দক্ষিণ লেবাননের গ্রামগুলোতে ইসরাইলি ড্রোনগুলো সাধারণ মানুষকে ঘর থেকে বের করে আনার জন্য কান্নারত শিশুদের কণ্ঠস্বর ব্যবহার করছে। গাজার মতোই লেবাননের বাসিন্দারা বলছেন যে, ইসরাইল বেসামরিক জীবন এবং তাদের চারপাশের চেনা শব্দগুলোর ওপর এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
দক্ষিণ লেবাননের হাব্বুশ গ্রামে এক রাতে নিস্তব্ধতা ভেঙে— ভেসে আসা শব্দটি কোনো বিমান হামলার ছিল না, ছিল সাহায্যের জন্য আকুতি জানানো এক শিশুর কান্নার আওয়াজ।
গ্রাম্য প্যারামেডিক হাশেম উড়ে যাওয়া একটি ইসরাইলি কোয়াডকপ্টার—অর্থাৎ চারপাখাওয়ালা ড্রোন থেকে এই কান্নার আওয়াজ শুনতে পান।
তিনি জানান, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দক্ষিণ লেবাননের গ্রামগুলোতে এখনো যারা রয়েছেন, তাদের কাছে প্রতিদিনের এক নির্মম বাস্তবতা। এই ড্রোনগুলো তাদের ওপর উড়ে এসে কখনো শিশুদের চিৎকার, কখনো অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত কিংবা কোনো নারীর আর্তনাদ প্রচার করছে।
ইসরাইলি দখলদারিত্ব এবং দৈনিক বোমাবর্ষণের পরেও যারা নিজেদের বাড়িতে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাদের জন্য আকাশে এই ড্রোনগুলো ভয়ের বাস্তব রূপ।
স্থানীয় বাসিন্দা ও উদ্ধারকর্মীরা বলছেন, কেবল ভয় দেখানোই এর উদ্দেশ্য নয়, ইসরাইলি বাহিনী এই কান্নার শব্দগুলো ব্যবহার করে মানুষের ভয়, কৌতূহল কিংবা সাহায্যের মানবিক তাগিদকে পুঁজি করে ফাঁদ পাতে।
হাশেম জানান, রাতের নিস্তব্ধতায় এমন শব্দ শুনে বাইরে গিয়ে দেখার প্রথম মানবিক তাড়না তার সাথেও ঘটেছিল। কিন্তু তিনি দ্রুত বুঝতে পারেন যে মধ্যরাতে গ্রামে কোনো শিশু থাকার সম্ভাবনা নেই।
তার মতে, এর উদ্দেশ্য হলো মানুষকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা এবং ফাঁদে ফেলে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের অবস্থান শনাক্ত করা।
এই নিষ্ঠুর কৌশলটি গাজাতেও ব্যবহার করেছে ইসরাইল। সেখানেও লাউডস্পিকারযুক্ত কোয়াডকপ্টারের মাধ্যমে কান্নারত শিশু বা চিৎকাররত নারীর শব্দ প্রচার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হত। গাজায় এই ড্রোনগুলো কেবল নজরদারির হাতিয়ার ছিল না, বরং মানুষের চলাচল পর্যবেক্ষণ করতে, নির্দেশ দিতে, ভয় দেখাতে এবং সরাসরি গুলি চালাতেও ব্যবহার করা হত।
এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ আসল এবং রেকর্ড করা শব্দের পার্থক্য মুছে দিয়ে মানুষের সবচেয়ে মৌলিক মানবিক প্রবৃত্তি—সাহায্যের ডাকে সাড়া দেয়ার ইচ্ছাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। আজ দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দারা দেখছেন যে, সেই একই পদ্ধতি তাদের প্রায় জনশূন্য ও ধ্বংসপ্রাপ্ত গ্রামেও প্রয়োগ করা হচ্ছে।
পুরো শব্দক্ষেত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেয়ার এই মানসিক চাপ খুব কাছ থেকে দেখেছেন ধ্বংসপ্রাপ্ত শহর হুলার বাসিন্দা তারেক মাজানি। ২০২৪ সালের যুদ্ধে ঘর হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর তিনি ‘গ্যাদারিং অব দ্য পিপল অব দ্য সাউদার্ন বর্ডার টাউনস’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন, যা বাসিন্দাদের গ্রামে ফিরে যাওয়ার এবং পুনর্নির্মাণের দাবিতে প্রচার চালাচ্ছিল।
২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর ইসরাইলি সেনাবাহিনী কয়েকটি গ্রামের ওপর ড্রোন পাঠিয়ে সতর্কবার্তা প্রচার করে বাসিন্দাদের তার সাথে যোগাযোগ না করতে এবং তাকে বর্জন করতে আহ্বান জানায়। তাকে হিজবুল্লাহর সদস্য বলে অভিযুক্ত করা হলে প্রতিবেশীদের নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি তার পরিবারকে রেখে অন্য কোথাও চলে যান।
পরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিষয়টি আসায় এই সতর্কবার্তা বন্ধ হলেও এর সামাজিক প্রভাব ছিল গভীর। এই ঘটনা থেকে বোঝা যাচ্ছে, দক্ষিণ লেবাননের যুদ্ধ কেবল বিমান হামলা বা ধ্বংসলীলার নয়, বরং মানুষের মনস্তত্ত্ব ও শব্দের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেয়ারও যুদ্ধ।
শব্দের এই ব্যবহার লেবাননের বেসামরিক মানুষদের এক অসম্ভব কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়, যেখানে প্রতি মুহূর্তে ভয় জমে ওঠে এবং গ্রামে টিকে থাকাটাই হয়ে ওঠে প্রতিদিনের এক তীব্র স্নায়ুযুদ্ধ।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই



