যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কানাডার বাণিজ্যযুদ্ধ তীব্র

ফোর্ড সাংবাদিকদের বলেন, ‘ট্রাম্পকে বিশ্বাস করা যায় না, সোজা কথা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমন একজন মানুষ, যিনি আপনার লাঞ্চের টাকা চুরি করে নিতে পারেন।’

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ট্রাম্প ও কার্নি
ট্রাম্প ও কার্নি |সংগৃহীত

দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। এর জবাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এএফপি জানায়, রোববার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘কানাডা অঙ্গরাজ্য না হয়েও অঙ্গরাজ্য হওয়ার সব সুবিধা ভোগ করতে চায়!!!’

তিনি আরো বলেন, ‘তারা বহু বছর ধরে আমাদের মহান কৃষকদের ওপর বিপুল পরিমাণ শুল্ক আরোপ করে এসেছে। আর নয়!!!’

অটোয়া থেকে এএফপি জানায়, শনিবার কার্নি ঘোষণা দেন যে, ৮ সেপ্টেম্বর থেকে কানাডার নতুন পাল্টা শুল্ক কার্যকর হবে। এই শুল্ক মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ইস্পাত ও দুগ্ধশিল্পকে লক্ষ্য করে আরোপ করা হবে।

এর আগে কার্নি বাণিজ্য নিয়ে একটি ‘খারাপ চুক্তি’ থেকে সরে আসেন।

শুক্রবার ওয়াশিংটনে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়েছে। এতে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের কানাডীয় পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রে কানাডার মোট রফতানির ৫.৫ শতাংশ। ক্ষতিগ্রস্ত পণ্যের মধ্যে হকি স্টিক থেকে শুরু করে সিমেন্ট পর্যন্ত রয়েছে।

‘আপনার ওপর হামলা হলে আপনি যুদ্ধে আছেন। আমাদের ওপর হামলা করা হয়েছে,’ কার্নি বলেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য বলেছেন, ওয়াশিংটনের ‘কানাডার সাথে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে সক্ষম হওয়া উচিত’। এ ক্ষেত্রে তিনি কার্নির সাথে তার ‘ভালো সম্পর্কের’ কথাও উল্লেখ করেন।

তবে শনিবার কানাডার প্রধানমন্ত্রী বলেন, আলোচনার শুরুতে অগ্রগতি হলেও শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প যেসব শর্ত দিয়েছেন, সেগুলো মেনে নেয়া সম্ভব নয়।

অটোয়ায় কার্নি বলেন, ‘সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কিছু শর্ত প্রস্তাব করেছে, যা অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক ও অন্যায্য এবং কানাডার জন্য চুক্তির নিট সুবিধাকে ক্ষুণ্ন করেছে। একইসাথে এগুলো যেকোনো চুক্তির নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।’

‘তারা যা প্রস্তাব করেছে, আমরা তা গ্রহণ করতে পারি না এবং তারা যা চেয়েছে, আমরা তা দেব না।’

কানাডার নতুন শুল্ক বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ইস্পাত ও দুগ্ধশিল্পকে লক্ষ্য করবে এবং ৮ সেপ্টেম্বর থেকে তা কার্যকর হবে। আগামী সপ্তাহে এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত জানানো হবে বলে কার্নি জানান।

একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা চলতি সপ্তাহের ওয়াশিংটন আলোচনা সম্পর্কে বলেন, আলোচনা ছিল খোলামেলা, তবে তিক্ততাপূর্ণ ছিল না।

মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার শনিবার ফক্স নিউজকে বলেন, ওয়াশিংটন ‘কানাডার পাল্টা পদক্ষেপের জবাব দিতে ব্যবস্থা নেয়ার পথে এগোচ্ছে’। তিনি আরো বলেন, কানাডার আলোচকদের সাথে নতুন কোনো আলোচনা নির্ধারিত হয়নি।

