে পরিবহন করা হতো। এ জন্য কিছু মাশুল পায় বাংলাদেশ; কিন্তু অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে ২০২১ সালে। আশুগঞ্জে তিতাস নদীর ওপর বাঁধ দিয়ে ভারতীয় লরির মাধ্যমে সড়কপথে ত্রিপুরায় ভারী মালামাল পরিবহনের অনুমতি দেয় তাঁবেদার আওয়ামী সরকার। এ নিয়ে দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সম্প্রতি ভারতের নামকরা একটি প্রতিষ্ঠান নিজেদের পণ্য ট্রান্সশিপমেন্ট করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যমান ব্যবস্থায় বাংলাদেশের সব বন্দর ও বাণিজ্যিক ঘাট ভারতের ব্যবহারের আওতায় এলেও বাংলাদেশ ভারতীয় ভূখণ্ডে একই রকম সুবিধা পায়নি। পিআইডব্লিউটিটি চুক্তিতে আটটি রুটে বাংলাদেশের নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক পয়েন্ট যুক্ত করা হয়েছে। ভারতে বাংলাদেশের জন্য এই সুবিধার উল্লেখ নেই।

নৌচলাচল চুক্তি আঞ্চলিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করলেও এর সাথে জাতীয় নিরাপত্তা, অবকাঠামো, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থ জড়িত। রাজনীতি বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরী একসময় বলেছিলেন, শেখ হাসিনার আমলের তিনটি চুক্তিই বিতর্কিত। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী।

আমরা ভারতের সাথে বাণিজ্য ও যোগাযোগ বন্ধের পক্ষপাতী নই। তবে তা হতে হবে দেশের স্বার্থ শতভাগ রক্ষা করে। শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা ছিল যুক্তিযুক্ত; কিন্তু দু’বছরেও তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এখন আমাদের প্রত্যাশা— নির্বাচিত সরকার চুক্তিগুলো সংসদে তুলে আলোচনার মাধ্যমে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে দেশের স্বার্থ প্রাধান্য দিয়ে নতুন করে মূল্যায়ন করবে।