ভারতীয় কৃষি খাতের বিশাল সক্ষমতা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত হলেও, আন্তর্জাতিক বাজারের কঠোর মানদণ্ডের সামনে এখন বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে দেশটির কৃষিপণ্য রফতানি। উত্তর প্রদেশের লখনৌর রেহমানপুর গ্রামের 'ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট' (ভিএইচটি) প্ল্যান্টটি ফল ও সবজি জীবাণুমুক্ত করার জন্য বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু মার্চে জাপানি কোয়ারেন্টাইন পরিদর্শকদের হঠাৎ পরিদর্শনের পর থমকে যায় সবকিছু।
আল জাজিরার কামেরান ইউসুফ বুধবার ( ১২ আগস্ট) এক প্রতিবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরেন। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, রফতানি সংক্রান্ত সব কাগজপত্র প্রস্তুত ছিল, জাহাজের সময়সূচি ঠিক হয়ে গিয়েছিল এবং মহারাষ্ট্র ও গুজরাটের চাষিরা তাদের সেরা আলফান্সো ও কেসর আম জাপানে পাঠানোর জন্য তুলে রেখেছিলেন। কিন্তু জাপানি পরিদর্শকরা পুরো প্রক্রিয়ার ফিউমিগেশন, জীবাণুমুক্তকরণ এবং সনদ দেয়ার পদ্ধতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলেন। এর পরপরই আম আমদানি স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয় জাপান।
গত ৩১ মার্চ ইয়োকোহামার উদ্ভিদ সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ এক আনুষ্ঠানিক চিঠিতে জানায়, ২৫ মার্চের পর ইস্যু করা সনদযুক্ত কোনো আমের চালান জাপানে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না। যতক্ষণ না পুরো ব্যবস্থার দৃশ্যমান উন্নতি না হচ্ছে এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। বিগত প্রায় দুই দশকের মধ্যে এটি ভারত-জাপান আম বাণিজ্যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। এর আগে ১৯৮৬ সালে মাছিপোকার সংক্রমণের কারণে ভারতীয় আম নিষিদ্ধ করেছিল জাপান। দীর্ঘ দুই দশক পর ২০০৬ সালে অবকাঠামো উন্নত করা এবং নিয়মিত পরীক্ষার শর্তে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়েছিল।
আম বাণিজ্যে বিশ্বস্ততার সঙ্কট
এই সাময়িক নিষেধাজ্ঞার কারণে আলফান্সো, কেসর, ল্যাংড়া, বেগনপল্লী, চৌসা ও মল্লিকা—এই ছয় জাতের আম রফতানি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এপ্রিল থেকে জুন মাসের মূল রফতানি মৌসুমেই এই ধাক্কা আসায় চাষিরা চরম বিপদে পড়েছেন।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাপান ভারত থেকে মাত্র ১৫ লাখ ৪০ হাজার ডলার মূল্যের আম ও আমজাত পণ্য আমদানি করেছিল। অঙ্কের হিসাবে এটি খুব বড় না হলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে জাপানি অনুমোদনের গুরুত্ব অপরিসীম। জাপানের মতো কড়া মানের বাজারে পণ্য প্রবেশ করা মানে বিশ্ববাজারে সেই পণ্যের গুণগত মানের বড় সনদ পাওয়া।

দিল্লির আমবাজারে বাতিল আম কুড়াচ্ছে এক দিল্লিবাসী
মুম্বাইয়ের আম রফতানিকারক বিক্রম শাহ বলেন, 'পরিমাণের দিক থেকে জাপান আমাদের সবচেয়ে বড় বাজার ছিল না, কিন্তু দেশটিতে রফতানি বিশ্ববাজারে আমাদের এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা দিত। বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা সেই ব্যবসায়িক সম্পর্ক এখন এক মৌসুমেই নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।' অন্যদিকে মহারাষ্ট্রের রত্নাগিরির চাষি রাজেশ পাতিল জানান, জাপানি বাজারের ভালো দামের আশায় তিনি প্রায় ৮০ হাজার রুপি খরচ করে বাগান ও রফতানি উপযোগী সরঞ্জাম সাজিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সব বিনিয়োগই এখন হুমকির মুখে।
চাল ও মশলায় 'জিএমও' ও রাসায়নিকের থাবা
সমস্যা কেবল আমেই সীমাবদ্ধ নেই; সংকট ছড়িয়েছে চাল ও মশলা খাতেও। গত ১৭ এপ্রিল চীন তিনটি ভারতীয় চাল রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করে। বেইজিংয়ের কাস্টমস কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব চালে জিনগতভাবে পরিবর্তিত উপাদান বা 'জিএমও'-এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। যদিও রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান এবং ভারত সরকার উভয়ই জোর দিয়ে জানিয়েছে যে দেশটির কোনো ধানের জমিতেই জিএমও প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় না।
