০১ ডিসেম্বর ২০২০

পিসিআর ল্যাব বাড়লেও কমছে পরীক্ষা

-

গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা শনাক্ত হওয়ার সময় দেশে একমাত্র ল্যাবরেটরি ছিল সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর)। প্রথম দিকে সেখানে দিনে ১০ থেকে ১২টি নমুনা পরীক্ষা হয়। ওই সময় করোনা উপসর্গের রোগীও ছিল হাতেগোনা। সময়ের সাথে সাথে দেশব্যাপী রোগীর সাথে পিসিআর ল্যাবের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে জুন মাসের শেষ দিকে ল্যাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৬৮টিতে এবং ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষা হতো ১৭ থেকে ১৮ হাজারের বেশি। জুলাই মাসের প্রথম দুই দিনেও ১৭ থেকে ১৮ হাজারের বেশি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় সারা দেশে করোনা উপসর্গের রোগীর সাথে ল্যাবরেটরির সংখ্যাও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৬টিতে। তবে রোগী ও ল্যাবরেটরি বাড়লেও হঠাৎ করেই নমুনা পরীক্ষা আগের থেকে অনেক কমে গেছে। গত ৩ জুলাই থেকে পরবর্তী পাঁচ দিন ল্যাবগুলোয় নমুনা পরীক্ষা হয়েছে মাত্র ১৩ থেকে ১৪ হাজার। এরই মধ্যে নতুন দু’টি ল্যাব যুক্ত হলেও গত দুই দিন আবার নমুনা ১৫ হাজারের ঘরে। উল্লিখিত ল্যাবে দিনে গড়ে ৩০ হাজারেরও বেশি পরীক্ষার সুযোগ থাকলেও অজানা কারণে তা হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে করোনা শনাক্তে নতুন নতুন আরটি-পিসিআর ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হচ্ছে। ল্যাবরেটরি বাড়ার সাথে সাথে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যাও আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। কিন্তু হচ্ছে উল্টোটা। নতুন ল্যাব সংযোজনের সাথে সাথে কমে যাচ্ছে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যাও। এতে করোনা পরীক্ষা করতে আসা মানুষের দুর্ভোগ চরম আকারে বাড়ছে। রাজধানীর পাশাপাশি বাইরের বিভিন্ন জেলার মানুষও এই দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। করোনা পরীক্ষায় সিরিয়াল না পাওয়া এবং নানা দুর্ভোগের কারণে রোগীদের অনেকেই পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। আর আক্রান্ত বা উপসর্গের রোগীরা যথাসময়ে পরীক্ষা করতে না পারায় স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। সেজন্য করোনা টেস্টের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা আরো বাড়াতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি আরটি-পিসিআর মেশিন দিয়ে দিনে অন্তত ৩০০ থেকে ৩ হাজার পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা করা যায়। করোনা রোগী শনাক্ত করতে বর্তমানে ৭৬টি পিসিআর ল্যাবরেটরি রয়েছে। এসব ল্যাবের কোনোটিতে একের অধিক পিসিআর মেশিন রয়েছে। এসব ল্যাবে দিনে কমপক্ষে ৩০ হাজার নমুনা পরীক্ষা সম্ভব। সেই তুলনায় অজানা কারণে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা অনেক কম হচ্ছে। অবিলম্বে এটি বাড়ানো দরকার।
আইইডিসিআরের এক কর্মকর্তা জানান, দেশের অনেক ল্যাবে একটি করে মেশিন রয়েছে। একটি মেশিনে এক শিফটে ৯৮টি নমুনা পরীক্ষা করা যায়। দুই বা তিন শিফট পর্যন্ত কাজ করা গেলে প্রায় ৩০০ নমুনা পরীক্ষা সম্ভব। যেসব ল্যাবে একাধিক মেশিন সেখানে পরীক্ষার সংখ্যা বেশি হবে। সেই হিসাবে ৭৪টি ল্যাবে একটি মেশিন তিন শিফট কাজ করলে দিনে ২২ হাজারের বেশি পরীক্ষা করা যাবে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য মতে, মার্চের শুরুতে একমাত্র পরীক্ষা কেন্দ্র ছিল আইইডিসিআর। ৩১ মার্চ পর্যন্ত পিসিআর ল্যাবরেটরি বেড়ে দাঁড়ায় ৬টিতে এবং ল্যাবগুলোয় ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষা হয়েছিল প্রায় দেড় শ’। এপ্রিল মাসের শুরুতে দুই শ’ থেকে আড়াইশ নমুনা পরীক্ষা হলেও মাসের শেষ দিকে পিসিআর ল্যাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮টিতে। তখন ল্যাবগুলোয় ২৪ ঘণ্টায় ৫ হাজারের কাছাকাছি নমুনা পরীক্ষা হয়। এরপর গত ১ মে ল্যাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩১টি এবং ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষা হয়েছিল সাড়ে ৫ হাজারের নমুনা। একই মাসের ৩১ তারিখে ল্যাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫২টিতে এবং ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষা হয়েছিল প্রায় ১২ হাজার নমুনা। এরপর জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে নমুনা পরীক্ষা বেড়ে প্রায় ১৪ হাজারে পৌঁছে। জুন মাসের শেষ দিকে ল্যাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৬৮টিতে এবং ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষা হতো ১৭ থেকে ১৮ হাজারের বেশি। জুলাই মাসের প্রথম দুই দিনেও ১৭ থেকে ১৮ হাজারের বেশি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। এরই মধ্যে ল্যাবরেটরির সংখ্যা বেড়ে ৭৪টি হলেও হঠাৎ করেই নমুনা পরীক্ষা আগে থেকে অনেক কমে গেছে। গত বুধবার পর্যন্ত পাঁচ দিন ধরে ল্যাবগুলোয় নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার। এর মধ্যে আরো দুটি ল্যাব সংযোজন হয়ে গত দুই দিন আবার নমুনা পরীক্ষা ১৫ হাজারের ঘরে ঘুরপাক খাচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের গত ১০ দিনের হিসাব মতে, গত ২৮ জুন দেশে পিসিআর ল্যাব ছিল ৬৮টি। এসব ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৮ হাজার ৯৯টি, ২৯ জুন একই সংখ্যক ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৭ হাজার ৮৩৭টি, ৩০ জুন একই সংখ্যক ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৮ হাজার ৪২৬টি। এরপর গত ১ জুলাই ল্যাবের সংখ্যা ছিল ৬৯টি। এসব ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৭ হাজার ৮৭৫টি। ২ জুলাই ল্যাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭০টিতে এবং নমুনা পরীক্ষা হয় ১৮ হাজার ৩৬২টি। তবে ৩ জুলাই ল্যাবের সংখ্যা বেড়ে ৭১টিতে দাঁড়ালেও এসব ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা কমে হয়েছে মাত্র ১৪ হাজার ৬৫০টি। ৪ জুলাই একই সংখ্যক ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৪ হাজার ৭২৭টি। ৫ জুলাই ল্যাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৩টিতে। এসব ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা হয় মাত্র ১৩ হাজার ৯৮৮টি। ৬ জুলাই একই সংখ্যক ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৪ হাজার ২৪৫টি। ৭ জুলাই ল্যাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৪টিতে এবং নমুনা পরীক্ষা হয় ১৩ হাজার ১৭৩টি। এভাবে শেষ ৫ দিনে করোনা রোগী শনাক্তকরণ পরীক্ষা আনুপাতিকহারে কম হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ৭৬টি ল্যাবে ১৫ হাজার ৬৩২টি নমুনা পরীক্ষা হয়।
গতকাল শুক্রবার দুপুর আড়াইটায় করোনাভাইরাস সংক্রান্ত নিয়মিত অনলাইন স্বাস্থ্য বুলেটিনে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা: নাসিমা সুলতানা জানান, সারা দেশে ৭৭টি ল্যাব আছে। সরকারি ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৪৭টি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৩০টি ল্যাব চালু আছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ১৪ হাজার ৩৭৭টি। এসব ল্যাবে মোট নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে মাত্র ১৩ হাজার ৪৮৮টি। আর এ পর্যন্ত সর্বমোট নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৯ লাখ ১৮ হাজার ২৭২টি।
ল্যাব বাড়ার সাথে সাথে নমুনা পরীক্ষা কেন কমে যাচ্ছে জানতে চাইলে আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা: এ এস এম আলমগীর হোসেন বলেন, নমুনা সংগ্রহ কম হওয়ায় পরীক্ষার সংখ্যা কমছে। প্রথম পরীক্ষায় যাদের করোনা পজিটিভ হয়েছিল তাদের দ্বিতীয় দফায় পরীক্ষা করে নেগেটিভ হয়েছে কি না দেখা হতো। এখন সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। আগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করাকালে একজন পজিটিভ হলে সেই পরিবারের অনেকে নমুনা দিতো। এখন প্রতিজনের নমুনা পরীক্ষার ফি ২০০ টাকা লাগে বিধায় অনেকে অপ্রয়োজনে নমুনাও দিচ্ছেন না। এ ছাড়া দেশের কিছু এলাকায় বন্যা দেখা দেয়ায় সেখানে নমুনা সংগ্রহ করা কম হচ্ছে। এসব কারণেও নমুনা সংগ্রহ কমছে।


আরো সংবাদ