২৩ মে ২০২৪, ০৯ জৈষ্ঠ ১৪৩১, ১৪ জিলকদ ১৪৪৫
`

দুই বছরেও পরিপালন হয়নি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা

-

- বড় অঙ্কের ঋণ কমাতে ব্যাংকের গড়িমসি
- একক গ্রাহকের ঋণসীমা শিথিল হবে না

বড় অঙ্কের ঋণের লাগাম টানতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। বলা হয়েছিল কোনো একক গ্রাহক বা গ্রুপকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যাংকের মূলধনের ২৫ শতাংশের বেশি ঋণ প্রদান করা যাবে না। এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছিল দ্ইু বছর আগে। কিন্তু গত দুই বছরেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নির্দেশনা পরিপালন করেনি কিছু ব্যাংক। উপরন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের এ নির্দেশনা যাতে পরিপালন করতে না হয় সেজন্য একক গ্রাহক বা গ্রুপের ঋণের ঊর্ধ্বসীমা শিথিলের জন্য আবেদন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার পরিপন্থী। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বলে দেয়া হয়েছ, ঋণ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যাংকিং খাতে সুশাসন সমুন্নত রাখতে একক গ্রাহক বা গ্রুপের বিদ্যমান ঋণসীমা কোনো ক্রমেই শিথিল করা হবে না। বিদ্যমান নির্দেশনা পরিপালনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গতকাল আবারো ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে।

জানা গেছে, একক গ্রাহক ও বড় অঙ্কের ঋণসীমা নির্ধারণ করে দিয়ে ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি এক সার্কুলার জারি করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে বড় গ্রাহক বা ব্যাংকিং খাতে একক ঋণ গ্রহীতার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণে কঠোর বিধি নিষেধ আরোপ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আওতায় কোনো একক গ্রুপ বা ব্যক্তিকে ব্যাংকের মূলধনের ২৫ শতাংশের বেশি বড় অঙ্কের ঋণ দেয়া যাবে না। আগের নিয়মে ৩৫ শতাংশ বড় অঙ্কের ঋণ দেয়া যেত। এ ক্ষেত্রে ঋণসীমা কমানো হয় ১০ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই নির্দেশনায় বলা হয়, যাদের ঋণ ইতোমধ্যে এ সীমার বেশি রয়েছে তাদেরকে ২০২২ সালের ১ এপ্রিলের মধ্যে নামিয়ে আনতে বলা হয়। ওই সময় আরো বলা হয়, ব্যাংকের মূলধনের মধ্যে কোনো একক গ্রুপ বা ব্যক্তিকে ১৫ শতাংশ নগদ আকারে দেয়া যাবে। আগের নিয়মেও নগদ ঋণ ১৫ শতাংশ দেয়া যেত। তবে পরোক্ষ ঋণের সীমা কমানো হয়। আগের নিয়মে কোনো ব্যাংকের মূলধনের ২০ শতাংশ বড় অংকের ঋণ দেয়া যেত।

নতুন নিয়মে দেয়া যাবে ১০ শতাংশ। অর্থাৎ পরোক্ষ ঋণের ক্ষেত্রে অর্ধেক কমানো হয় ঋণ বিতরণের ক্ষমতা। পরোক্ষ ঋণ বলতে ব্যাংক গ্যারান্টি, এলসি, চেক ইস্যু ইত্যাদি ব্যাংকিং উপকরণকে বুঝাবে। অর্থাৎ যেসব উপকরণের ফলে ব্যাংকের উপর তাৎক্ষণিকভাবে দায় পড়বে না। একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে গ্রাহক তা পরিশোধ না করলে দায় হিসাবে যুক্ত হবে।