ভারতের মোট কৃষি রফতানির ২০ শতাংশেরই বেশি আসে চাল থেকে। এই খাতের আয় গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেকর্ড ১ হাজার ২৫০ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল। ফলে চীনের এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়েছে পুরো চাল ব্যবসায়। কৃষি গবেষক এস কে সিং জানান, ভারতের ল্যাবগুলো এতদিন প্রধানত কীটনাশক ও ছত্রাকজাত বিষ পরীক্ষার জন্য তৈরি করা হয়েছে। জিএমও পরীক্ষার মতো বিশেষ সক্ষমতা কেবল নয়াদিল্লি ও হায়দরাবাদের কয়েকটি ল্যাবেই সীমাবদ্ধ। ফলে উত্তরাঞ্চলের ব্যবসায়ীদের নমুনা পরীক্ষা করাতে শত শত কিলোমিটার দূরে পাঠাতে হচ্ছে।
এর আগে ক্ষতিকর কীটনাশকের উপস্থিতির কারণে একাধিক ভারতীয় মশলা ব্র্যান্ডের বিক্রি স্থগিত করে হংকং। একই কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ) ভারতীয় জিরার চালানে পরীক্ষার হার বাড়িয়ে ৩০ শতাংশে উন্নীত করেছে।
দুর্বল সরবরাহ শৃঙ্খল ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
খাদ্য নিরাপত্তা বিজ্ঞানী অনন্যা বোস ভারতীয় কৃষি খাতের মূল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন একটি দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন সরবরাহ শৃঙ্খলকে। কৃষক থেকে ফড়িয়া, ফড়িয়া থেকে ব্যবসায়ী এবং সেখান থেকে প্রক্রিয়াজাতকারীর হাতে পণ্য পৌঁছানোর দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় কোনো এক ধাপে কীটনাশক ছিটানো হলেও তার সঠিক তথ্য বা ট্র্যাক রেকর্ড হারিয়ে যায়। আন্তর্জাতিক বাজার যেখানে ক্ষেত থেকে শুরু করে প্যাকেজিং পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের হিসাব চায়, সেখানে ভারতের অধিকাংশ রাজ্যে এখনো এটি বাধ্যতামূলক করা হয়নি।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষি উৎপাদক হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক কৃষি রফতানিতে ভারতের অবদান মাত্র ২.৪ শতাংশ। বিশ্ববাজারে যুক্তরাষ্ট্র যেখানে ৫০ শতাংশ এবং চীন ২৫ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত পণ্য রফতানি করে, সেখানে ভারত আটকে আছে মাত্র ১৭ শতাংশে।

নয়া দিল্লির পাইকারী বাজারে মানুষের ভীড়
পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারত সরকারের বাণিজ্য বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা উজ্জ্বল কুমার ঘোষ জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক রফতানি বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সরকার ইতোমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। বিশেষ করে কৃষিপণ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ, ক্ষতিকর কীটনাশক এবং বিষাক্ত আফলাটক্সিনের উপস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। এজন্য ল্যাবরেটরিগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো, ঝুঁকিনির্ভর ডিজিটাল পরিদর্শন ব্যবস্থা চালু করা এবং দ্রুত মান যাচাইয়ের জন্য বিশেষ স্ক্রিনিং পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোর ভৌত অবকাঠামো আধুনিকায়নে সুনির্দিষ্ট তহবিল বরাদ্দ করেছে সরকার।
তবে আন্তর্জাতিক কৃষি বাণিজ্যের যে প্রতিযোগিতা, সেখানে কেবল ল্যাব বাড়িয়েই পুরো সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। থাইল্যান্ড ইতোমধ্যে তাদের দেশজুড়ে ক্ষেত থেকে শুরু করে প্যাকেজিং পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য নিশ্চিত করতে একটি আধুনিক ডিজিটাল ট্র্যাসেবিলিটি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ভিয়েতনাম তাদের চাষিদের রফতানিযোগ্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, আর ব্রাজিল ও চিলি কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করে গড়ে তুলেছে নিরবচ্ছিন্ন কোল্ড-চেইন অবকাঠামো।
এর বিপরীতে ভারতের কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ অবকাঠামো এখনো বেশ পিছিয়ে। বর্তমানে ভারতের মোট রফতানি উপযোগী প্যাকিং হাউসের ৭২ শতাংশই কেবল একটি রাজ্যে (মহারাষ্ট্র) সীমাবদ্ধ। উপরন্তু অপর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ এবং ভঙ্গুর লজিস্টিকস ব্যবস্থার কারণে রফতানি আয়ের প্রায় ১৫ শতাংশই অপচয় হয়—যা উন্নত দেশগুলোর তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। পাশাপাশি দেশটির ৮৬ শতাংশেরও বেশি কৃষক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক (যাদের জমির পরিমাণ ৫ একরের কম), ফলে জাতীয় পর্যায়ে অভিন্ন মানদণ্ড ও আন্তর্জাতিক ফুড সেফটি প্রটোকল একযোগে বাস্তবায়ন করা চরম চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের এই সময়ের আধুনিক চাহিদা ও প্রতিযোগী দেশগুলোর দ্রুত অগ্রগতির সাথে ভারত যদি দ্রুত তাল মেলাতে না পারে, তবে বিশ্ববাজারে দেশটির রফতানি সুযোগ আরও সংকুচিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।



