২৫ নভেম্বর ২০২০

দুই বন্ধু দেশের সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া কেন?

-

পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি শহরের অদূরেই ফুলবাড়ি-বাংলাবান্ধা আন্তর্জাতিক সীমান্ত চেকপোস্ট, আর তার বাঁ দিকে কাঁটাতারের বেড়ার পাশঘেঁষে চলে গেছে ‘বর্ডার রোড’। রাস্তার পাশেই তিন স্তরবিশিষ্ট কাঁটাতারের বেড়া, প্রায় আট ফুট উঁচু সেই দেয়াল টপকানো একরকম অসম্ভব। কয়েক শ’ গজ পরপর রাস্তার পাশে বিএসএফের নজরদারি পোস্ট, বন্দুকধারী জওয়ানরা সেখানে চব্বিশ ঘণ্টার পাহারায়। বস্তুত ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যে সুদীর্ঘ চার হাজার কিলোমিটারেরও বেশি স্থল সীমান্ত, তার প্রায় পুরোটাজুড়েই এই ধরনের কাঁটাতারের বেড়া বসানোর কাজ সেরে ফেলেছে ভারত।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভুটান বা নেপালের মতো ভারতের আরো যেসব মিত্র দেশ আছে, তাদের সীমান্তে এ ধরনের কোনো বেড়া না থাকলেও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের চরিত্রই পুরোপুরি বদলে দিয়েছে এই কাঁটাতার। কিন্তু সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে এই বেড়া? চোরাকারবারদের তৎপরতা কি এতে কমছে? দুই পারের মানুষের যোগাযোগে কি বাধার দেয়াল তৈরি হচ্ছে? বাংলাদেশ এই কাঁটাতারের বেড়াকে কী চোখে দেখছে?
কাঁটাতারের ওপাশে পৈতৃক জমি : বর্ডার রোড ধরে কিছুটা এগিয়েই গিয়ে পড়লাম সর্দারপাড়া গ্রামে, কাঁটাতারের বেড়া যে জনপদের জীবনযাত্রাকেই আমূল বদলে দিয়েছে। সর্দারপাড়ার যুবক জিয়াউল হোসেন চাষির ছেলে, কিন্তু এখন চাষবাস ভুলে তাকে শিলিগুড়িতে রোজ দিনমজুরের কাজ করতে যেতে হয়। কারণটা আর কিছুই নয়, কাঁটাতারের বেড়ার ওপাশে পড়ে তাদের পৈতৃক চাষের জমি একরকম ‘খরচের খাতা’য় চলে গেছে।
জিয়াউল হোসেন বলছিলেন, ‘আমাদের যে তারকাঁটা হয়েছে, তারকাঁটার ভেতরে যে জমিগুলো পড়েছে সেখানে এখন কিন্তু আমরা আবাদ করতে পারি না।’ ‘আমাদের অন্তত সাত বিঘা জমি ছিল ওপাশে, কিন্তু চাষ হয় নাÑ যেতেই দেয় না ওদিকে। কী বলব বলেন, বর্ডার এখন একটা কারাগারে পরিণত হয়েছে।’
গভীর আক্ষেপের সাথে জোবেইদা খাতুনও পাশ থেকে যোগ করেন, ‘কৃষিকাজই করতে দেয় না। যেতে দেয় না ওদিকে, এটাই অসুবিধা।’ ‘কার্ড দেখিয়ে যেতে দেয়ার কথা, কিন্তু অন্য গ্রামে দিলেও আমাদের সেটাও দেয় না। আমরা গরিব মানুষ, যেতে না দিলে কী করে কাজ করব বলুন?’
