ইরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ বা নজিরবিহীন অর্থনৈতিক যুদ্ধের হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তার ঘোষণার পর এর প্রথম ধাক্কা ইরানের বদলে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক বাজারেই লেগেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে তিন সপ্তাহের মধ্যে সবচেয়ে বড় দরপতন হয়েছে। একই সময়ে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামও বেড়েছে। এর মধ্যেই চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের মোট সরকারি ঋণ প্রথমবারের মতো ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
ট্রাম্পের হুমকি
বুধবার (১৯ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরান চুক্তির সুযোগ গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে দেশটিকে ‘নজিরবিহীন মাত্রার অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতার’ মুখে পড়তে হবে।
ইরানের সাথে ব্যবসা করে এমন দেশগুলোর বিরুদ্ধেও নতুন নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, যেসব দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, বিমানবন্দর বা সরকারি সংস্থা ইরানকে যেকোনো ধরনের সহায়তা দেবে, তাদের ‘বিরাট অর্থনৈতিক পরিণতি’ ভোগ করতে হবে।
বৃহস্পতিবার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও জানান, ইরানের সাথে ব্যবসা করা অন্যান্য দেশ ও প্রতিষ্ঠানের ওপর আরও ‘সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা’ আরোপ করা হতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এ হুমকি এমন সময়ে এলো, যখন উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ রয়েছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এ জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। প্রণালীটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও আর্থিক বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে।
বাজারে ধাক্কা
ট্রাম্পের নতুন অর্থনৈতিক হুমকির পর বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রায় এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৯৩ ডলারের ওপরে উঠে যায়। শুক্রবার সকালে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্টের দাম ছিল ৯৩ দশমিক ২৮ ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃহস্পতিবার বেড়ে ৮৬ দশমিক ৭০ ডলারে ওঠে। শুক্রবার সকালে তা প্রায় ৮৬ দশমিক ২০ ডলারে লেনদেন হচ্ছিল।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন দেখা দেয়। ডাও জোন্স সূচক ৭০৩ দশমিক ৮৪ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৩২ শতাংশ কমে ৫২ হাজার ৭৫৯ দশমিক ২১ পয়েন্টে দাঁড়ায়। এসঅ্যান্ডপি-৫০০ সূচক কমে শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশ।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক ফ্রেডেরিক স্নাইডার বলেন, ট্রাম্পের ঘোষণার পর ৩০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদ ৫ দশমিক ২৫ শতাংশের ওপরে উঠে যায়, যা প্রায় দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি। তার মতে, এটি মার্কিন বন্ডের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতির ইঙ্গিত।
বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ঋণের বন্ড পুনঃক্রয়ের পরিমাণ দ্বিগুণ করে অন্তত ৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার ঘোষণা দেয়। তবে তাতেও বাজার পুরোপুরি শান্ত হয়নি।
চাপ বাড়ছে মার্কিন অর্থনীতিতেও
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রও এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ অনুভব করছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় তেলের দাম বাড়ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ তৈরি করছে। জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও।
স্নাইডারের মতে, যুক্তরাষ্ট্র তেল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও বৈশ্বিক বাজারের ধাক্কা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয় আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
তিনি বলেন, অর্থনীতি ধীর হয়ে পড়লে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার ঝুঁকির কারণে ফেডারেল রিজার্ভের জন্য সুদের হার কমানোও কঠিন হয়ে পড়বে।
এদিকে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, দেশটির মোট সরকারি ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। প্রত্যাশিত সময়ের প্রায় দুই বছর আগেই এ রেকর্ড হয়েছে। যুদ্ধের ব্যয় এবং ট্রাম্প প্রশাসনের করপোরেট কর কমানোর নীতিও ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন।
মিত্রদের অর্থনীতিতেও প্রভাব
এই যুদ্ধের সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে উপসাগরীয় দেশ ও পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতিগুলো। অথচ এসব দেশের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদের বড় বিনিয়োগকারী।
স্নাইডার বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমাচ্ছে এবং সার্বভৌম সম্পদ কোথায় বিনিয়োগ করবে তা নতুন করে বিবেচনা করছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণের সম্ভাব্য ক্রেতার সংখ্যা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
এরই মধ্যে ইরানের সাথেদীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের বিরুদ্ধে নিজ ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ তুলে অনির্দিষ্টকালের নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। ইরানের আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনে আমিরাতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এ সিদ্ধান্তকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ট্রাম্পের জন্যও বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে। নভেম্বরে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে বিষয়টি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে।
সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে যুদ্ধের সমালোচনা করে প্রশ্ন তোলেন, ‘ট্রাম্প কবে এই বিপর্যয়কর ও প্রাণঘাতী যুদ্ধ থেকে সরে আসবেন?’
তবে শুক্রবার এক সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে জ্বালানির জন্য ‘সামান্য বেশি’ অর্থ দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য।
অন্যদিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথেশান্তি আলোচনা এখনো কার্যকরভাবে শুরু হয়নি। হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ নিয়েও ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা চলছে। ইরান জানিয়েছে, হরমুজ-সংক্রান্ত বিষয়সহ তাদের নির্ধারিত অন্যান্য শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাথেসরাসরি আলোচনায় বসবে না।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালীর ওপর মার্কিন বাহিনীর ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে। তবে সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা কেপলারের তথ্য বিশ্লেষণ করে আল জাজিরা জানিয়েছে, বর্তমানে জাহাজ পরিচালনাকারীরা মার্কিন নৌ অবরোধের চেয়ে ইরানের অবরোধ অমান্য করার ঝুঁকি নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন।
জনপ্রিয়তা কমছে ট্রাম্পের
যুদ্ধের পাশাপাশি জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও কমছে। রয়টার্স/ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপে মাত্র ৩৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ট্রাম্পের কর্মদক্ষতায় সন্তুষ্টি জানিয়েছেন। এটি তার দ্বিতীয় মেয়াদে সর্বনিম্ন জনপ্রিয়তার পর্যায় এবং ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের প্রথম মেয়াদের সর্বনিম্ন পর্যায়ের সমান।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে; এক বছর আগের তুলনায় পেট্রলের দাম প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি।
অথচ ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এড়িয়ে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। শুরুতে তিনি ইরানের সাথেসংঘাত কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছিলেন। এখন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে তার ওপর।



