এক দশক পর আবার সোমালিয়ার উপকূলে জলদস্যুদের দাপট

সেন্টার ফর মেরিটাইম সিকিউরিটির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ম্যাথিউ রাইজেনার জুলাইয়ে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নৌ অভিযান এবং লোহিত সাগরে ইরানের হাউছিদের হামলার কারণে অঞ্চলটির জলদস্যুরা আবার সুযোগ পাচ্ছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
সোমালিয়ার সশস্ত্র জলদস্যুরা একটি সৈকত পাহারা দিচ্ছে
সোমালিয়ার সশস্ত্র জলদস্যুরা একটি সৈকত পাহারা দিচ্ছে |দ্য গার্ডিয়ান

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ, গাজা ও লেবাননে ইসরাইলি আগ্রাসন ও সোমালিয়ার রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে আফ্রিকার শৃঙ্গের কাছাকাছি অঞ্চলে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে সোমালিয়ার জলদস্যুরা। গত এপ্রিলের শেষ দিক থেকে এখন পর্যন্ত দেশটির জলসীমায় অন্তত আটটি জাহাজ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে আগস্টেই মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ছিনতাই হয়েছে দুটি জাহাজ—একটি ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তেলবাহী ট্যাংকার এবং অন্যটি তুরস্কের জন্য সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী ক্যামেরুনের পতাকাবাহী জাহাজ ‘লুতুফ’।

সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে যুদ্ধ ও অস্থিতিশীলতা

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান ৮ সেপ্টেম্বর এক প্রতিবেদনে জানায়, ২০০৫ সাল থেকে সাত বছরে সোমালিয়ার উপকূলে এক হাজারের বেশি জাহাজে হামলা চালিয়েছিল জলদস্যুরা। আফ্রিকার সবচেয়ে দীর্ঘ উপকূলরেখার দেশটির জলদস্যুরা তখন হাজার হাজার নাবিককে জিম্মি করে প্রায় ৪০ কোটি ডলার মুক্তিপণ আদায় করেছিল। পরে বহুজাতিক জলদস্যুবিরোধী বাহিনী মোতায়েনের পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ‘লুতুফ’ ছিনতাই। ২০২৪ সালে সোমালিয়ার নৌবাহিনী শক্তিশালী করতে চুক্তির পর দেশটিতে প্রভাব বাড়াচ্ছে তুরস্ক। ছিনতাইয়ের দুই সপ্তাহ পর তুর্কি ও সোমালি বাহিনীর যৌথ অভিযানে জাহাজটি মুক্ত হয় এবং চারটি জলদস্যু নৌযান ধ্বংস করা হয়। তবে স্থানীয় কর্মকর্তা মোহাম্মদ মুবারক জানিয়েছেন, ২৫ লাখ ডলার মুক্তিপণও দেয়া হয়েছিল। এতে ভবিষ্যতে একই ধরনের ছিনতাই উৎসাহিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সেন্টার ফর মেরিটাইম সিকিউরিটির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ম্যাথিউ রাইজেনার জুলাইয়ে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নৌ অভিযান এবং লোহিত সাগরে ইরানের হাউছিদের হামলার কারণে অঞ্চলটির জলদস্যুরা আবার সুযোগ পাচ্ছে। এসব সংঘাতের কারণে একদিকে জলদস্যু দমনে নিয়োজিত আন্তর্জাতিক নৌবহরগুলো অন্যত্র ব্যস্ত হয়েছে, অন্যদিকে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো সোমালিয়ার উপকূলের কাছ দিয়ে চলাচল করায় জলদস্যুদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সমাধান করতে হবে স্থলেই

রাইজেনারের হিসাবে, হাউছিদের জাহাজে হামলা শুরুর আগে লোহিত সাগর দিয়ে চলাচল করা প্রায় ৭০ শতাংশ জাহাজ এখন দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তমাশা বা কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যাচ্ছে। তেলবাহী জাহাজও এখন বেশি আকর্ষণীয় লক্ষ্য, কারণ যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়েছে। জলদস্যুরাও বদলেছে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তারা আগে ছিনতাই করা জাহাজকে ‘মাদারশিপ’ হিসেবে ব্যবহার করে অন্য জাহাজে হামলা চালাচ্ছে। ‘লুতুফ’কে ছিনতাইয়ের সময় ‘এমভি সোয়ার্ড’ নামের আগে ছিনতাই করা একটি সিমেন্টবাহী জাহাজ ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি সম্ভাব্য লক্ষ্য শনাক্ত ও নিজেদের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগে স্পেসএক্সের স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেটও ব্যবহার করছে তারা। এর প্রভাব স্থলেও পড়ছে। উত্তর-মধ্য সোমালিয়ার মুদুগ অঞ্চলের বাণিজ্যিক কেন্দ্র গালকায়োর বাসিন্দারা বলছেন, ‘লুতুফ’-এর মুক্তিপণ দেওয়ার পর স্থানীয় অর্থনীতিতে আগের তুলনায় অনেক বেশি অর্থের লেনদেন শুরু হয়েছে। বেড়েছে উত্তেজক মাদক খাতের ব্যবহার, আর রাস্তায়ও দেখা যাচ্ছে আগের চেয়ে বেশি দামি স্পোর্টস ইউটিলিটি যান।

তবে জলদস্যু দমনের আসল লড়াই যে সমুদ্রের চেয়ে স্থলেই—সেই সতর্কবার্তাই দিয়েছেন গবেষকেরা। তাঁদের ভাষায়, 'জলদস্যুতা সমুদ্রভিত্তিক সমস্যা হলেও এর সমাধান করতে হবে স্থলেই।'