১৫ এপ্রিল ২০২১
`
নাগরিক প্ল্যাটফর্মের জরিপ

করোনায় আধপেটা ৮০ ভাগ প্রান্তিক

বেশির ভাগ ঋণের ফাঁদে; সামাজিক সংহতি তহবিল জরুরি
-

মহামারী করোনার কারণে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ৮০ শতাংশ পরিবার খাবার গ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। সঞ্চয় কমিয়ে দিয়েছে ৬৪ শতাংশ পরিবার। ২০২০ সালের মার্চের তুলনায় চলতি সালের ফেব্রুয়ারিতে এ প্রান্তিক গোষ্ঠীর আয় ১৫.৮ শতাংশ ও ব্যয় ৮.১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এই পরিবারগুলোর প্রায় ৭৮.৮ শতাংশ অতিমারীর ফলে আর্থিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল যার ৭৮.৫ শতাংশই পুনরুদ্ধার পায়নি। এসব পরিবার ঋণের জালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এই জাল থেকে বের হতে তাদের এক থেকে দেড় বছর সময় লেগে যাবে। এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশের এক জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে। ‘কিভাবে অতিমারীকে মোকাবেলা করছে বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী : একটি খানা জরিপের ফলাফল’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে গতকাল বৃহস্পতিবার এ জরিপের তথ্য তুলে ধরা হয়।
এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ জুড়ে প্রায় ১৬০০ খানায় একটি সমীক্ষা চালিয়েছিল, যেখানে দশটি প্রান্তিক গোষ্ঠীর মুখোমুখি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। চরের ১০০টি, হাওরের ১০০টি, উপকূলের ১০০টি, বস্তির ৪০০টি, দলিত ১০০টি, আদিবাসী ৩০০টি, প্রতিবন্ধী ১৫০টি, অভিবাসী ১৫০টি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা ২০০টি পরিবারের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
জরিপ প্রতিবেদনে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর আয় ও সঞ্চয়, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি, ফিরে আসা অভিবাসী এবং অভ্যন্তরীণ অভিবাসনÑ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরা হয়।
গবেষণার জ্যেষ্ঠ গবেষক, ইশতিয়াক বারি মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করে বলেন, জরিপের জন্য অন্তর্ভুক্ত দশটি প্রান্তিক গ্রুপের মধ্যে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী, প্রতিবন্ধী, বস্তিবাসী ও চরের মানুষ অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। তাদের বাড়তি ব্যয় ও ঋণ পরিশোধে সহায়তা দরকার। সরকারিভাবে নগদ আর্থিক সহায়তা দিয়ে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলা করতে সাহায্য করা উচিত।
তিনি বলেন, কোভিড-১৯ এর অর্থনৈতিক প্রভাব স্বাস্থ্য এবং সামাজিক প্রভাবগুলোর তুলনায় অনেক গভীরভাবে পড়েছে। আয় হ্রাস এবং ব্যয় থেকে সমাজে সবচেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষগুলো পুরোপুরি সেরে উঠতে পারেনি। বিপুলসংখ্যক পরিবার ঋণের জালে পড়েছে এবং তারা সঞ্চয় হারাচ্ছে। আসন্ন জাতীয় বাজেটে, সুস্পষ্ট আর্থিক বরাদ্দ (সামাজিক সুরক্ষা নেট কর্মসূচির অধীনে এবং এর বাইরে) করতে হবে এবং একটি নতুন ‘সামাজিক সংহতি তহবিল’ তৈরি করে করপোরেট এবং বেসরকারি অনুদানের জন্য আর্থিক উৎসাহ (সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এবং বাস্তব সময়ের সাথে) বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কোভিডের পর মানুষের আয় কমেছে ১৫ দশমিক ৮০ শতাংশ। বিপরীতে ব্যয় কমেছে ৮ দশমিক ১০ শতাংশ। আর সঞ্চয় কমেছে ৬৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। এতে আরো বলা হয়, কোভিড সমস্যার কারণে ৮০ দশমিক ৬০ শতাংশ পরিবার খাদ্যগ্রহণ কমিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে চরের ৭৪ দশমিক ৭০ শতাংশ, হাওরের ৭৮ দশমিক ৯০ শতাংশ, উপকূলের ৬৯ দশমিক ৮০ শতাংশ, বস্তির ৭৮ দশমিক ৮০ শতাংশ, দলিত ৬৫ দশমিক ৭০ শতাংশ, আদিবাসী ৮৯ দশমিক ২০ শতাংশ, প্রতিবন্ধী ৮০ দশমিক ৪০ শতাংশ, অভিবাসী ৭৮ দশমিক ১০ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা ৮৪ দশমিক ১০ শতাংশ রয়েছেন।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জরিপের প্রধান সমন্বয়কারী সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, কোভিডের সময় এসব পরিবারের লোকজন প্রথমে প্রোটিনের পরিমাণে কমিয়েছে, তারপর কমিয়েছে আমিষ খাওয়ার পরিমাণ।
সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়, একই সময় খাদ্যবহির্ভূত খরচ কমিয়ে দিয়েছে ৬৪ দশমিক ৫০ শতাংশ পরিবার। এর মধ্যে চরের ৫৮ দশমিক ৭০ শতাংশ, হাওরের ৭০ দশমিক ৪০ শতাংশ, উপকূলের ৩৮ দশমিক ৪০ শতাংশ, বস্তির ৬১ দশমিক ৬০ শতাংশ, দলিত ৪১ দশমিক ৮০ শতাংশ, আদিবাসী ৮৩ দশমিক ৩০ শতাংশ, প্রতিবন্ধী ৫৮ শতাংশ, অভিবাসী ৫৯ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা ৭৪ দশমিক ১০ শতাংশ।
সংবাদ সম্মেলনে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কোভিডকালীন ‘সামাজিক সংহতি তহবিল’ গঠন করার প্রস্তাব দেন।
এই ত্রাণ তহবিলের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, সরকারি ও বেসরকারি তদারকিতে এই সামাজিক সংহতি তহবিল গঠিত হবে। ত্রাণ তহবিলের অর্থ সরকারি অনুদানের পাশাপাশি বেসরকারি অনুদান থেকে আসবে। এই অনুদান কোথা থেকে আসছে, আবার কোথায় ব্যয় হচ্ছে তা সব মানুষ জানতে পারবে। তিনি এই তহবিলের বিষয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার উদাহরণ দিয়ে বলেন, সে দেশেও এ ধরনের একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে।
দেবপ্রিয় বলেন, প্রথাগতভাবে আমাদের দেশে যারা বিপন্ন মানুষ, এটা (কোভিড-১৯) তাদের জন্য আরো দুর্যোগ টেনে এনেছে। আবার যারা বিপন্ন ছিলেন না, তাদের অনেকে এই ধাক্কাতে অসহায়ত্বের পর্যায়ে চলে গেছেন। শুধু ছোট ছোট প্রণোদনা না, এটাকে ২-৩ বছরের জাতীয় সামগ্রিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নিতে হবে।
তিনি আরো বলেন, জাতীয় সামগ্রিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নিতে হলে যে মানুষগুলো জনমানুষের কাছাকাছি থাকেন যেমন- স্থানীয় সরকার, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসনকে আরো শক্তিশালীভাবে যুক্ত করতে হবে।
দেবপ্রিয় বলেন, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার বিষয়ে মানুষের বেশি সন্তুষ্টি রয়েছে। তারপর এসেছে স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধি ও জনপ্রতিনিধি। এরপর এসেছে প্রশাসন। সরকারে হয় কোনো সচেতনতার অভাব আছে অথবা তারা সচেতনভাবে এটাকে অস্বীকার করার মনোভাবের ভেতরে আছে। এই অস্বীকারের মধ্যে থাকলে মানুষের দুঃখ-কষ্ট আরো দীর্ঘায়িত হবে।
মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বক্তব্য প্রদান করেন।



আরো সংবাদ