ইয়াবা, কোকেন ও অ্যামফেটামিন এবং পেথিডিনসহ ইনজেকশনের মাধ্যমে গ্রহণ করা উত্তেজক মাদকদ্রব্যের ব্যাপক অপব্যবহার বাংলাদেশের তরুণদের জন্যে হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠছে। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, মাদকের বিস্তার ক্রমবর্ধমান সংখ্যক তরুণ এমনকি কিশোর-কিশোরীকেও জীবন-সংশয়ী হৃদ্যন্ত্রের জরুরি অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, মাদকাসক্তির পাশাপাশি ধূমপান, বংশগত ঝুঁকি ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ৪০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে অকাল হার্ট অ্যাটাকের উদ্বেগজনক প্রবণতায় ভূমিকা রাখছে।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (এনআইসিভিডি) হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা: আবদুল মোমেন ও ডা: মো: হাসান ফারুক ভূঁইয়া জানান, একসময় মূলত বয়স্কদের মধ্যে দেখা গেলেও বর্তমানে কম বয়সীদের মধ্যেও হার্ট অ্যাটাক বাড়ছে।
তারা সতর্ক করে বলেন, মাদকাসক্তি ও অন্যান্য প্রতিরোধযোগ্য ঝুঁকির কারণগুলো দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বাংলাদেশে অকাল হৃদ্রোগজনিত মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
ডা: হাসান বলেন, জরুরি বিভাগগুলোতে এখন নিয়মিতই ৩০-এর কোঠায় থাকা হার্ট অ্যাটাকের রোগী আসছেন। এমনকি ২৮ বা ২৯ বছর বয়সী পুরুষদের মধ্যেও এ ধরনের ঘটনা ক্রমেই সাধারণ হয়ে উঠছে।
ডা: মোমেন মাদকদ্রব্যকে এ প্রবণতার অন্যতম গুরুতর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ইয়াবা, কোকেন, অ্যামফেটামিন ও পেথিডিনের মতো মাদক রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন দ্রুত বাড়িয়ে দেয়, করোনারি ধমনিতে খিঁচুনি সৃষ্টি করে এবং রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বাড়ায়। ফলে আকস্মিক ও মারাত্মক হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, এসব মাদকের কারণে শরীরে যে তীব্র শারীরবৃত্তীয় চাপ সৃষ্টি হয়, তা অনেক সময় হৃদ্যন্ত্র সহ্য করতে পারে না।
ডা: মোমেন এনআইসিভিডিতে চিকিৎসা দেয়া ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরের কথা উল্লেখ করে বলেন, ওই কিশোর মারাত্মক হার্ট অ্যাটাকের শিকার হয়েছিল এবং জরুরি-ভিত্তিতে অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি করে স্টেন্ট স্থাপন করতে হয়েছিল। কৈশোরেও মাদকাসক্তি কিভাবে হৃদ্স্বাস্থ্যের ভয়াবহ ক্ষতি করতে পারে, ওই ঘটনাটি তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
ডা: হাসান ধূমপানকেও অকাল হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ধূমপান রক্তনালির ক্ষতি করে, ধমনিতে দ্রুত ব্লকেজ সৃষ্টি করে এবং অল্প বয়সে প্রাণঘাতী হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। একইসাথে মাদক গ্রহণের ক্ষতিকর প্রভাবও ধূমপানের কারণে আরো বেড়ে যায়।
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, দক্ষিণ এশীয় অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মতো বাংলাদেশের মানুষও পশ্চিমা জনগোষ্ঠীর তুলনায় বংশগতভাবে হৃদরোগের ঝুঁকিতে বেশি রয়েছে।
এই বংশগত ঝুঁকির সাথে মাদকাসক্তি, ধূমপান, স্থূলতা ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা যুক্ত হলে অল্প বয়সেই হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
তারা তরুণদের মধ্যে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ কোলেস্টেরলের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এসব রোগের উপসর্গ অনেক সময় খুব কম থাকায় সেগুলো শনাক্ত না হয়েই থেকে যায়।
বসে থাকা জীবনযাপন, অতিরিক্ত ফাস্টফুড গ্রহণ, স্থূলতা, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ও পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
ডা: মোমেন বলেন, প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ এবং ফলমূল, শাকসবজি ও খাদ্যআঁশের ঘাটতি তরুণদের হৃদ্স্বাস্থ্যের ওপর ক্রমাগত নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তিনি আরো বলেন, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ও পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
ডা: হাসান বলেন, হার্ট অ্যাটাকের সতর্কতামূলক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র বুকের চাপ বা ব্যথা, বাম হাত, ঘাড়, চোয়াল বা পিঠে ছড়িয়ে পড়া ব্যথা, অতিরিক্ত ঘাম, শ্বাসকষ্ট, বমি বমি ভাব ও প্রচণ্ড দুর্বলতা।
তিনি সতর্ক করে বলেন, অনেক তরুণ এসব উপসর্গকে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা মনে করে অবহেলা করেন। অন্যদিকে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বুকের ব্যথা ছাড়াই ‘নীরব’ হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা হঠাৎ বুকের ব্যথা বা কোনো কারণ ছাড়াই শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
তারা অবৈধ মাদক ও তামাক সম্পূর্ণ পরিহার, নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্য গ্রহণ ও স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার পরামর্শ দেন। বিশেষ করে যাদের পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস রয়েছে, তাদের ৩০ বছর বয়সের পর নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেন, মাদকের বিস্তার এবং অন্যান্য অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে প্রতিরোধযোগ্য হার্ট অ্যাটাকে আরো অনেক তরুণ বাংলাদেশির জীবন অকালে ঝরে যেতে পারে।
সূত্র : বাসস