অপর দিকে নতুন সার্কুলারে কোন ব্যাংকের মোট ঋণের ৩ শতাংশের কম খেলাপি ঋণ থাকলে ওই ব্যাংক তাদের মোট ঋণের ৫০ শতাংশ বড় অংকের ঋণ দিতে পারবে। আগের সার্কুলারে ৩ শতাংশের কমের খেলাপি ঋণের বিষয়টি ছিল না। সার্কুলারে এটি নতুন যুক্ত করা হয়। কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩ শতাংশের বেশি হলেই আন্তর্জাতিকভাবে ওই ব্যাংককে ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও বড় অঙ্কের ঋণ নীতিমালায় খেলাপি ঋণের হার ৩ শতাংশ যুক্ত করা হয়। নতুন সার্কুলার অনুযায়ী, কোন ব্যাংকের ৩ শতাংশের বেশি থেকে ৫ শতাংশের কম খেলাপি ঋণ থাকলে ওই ব্যাংক তাদের মোট ঋণের ৪৬ শতাংশ বড় ঋণ দিতে পারবে। আগের সার্কুলার অনুযায়ী মোট ঋণের ৫ শতাংশ পর্যন্ত খেলাপি ঋণ থাকলে ৫৬ শতাংশ বড় অংকের ঋণ দিতে পারত। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের ক্ষমতা কমলো ১০ শতাংশ।

নতুন সার্কুলার অনুযায়ী, ৫ শতাংশের বেশি থেকে ১০ শতাংশের কম খেলাপি ঋণ থাকলে মোট ঋণের ৪২ শতাংশ বড় অঙ্কের ঋণ দিতে পারবে। আগের সার্কুলার অনুযায়ী, ৫ শতাংশের বেশি থেকে ১০ শতাংশের কম খেলাপি ঋণ থাকলে ৫২ শতাংশ বড় অঙ্কের ঋণ দিতে পারত। এক্ষেত্রে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণের ক্ষমতা কমলো ১০ শতাংশ। নতুন নিয়মে ১০ শতাংশের বেশি থেকে ১৫ শতাংশের কম খেলাপি ঋণ থাকলে ৩৮ শতাংশ বড় অঙ্কের ঋণ দিতে পারবে। আগের নিয়মে এ ক্ষেত্রে ৪৮ শতাংশ বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়া যেত। এক্ষেত্রে ঋণ বিতরণের ক্ষমতা কমলো ১০ শতাংশ। নতুন নিয়মে ১৫ শতাংশের বেশি থেকে ২০ শতাংশের কম খেলাপি ঋণ থাকলে ৩৪ শতাংশ বড় অঙ্কের ঋণ দেয়া যাবে। আগের নিয়মে একই ক্ষেত্রে ৪৪ শতাংশ বড় অঙ্কের ঋণ দেয়া যেত। এক্ষেত্রে বড় অঙ্কের ঋণ দেয়ার ক্ষমতা কমলো ১০ শতাংশ। নতুন নিয়মে ২০ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ থাকলে ৩০ শতাংশ বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়া যাবে। আগের নিয়মে এক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ বড় অঙ্কের ঋণ দেয়া যেত। এ ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণের ক্ষমতা কমলো ১০ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এসব নির্দেশনা ২০২২ সালের ১ এপ্রিল থেকে বাস্তবায়ন করার কথা থাকলেও কিছু ব্যাংক এ নির্দেশনা পরিপালনে গড়িমসি করা হচ্ছে। উপরন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নির্দেশনা যাতে পরিপালন করতে না হয় তার জন্য নীতিমালা শিথিল করতে বলা হচ্ছে।

গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোকে বলে দেয়া হয়েছে, বড় অঙ্কের ঋণঝুঁকি হ্রাস করতে কোনো ক্রমেই ঋণসীমা কমানো হবে না। বরং যাদের এখন নির্ধারিত সীমার মধ্যে ঋণের সর্বোচ্চ হার নামিয়ে আনা হয়নি তাদের ঋণসীমা অবিলম্বে নির্ধারিত সীমার মধ্যে নামিয়ে আনতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নির্দেশনা এর পরেও ব্যাংকগুলো পরিপালন না করলে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে।


আরো সংবাদ



premium cement