তিনি যে কার্ডের কথা বলছিলেন, সেই পরিচয়পত্র ইস্যু করেছেন বিএসএফের স্থানীয় কর্মকর্তারাই। এই কার্ড দেখিয়ে তাদের সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গেট খুলে কাঁটাতারের ওপাশে চাষ করতে যেতে দেয়ার কথাÑ কিন্তু বিষয়টি আসলে নির্ভর করে বিএসএফের খেয়ালখুশির ওপর।
সর্দারপাড়ার গ্রামবাসী আনজুআরা বেগমও জানাচ্ছিলেন, ‘ওখানে কার্ড দেখালেও বিএসএফ কিছুতেই যেতে দেয় না।’ ‘কিছুই করতে পারি না, এ দিকে ওর বাবারও কাজ-কাম নেই, ঘরেই বসে থাকে।’ ‘জমি-জায়গা তো সব আমাদের তারকাঁটার ভেতরে পড়েছে, কিন্তু বিএসএফ ওখানে যেতেই দেয় না।’
‘কাঙ্খিত নয়’ এই বেড়া, মানেন অনেকেই
দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের মধ্যে এমন কৃত্রিম দেয়াল যে কাক্সিক্ষত নয়, দিল্লিতেও সে কথা মানেন অনেক বিশেষজ্ঞই। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও ঢাকাতে দিল্লির সাবেক রাষ্ট্রদূত মুচকুন্দ দুবের যেমন বলতে দ্বিধা নেই, এর মধ্যে একটা ‘চরম স্ববিরোধিতা’ আছে। তার কথায়, ‘এসব দেয়াল-টেয়াল হলো মান্ধাতার আমলের ভাবনা।’ ‘বার্লিন দেয়াল কবে ভেঙে পড়েছে, আজকের যুগে এসব ভাবনা আসলেই অপ্রয়োজনীয়।’
‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তা আবার শুরু করতে চান সেটি অন্য কথাÑ কিন্তু দুটো বন্ধু দেশের মধ্যে আসলে এভাবে দেয়াল খাড়া করা যায় না, যেটা আমরা করেছি। এটি দৃষ্টিকটু এবং অবান্তর! আমি বলব এটি ব্যাখ্যারও অতীত।’
কিন্তু নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে কাঁটাতারের বেড়ার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরছেন অনেক পর্যবেক্ষক।
অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের বাংলাদেশ বিশ্লেষক জয়িতা ভট্টাচার্য যেমন বলছিলেন, ‘এটি কিন্তু অনেক ধরনের জিনিস থেকে সুরক্ষাও দিয়েছে।’
বস্তুত বাংলাদেশ নিজেরাও তো মিয়ানমারের সাথে তাদের সীমান্তে বেড়া দেয়ার কাজ করছে। কারণ এটা প্রমাণিত যে বেড়া বহু নেতিবাচক ইস্যুতে একটা বাধার কাজ করে। তা ছাড়া এই সীমান্ত এলাকাটা নিñিদ্র নয়Ñ খুবই ‘পোরাস’, নানা ধরনের আন্তর্জাতিক অপরাধও এখানে ঘটতে পারে সেটাও মনে রাখতে হবে। দিল্লির আর একটি নামী গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো শ্রীরাধা দত্তও মনে করেন, নানা ভালোমন্দ বিচার করেও বলতে হবে ‘আসলে কাঁটাতারের বেড়ার কোনো বিকল্প নেই।’
ড. দত্ত বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, ‘বলতে পারেন এনআরসিকে কেন্দ্র করে যে অনুপ্রবেশ আটকানোর অভিযান শুরু হয়েছে, এই কাঁটাতারের বেড়া তারই একটা কোল্যাটারাল ড্যামেজ।’ তবে কাঁটাতারের বেড়াও কিন্তু চোরাকারবার, ট্র্যাফিকিংসহ অন্যান্য সীমান্ত অপরাধ পুরোপুরি ঠেকাতে পারেনি, সাথে রয়ে গেছে গ্রামবাসীদের নানা ভোগান্তিও।
সর্দারপাড়ার লিয়াকত আলী বলছিলেন, ‘অনেক গ্রাম আছে যাদের শুধু এই বিএসএফের বর্ডার রোড দিয়েই যাতায়াত।’ ‘কখনো যদি চোরাকারবারীরা বেড়ার তার কেটে দেয়, তখন বিএসএফ ওদেরকে খুবই হেনস্থা করে। এমনকি রাস্তাও বন্ধ করে দেয়, যাতে ওদের চলাচলে খুবই অসুবিধা হয়।’ সীমান্তের যেখানে নদীনালা, সেখানেই শুধু এখনও কাঁটাতার বসেনিÑ মোটামুটি ১০ শতাংশ এলাকায় এখনো কাজ বাকি রয়ে গেছে। তবে সেখানেও নৌকায় বা স্পিডবোটে বিএসএফের টহল চলছে, আর চলছে লেসার প্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘স্মার্ট ফেন্সিং’ বসানোর কাজ।
উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন ও অর্থনীতিবিদ সঞ্চারী রায় মুখার্জি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকা নিয়ে গবেষণা করছেন দীর্ঘ দিন ধরে। তার অভিজ্ঞতা বলে, প্রাক-কাঁটাতার যুগে যেভাবে ওই অঞ্চলে তামাক বা পাটের প্রায় অবাধ বাণিজ্য চলত, তা এখন অনেকটাই বন্ধ হয়ে গেছে। আবার সীমান্তের গ্রামগুলোতে রাতবিরেতে গরু চুরি নিয়ে মানুষের ব্যাপক ক্ষোভ-বিক্ষোভ ছিল, সেগুলো কিন্তু দেয়াল বসার পর অনেকটাই প্রশমিত।
কিছু ক্ষেত্রে ‘শাপে বর’ হয়েছে এই বেড়া?
অধ্যাপক সঞ্চারী রায় মুখার্জির কথায়, ‘কাঁটাতারের সীমান্তে আসলে আরো ট্রানজিট পয়েন্ট তৈরি করা উচিত।’ সামাজিকভাবে দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্কটাকে আরো সহজ করতে পারলে অনেক ক্ষোভই কমে যাবে। যেভাবে ছিটমহলগুলোর অনেকটাই যতœ নেয়া গেছে, সেভাবে সীমান্তে টার্মিনাল পয়েন্টও বাড়ানো দরকার। তাতে মুভমেন্টে সুবিধা হবে, দূরত্ব কমবে, চোরাকারবারের বদলে বৈধ বাণিজ্যও বাড়ানো যাবে।’
কাঁটাতারের বেড়ায় অবশ্য বাংলাদেশেরও একরকম শাপে বর হয়েছেÑ যেমন গরু চোরাচালান কমায় বাংলাদেশের খামারিরা এখন উৎপাদনে স্বনির্ভর হয়ে উঠছেন। এমনকি কোরবানির ঈদের আগেও ভারতীয় গরুর চাহিদা তেমন ছিল না। তবে তার পরেও ভারত সীমান্তে এ ধরনের প্রাচীর তারাও দেখতে চান না। দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী বিবিসি বাংলাকে এই কাঁটাতারের বেড়া প্রসঙ্গে বলছিলেন, ‘এক দিকে তো আমাদের জন্য ভালোই হয়েছে, ভারতের গরু না আসায় আমরা স্বাবলম্বী হতে পারলাম।’ ‘অনুপ্রবেশ নিয়েও অনেক কথা ভারত বলেছিল, তবে সাম্প্রতিক নানা ডেটায় এখন প্রমাণিত বাংলাদেশ থেকে ভারতে এখন অনুপ্রবেশ ঘটার কোনো কারণ নেই।’ ‘ফলে যেসব কারণে ভারত কাঁটাতার চেয়েছিল, সেই কারণগুলো না থাকলে কাঁটাতারের বেড়াও অপ্রাসঙ্গিক।’ ‘আর আমাদের অবস্থান জিজ্ঞেস করলে আমি তো বলব বাংলাদেশ সে দিনও কাঁটাতারের বেড়া চায়নি, আজো চায় না।’ ‘বস্তুত দুটো বন্ধু দেশের মধ্যে সীমান্তে এ ধরনের বেড়া থাকার কোনো প্রয়োজন নেই বলেই আমার বিশ্বাস!’ বলছিলেন বাংলাদেশী রাষ্ট্রদূত। তার পরও দুই বন্ধু দেশের সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়াই এখন দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা, যা হয়তো অচিরে বদলাবেও না।


আরো সংবাদ