কানাডা ট্রাম্পের আরোপ করা গাড়ি, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের শুল্ক থেকে অব্যাহতি পাওয়ার চেষ্টা করে আসছে। এসব শুল্ক দেশটির অর্থনীতিতে আঘাত করেছে, কর্মসংস্থান কমিয়েছে এবং একসময় দৃঢ় বলে বিবেচিত দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে চাপে ফেলেছে।

হোয়াইট হাউসের অভিযোগ ছিল, কানাডা মার্কিন অ্যালকোহল, গাড়ি ও দুগ্ধজাত পণ্যের সাথে ‘বৈষম্যমূলক আচরণ’ করছে এবং এ কারণেই শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

শুল্কগুলো মূলত বুধবার থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। তবে আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছে উল্লেখ করে ট্রাম্প তিন দিনের জন্য তা স্থগিত করেছিলেন।

কার্নি বলেন, চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার একটি কারণ ছিল মার্কিন আলোচকরা শেষ মুহূর্তে অন্যান্য দেশের সাথে কানাডার বাণিজ্য চুক্তির ওপর বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তাব দেন।

এ ছাড়া ফরাসি ভাষা ও কুইবেকের সংস্কৃতি নিয়েও মার্কিন আলোচকরা অগ্রহণযোগ্য ‘হুমকি’ দিয়েছেন বলে তিনি জানান। পূর্ব কানাডার ফরাসিভাষী প্রদেশ কুইবেকের প্রসঙ্গ টেনে তিনি এ কথা বলেন।

বাণিজ্যযুদ্ধ আরো তীব্র হওয়ায় ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা ও মিনেসোটা, নিউইয়র্ক এবং ওয়াশিংটনসহ সীমান্তবর্তী অঙ্গরাজ্যগুলোর গভর্নররা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা ট্রাম্পকে এই অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য দায়ী করে বলেছেন, এর ফলে মার্কিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও পরিবারের ব্যয় বাড়বে।

নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘অপ্রয়োজনে মিত্রদের সাথে বিরোধে জড়ানো এবং দেশের অভ্যন্তরে মূল্য বাড়ানো—এটাই এক কথায় ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতি।’

সর্বশেষ শুল্কের বাইরে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাকে এখনো উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ইউএসএমসিএ সংশোধনের বিষয়ে একমত হতে হবে। ট্রাম্প বর্তমান কাঠামোয় চুক্তিটি নবায়নে সম্মতি দেননি।

কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্যে পরিণত করার ট্রাম্পের হুমকিও কানাডীয়দের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।

কার্নি বারবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কানাডার সম্পর্ক স্থায়ীভাবে বদলে গেছে এবং কানাডাকে তার দক্ষিণের প্রতিবেশীর ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। বর্তমানে কানাডার মোট রফতানির প্রায় ৭০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে যায়।

শনিবার কার্নি বলেন, ‘আমরা কোনো বিভ্রান্তির মধ্যে ছিলাম না। শুরু থেকেই আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে আমেরিকা বদলে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা এটাও বুঝতে পারি যে কখনো কখনো তার স্বাক্ষর পেন্সিল দিয়ে লেখা হয়।’

কার্নি পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে প্রাদেশিক নেতাদের সাথে আলোচনা করেন।

তাদের একজন, অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড বলেন, কানাডীয়দের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

ফোর্ড সাংবাদিকদের বলেন, ‘ট্রাম্পকে বিশ্বাস করা যায় না, সোজা কথা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমন একজন মানুষ, যিনি আপনার লাঞ্চের টাকা চুরি করে নিতে পারেন।’

শীর্ষস্থানীয় ২০০টি মার্কিন কোম্পানির প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন বিজনেস রাউন্ডটেবিল সতর্ক করে বলেছে, নতুন শুল্ক ‘মার্কিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও পরিবারগুলোর ব্যয় বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করছে’। সংগঠনটি দুই সরকারকে আবার আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছে।