ইরান যুদ্ধ ঘিরে এশিয়ায় টহল কমাল ট্রাম্প প্রশাসন: উদ্বিগ্ন মিত্র দেশগুলো

এশিয়ায় চীনের প্রভাব ও হুমকি মোকাবিলার মার্কিন সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি |সংগৃহীত

এশিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি হ্রাস পাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে ওয়াশিংটনের মিত্রদের মধ্যে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ যুদ্ধ ষষ্ঠ মাসে গড়ালে এ অঞ্চলে নিজেদের সামরিক সরঞ্জাম কমিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। ফলে এশিয়ায় চীনের প্রভাব ও হুমকি মোকাবিলার মার্কিন সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আল জাজিরা শুক্রবার (২১ আগস্ট) জানায়, নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যখন মার্কিন সামরিক বাহিনী এশিয়ায় তাদের একমাত্র সচল এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার 'ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন' জাপান থেকে সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়েছে। টানা নয় মাস মোতায়েন থাকা 'ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন'-এর বদলে মোতায়েন করা হয়েছে বিমানবাহনী রণতরী ওয়াশিংটনকে। এর আগে, একাধিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আব্রাহাম লিঙ্কনে খাদ্যসংকট, নষ্ট টয়লেট ও ঝরনার কারণে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হয়েছিল এবং অন্তত এক নাবিক জাহাজ থেকে লাফিয়ে পড়ার চেষ্টাও করেছিলেন।

এছাড়া, চলতি বছরের শুরুর দিকে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে 'থাড' ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশবিশেষ সরিয়ে ইরানে ব্যবহারের জন্য নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি যুদ্ধ অব্যাহত রাখতে গিয়ে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত কমে যাওয়ার খবরও সামনে আসে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়ং বলেন, এসব পদক্ষেপে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রদর্শনের শক্তি কমছে। এটি চীনের বিরুদ্ধে পরিচালিত মার্কিন নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার কার্যকারিতায় বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

মার্কিন বিমানবাহী রণতরী চলে যাওয়ার সুযোগে চীনের নৌবহর 'ফাস্ট আইল্যান্ড চেইন' অতিক্রম করে অগ্রসর হচ্ছে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় বেইজিংকে ঘিরে রাখার জন্য তৈরি এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে সাম্প্রতিক সময়ে চীনের 'লিয়াওনিং' ও 'শানডং' এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে ঢুকেছে। একই সঙ্গে তাইওয়ানের পূর্বাঞ্চলীয় জলসীমায় চীনা কোস্টগার্ডের তৎপরতা বেড়েছে, যা জাপান ও ফিলিপাইনের একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে মিলে যায়। ইয়ং জানান, এসব সামুদ্রিক কার্যক্রমের মাধ্যমে তাইপে, ম্যানিলা ও টোকিওকে বার্তা দিচ্ছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ও সক্ষমতা পরীক্ষা করছে বেইজিং।

ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের রাজনৈতিক বিজ্ঞানী জয় ইয়ান চং আল জাজিরাকে জানান, ওয়াশিংটন পশ্চিমে মনোযোগ দেওয়ায় চীন আরও সাহসী হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা মিত্রদের। তবে তিনি মনে করেন, এতে সামরিক নমনীয়তা কিছুটা কমলেও প্রশান্ত মহাসাগরীয় কমান্ডে নিয়োজিত পৌনে চার লাখ মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক কর্মীর বড় অংশ এখনো এ অঞ্চলে বহাল রয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি অনুযায়ী, এশীয় মিত্রদের নিজস্ব প্রতিরক্ষায় মূল ভূমিকা নিতে হবে, যদিও মার্কিন সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। 'জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশল ২০২৬'-এ বলা হয়েছে, চীন, উত্তর কোরিয়া, রাশিয়া ও ইরানের ঝুঁকি মোকাবিলায় মিত্রদের প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৩.৫ শতাংশ এবং নিরাপত্তা ব্যয় ১.৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।

এরইমধ্যে তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান সামরিক বাজেট বাড়িয়েছে। তাইওয়ান ২০২৭ সালের মধ্যে ১৮ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী গিলবার্ট টিওডোরো জুনিয়র প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৪ শতাংশ করার আহ্বান জানিয়েছেন এবং জাপান ও তাইওয়ানের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাটতি সাময়িক। নানিয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির কেই কোগা ও ন্যাশনাল ব্যুরো অব এশিয়ান রিসার্চের কে ট্রিস্টান টাং মনে করেন, এফ-৩৫বি স্টিলথ ফাইটার সজ্জিত মার্কিন অ্যামফিবিয়াস রেডিনেস গ্রুপগুলো এখনো এ অঞ্চলেই রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে ট্রাম্প প্রশাসনের মূল মনোযোগ ও সামরিক উপস্থিতি আবারও এশিয়ায় ফিরে আসবে, কারণ চীনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জই ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে বড় বিষয়।