মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা প্রদানকারী যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে কঠোর আর্থিক ব্যবস্থার হুমকি দিয়েছেন। তেহরানের বিরুদ্ধে এই অভিযানকে তিনি 'অর্থনৈতিক ডি-ডে' বলে ঘোষণা করেছেন।
আল জাজিরা, শুক্রবার (২১ আগস্ট) জানায়, ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ছয় মাস ধরে চলা ব্যয়বহুল সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এটি ট্রাম্পের সাম্প্রতিকতম পদক্ষেপ। দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি একের পর এক বাণিজ্যযুদ্ধের মধ্য দিয়ে মার্কিন অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বৈদেশিক নীতি বাস্তবায়নের পথ বেছে নিয়েছেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অন্যতম দুটি বাণিজ্য অংশীদার চীন ও রাশিয়ার ওপর ট্রাম্পের এই ধরনের চাপ সৃষ্টির সুযোগ খুবই সীমিত। রাশিয়া এরইমধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে। রাশিয়ার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রধানত মার্কিন অর্থব্যবস্থার বাইরে পরিচালিত হয়। অন্যদিকে চীনও দেখিয়ে দিয়েছে, নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা পেলে তারা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করতে দ্বিধা করে না।
কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির গভর্নমেন্ট বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ মনে করেন, ট্রাম্পের পক্ষে এই চাপ প্রয়োগের নীতি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন হবে। তিনি বলেন, সাধারণত এমন সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য বহুপক্ষীয় সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। কিন্তু ট্রাম্প জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশ চীন ও রাশিয়ার সমর্থন ছাড়াই এককভাবে এটি কার্যকর করার চেষ্টা করছেন।
‘ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি’
নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন, তেহরানের বিরুদ্ধে নেওয়া এই পদক্ষেপ হবে যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে চালানো 'সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক অর্থনৈতিক অভিযান'। একই সাথে, জ্বালানি তেল পাচার, কারেন্সি সোয়াপ লাইন, অর্থ স্থানান্তর, মানি এক্সচেঞ্জ, বিদেশি জাহাজের নিবন্ধন ও আসল পরিচয় গোপনকারী ছদ্মবেশী 'ফ্রন্ট কোম্পানি'র মতো মাধ্যম ব্যবহার করে যেসব দেশ ইরানকে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সাহায্য করবে, তাদের 'ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি' ভোগ করতে হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
একই দিনে এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত তেহরানের সাথে সব ধরনের বাণিজ্য অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিতের ঘোষণা দেয়। তাদের অভিযোগ, ইরান তাদের ভূখণ্ডে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটি দীর্ঘদিন ধরে ইরানের প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করছিল। একই সাথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রেও ইরান তাদের ওপর অনেকটাই নির্ভর করত।
ব্র্যান্ডেইস ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক অর্থনীতির অধ্যাপক নাদের হাবিবির মতে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল চাপ বা প্রণোদনার ফল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার চীনসহ অন্যান্য দেশের ওপরও একই ধরনের চাপ প্রয়োগের চেষ্টা চালাতে পারে।
বাণিজ্যে সাময়িক বিরতি
তবে চীন ও ইরানের বাণিজ্য সম্পর্কে ব্যাঘাত ঘটানোর মার্কিন চেষ্টা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। গবেষণা সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরান থেকে রপ্তানি করা অপরিশোধিত তেলের ৮০ শতাংশই কিনেছে চীন। কিন্তু চীনের অধিকাংশ তেল শোধনাগার স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয় এবং মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর তারা কোনোভাবেই নির্ভরশীল নয়। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বেশ জটিল।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় সতর্ক করে বলেছে, ইরানের লেনদেন প্রক্রিয়াজাতকারী বড় চীনা ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হতে পারে। তবে এমন পদক্ষেপ চীনকে ক্ষুব্ধ করতে পারে, যা বর্তমান সংবেদনশীল কূটনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
চ্যাটাম হাউসের জ্যেষ্ঠ গবেষক ইউ জিয়ে বলেন, ট্রাম্পের এই হুমকি চীন-ইরান বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্কে কোনো পরিবর্তন আনবে না। আগামী মাসে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ওয়াশিংটন সফরের কথা রয়েছে। এই বৈঠককে কেন্দ্র করে উভয় দেশই সম্পর্কে স্থিতিশীলতা চায়। তাই দুই নেতার আলোচনায় মধ্যপ্রাচ্য সংকট উত্থাপিত হলেও এটি বৈঠকের মূল এজেন্ডা হবে না বলে তিনি জানান।
চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান ট্রাম্পের কঠোর নীতি প্রসঙ্গে জানান, বাড়তি নিষেধাজ্ঞা কোনো সমস্যার সমাধান আনবে না। দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে কূটনৈতিক উপায়ে সব সংকট সমাধানের আহ্বান জানান তিনি।
রাশিয়ার সমান্তরাল সম্পর্ক
রাশিয়ার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সামনে ভিন্ন চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়েছে। চীনের তুলনায় বাণিজ্য কিছুটা কম হলেও মস্কো ও তেহরান বছরের পর বছর ধরে পশ্চিমা প্রভাবের বাইরে নিজস্ব বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।
নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা দেশ দুটি গত বছরের জানুয়ারিতে ২০ বছর মেয়াদি একটি অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে। রাশিয়ার জ্বালানিমন্ত্রী সের্গেই চিবিলিয়েভের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে তাদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৬০ কোটি ডলারে। শুধু তা-ই নয়, ইউরোপীয় একটি গোয়েন্দা নথির বরাতে জানা গেছে, কাস্পিয়ান সাগর দিয়ে রাশিয়া নিয়মিতভাবে ইরানকে ড্রোন উপাদান, গোলাবারুদ ও টিএনটি পাঠাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই রাশিয়ার ওপর সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে, ফলে নতুন করে হুমকি দেওয়ার সুযোগ কম।
‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রের এই অর্থনৈতিক চাপকে ওয়াশিংটনের 'ব্যর্থ নীতির পুনরাবৃত্তি' বলে মন্তব্য করেছেন। সামাজিক মাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, মার্কিন অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ও দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের জন্য চরম হুমকি।
ব্রিকস জোটের সদস্য হিসেবে ইরান নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে নতুন আর্থিক পথ খুঁজছে। সম্প্রতি ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদুলনাসের হেমমাতি জানান, তারা ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে (এনডিবি) যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, যা পশ্চিমা ব্যবস্থার বাইরে অর্থায়নের পথ সহজ করবে।
তেহরানের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিশ্লেষক আলী আকবর দারেইনি মনে করেন, সব নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান টিকে থাকার পথ খুঁজে নেবে। ট্রাম্পের অবস্থা এখন সেই ‘কমলি নেহি ছোড়তা’ প্রবাদের মতো—তিনি এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন, যেখান থেকে জয় পাওয়া যেমন অসম্ভব, তেমনি হাত ধুয়ে বের হয়ে আসাও তাঁর পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না।



