যুদ্ধে নামে, হারে, তারপর সরে যায় : পরাশক্তির পুরোনো গল্প

অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ শুরু করা যায়, শহর ধ্বংস করা যায়, আকাশ নিয়ন্ত্রণ করা যায়; কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা, জাতীয় মনোবল এবং প্রতিরোধের ইচ্ছাশক্তিকে পরাজিত করা যায় না।

সৈয়দ মূসা রেজা
যুদ্ধের বিভীষিকা
যুদ্ধের বিভীষিকা |ইন্টারনেট

সুকুমার রায়ের এক ছড়ায় প্রশ্ন ছিল—‘যুদ্ধে যে গুলি খায়, সেও গুলিখোর কি?’ কথাটা শুনতে মজার। কিন্তু গুলিখোর মানে তো গুলি খাওয়া মানুষ নয়; বরং যে আফিমের গুলি খেয়ে নেশা করে। শব্দের বাহ্যিক অর্থ আর প্রকৃত অর্থ এক নয়। ঠিক তেমনই পৃথিবীর ইতিহাসে এমন এক পরাশক্তি আছে, যার নাম শুনলেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে অপ্রতিরোধ্য সামরিক শক্তির ছবি। কিন্তু যুদ্ধের খতিয়ান খুলে বসলে অন্য এক গল্প সামনে আসে। সেই শক্তিধর দেশটি একের পর এক যুদ্ধে নামে, বিপুল ধ্বংস ডেকে আনে, কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জনপদ ওলটপালট করে দেয়, অথচ শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারে না। তারপর কোনো না কোনো অজুহাতে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে সরে যায়।

ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সংঘাতকে অনেকেই সেই দীর্ঘ ইতিহাসের সর্বশেষ অধ্যায় হিসেবে দেখছেন সাবেক কূটনীতিক ও অধ্যাপক তৌকির হোসেন। তিনি আজ পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডনে প্রকাশিত নিবন্ধ, ‘দ্য সুপার পাওয়ার দ্যাট কিপস ফেইলিং ওয়ারস’ এ বলেছেন, ‘যুদ্ধ শুরুর সময় যে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যে লক্ষ্যগুলোর কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে তার কোনোটিই পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। ইরানের সরকার বহাল আছে, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির মূল উপাদান অক্ষত রয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাও টিকে আছে। বরং হরমুজ প্রণালীর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে তেহরান তার প্রতিরোধ ক্ষমতার নতুন প্রদর্শন ঘটিয়েছে। যে রাষ্ট্রকে দ্রুত কোণঠাসা করার কথা বলা হয়েছিল, যুদ্ধ শেষে সেই রাষ্ট্র এখনো আঞ্চলিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়।

এই সংঘাতের আরেকটি বড় ফল হলো বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন পরিবর্তনের আভাস। রাশিয়া অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছে। চীনের কূটনৈতিক গুরুত্ব আরো বেড়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন মধ্যম শক্তি নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় নতুন নতুন আঞ্চলিক সমন্বয় গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। ফলে যুদ্ধের মাধ্যমে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে ওয়াশিংটন উল্টো প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে বলে সমালোচকদের অভিযোগ।

সমস্যার মূলেও রয়েছে একটি পুরোনো ধারণা—বিশ্বের যেকোনো সংকটের সমাধান সামরিক শক্তি দিয়ে করা সম্ভব। বিপুল অস্ত্রভাণ্ডার, বিশাল অর্থনৈতিক সামর্থ্য এবং বৈশ্বিক সামরিক উপস্থিতি অনেক সময় মার্কিন নীতিনির্ধারকদের এমন আত্মবিশ্বাস দেয়, যা বাস্তব পরিস্থিতির জটিলতা বোঝার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যুদ্ধকে দ্রুত সমাধান হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু যুদ্ধের পরের বাস্তবতা প্রায়ই পরিকল্পনার বাইরে চলে যায়।

ভিয়েতনাম, ইরাক, আফগানিস্তান কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সংঘাত—সাম্প্রতিক ইতিহাসে এমন উদাহরণের অভাব নেই। সামরিক অভিযান শুরু হয়েছিল বড় বড় লক্ষ্য নিয়ে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেগুলোর অধিকাংশই শেষ হয়েছে দীর্ঘ অচলাবস্থা, ব্যয়বহুল উপস্থিতি বা প্রত্যাহারের মাধ্যমে। বিজয়ের ঘোষণা যত জোরে শোনা গেছে, যুদ্ধশেষের বাস্তবতা ততটাই ছিল বিব্রতকর।

ইসরাইলের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক রাজনীতিকে ঘিরে ওয়াশিংটনের অবস্থান নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। সমালোচকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে ইসরাইলের প্রভাব এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে অনেক সময় বাস্তব পরিস্থিতি বা নিজস্ব গোয়েন্দা মূল্যায়নের চেয়েও রাজনৈতিক চাপ বেশি গুরুত্ব পায়। ইরান প্রশ্নেও সেই প্রবণতা স্পষ্টভাবে দেখা গেছে।

এখন যুদ্ধ থেকে সরে আসার পেছনে নৈতিক উপলব্ধির চেয়ে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক হিসেবই বেশি কাজ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুদ্ধের ব্যয়, জ্বালানি বাজারের চাপ এবং সাধারণ মার্কিন নাগরিকের অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছিল। ফলে যে সংঘাতকে শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে শুরু করা হয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

তবে এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে। দেশটি এখনো বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতে তার অবস্থান শক্তিশালী। কিন্তু ইরানের অভিজ্ঞতা আবারো একটি পুরোনো সত্য মনে করিয়ে দিল—অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ শুরু করা যায়, শহর ধ্বংস করা যায়, আকাশ নিয়ন্ত্রণ করা যায়; কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা, জাতীয় মনোবল এবং প্রতিরোধের ইচ্ছাশক্তিকে পরাজিত করা যায় না। অনেক সময় যুদ্ধক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীরও শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠে আলোচনার টেবিল। আর তখন বিজয়ের ভাষণের বদলে শুরু হয় সম্মান বাঁচিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পথ খোঁজা।