০৪ এপ্রিল ২০২০

নাগরিকত্ব প্রমাণের নতুন মডেল!

-

সবাই জানত, অন্তত ভারতের সাংবাদিককুল! কিন্তু সবাই ভেবেছিল আমি তো সাংবাদিক অথবা হিন্দুগোষ্ঠীর; কাজেই এটা আমার সমস্যা নয়।
গত সোমবার থেকে দিল্লিতে রি রি করা ঘৃণা আর হিংসা ছড়ানোর দাঙ্গার আগুন লেগেছে। বলা ভালো লাগানো গেছে। এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৪৪ ধারা বা কার্ফু জারি করেও এখনো তা পুরো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এই নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ও এতগুলো মৃত্যু; এর তত্ত্বাবধান ও দায় কার?
ভারতের কনস্টিটিউশন অনুসারে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থতির সুরক্ষায় দায় রাজ্য সরকারের; কেন্দ্রের নয়। তবে কেন্দ্রের কাজ রাজ্য থেকে অনুরোধ পেলে কেন্দ্রের হাতে থাকা নানান নামের ‘বাড়তি রিজার্ভ ফোর্স’ রাজ্যকে ধারে সাময়িক সরবরাহ করা; কিন্তু এদের ওপরও নির্দেশ-পরিচালনা রাজ্যের হাতে। তবে কোনো কারণে যদি রাজ্য একেবারেই ফেল করে সে ক্ষেত্রে পুরো রাজ্য সরকারই ভেঙে দিয়ে প্রশাসনের কর্তৃত্ব নিজের হাতে তুলে নিতে পারে কেন্দ্র। যদি না কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্ত আবার কখনো পরে আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়ে না যায়। কিন্তু দিল্লি এসবের ব্যতিক্রম। সাফাইটা হলো, দিল্লি একটা রাজ্য; কিন্তু একই সাথে এটা ‘ন্যাশনাল ক্যাপিটাল অঞ্চল’Ñ মানে কেন্দ্রের সরকার যেখানে বসে। অতএব, দিল্লি পুলিশের কর্তৃত্ব দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর (বিজেপিবিরোধী কেজরিওয়ালের) হাতে নয়, খোদ কেন্দ্রের হাতে। যদিও এ নিয়ে পুলিশের ক্ষমতাহীন ঠুঁটো দিল্লি-মুখ্যমন্ত্রীর একটা মামলার ফয়সালা আদালতে মুলতবি আছে।
বিজেপি এ মাসেই শোচনীয়ভাবে হেরেছে দিল্লিতে। দিল্লি রাজ্য নির্বাচন শেষে গত ১১ ফেব্রুয়ারি ফল প্রকাশিত হয়েছিল। শোচনীয় এ জন্য যে, ২০০২ সালে গুজরাটে প্রায় হাজার দুই মুসলমান মেরে ফেলা দাঙ্গার রাজ্যসরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন অমিত শাহ। সেই ‘পারফরম্যান্স’ থেকে এ পর্যন্ত তবু তিনিই ক্ষমতার শিখরে চড়েই গেছেন। থামেননি। কিন্তু এই প্রথমবার দিল্লির নির্বাচনে তিনি মুসলমানবিদ্বেষী স্লে­াগান তোলা ভুল হয়েছে বলে স্বীকার করেন এবং টানা দুই দিন জনসমক্ষে আসেননি। কাজেই গত দু’দিনে দিল্লির জাফরাবাদের দাঙ্গা-ঘটানো এটা দিল্লি নির্বাচনে হারের প্রতিক্রিয়া। মুসলমানবিদ্বেষী উত্তেজনা তুলে হিন্দু ভোট জড়ো করার মেরুকরণ, এটা বাদ রাখতে বা ভুল মনে করতেই পারে না। এটাই তো বিজেপি!
ঘটনার মূল কেন্দ্র বলা হচ্ছে উত্তরপূর্ব দিল্লি জেলার জাফরাবাদ বা মৌজপুর মেট্রোস্টেশনের আশপাশ। আর গত রাত থেকে ভাইরাল হয়ে গেছে টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক রিপোর্ট, যা বাংলাদেশের অনেক মিডিয়া রাতেই অনুবাদ করে ছেপেছে। ওই রিপোর্টের লেখক এক ফটো জার্নালিস্ট। মিডিয়ায় তার কাজ রিপোর্ট লেখার নয় যদিও, তবুও কারণ, এই রিপোর্টটা খোদ ওই ফটো জার্নালিস্টকে নিয়েই।
ইতোমধ্যে অবশ্য ভারতের মিডিয়ায় ‘ভাষা’ বদলানো শুরু হয়েছে। এই ঘটনাকে সবাই রিপোর্ট করছে নাগরিকত্ব আইনের ‘বিরোধী’ আর ‘পক্ষের গ্রুপের’ লড়াই। কেউ কেউ বুদ্ধিমানের মতো কোনো পক্ষ থেকে মোদি মোদি স্লে­াগান ওঠার কথা লিখেছে। মানে সরাসরি বিজেপির নাম নেয়া বন্ধ হয়েছে।
ফটো জার্নালিস্ট কলকাতার বাঙালি অনিন্দ্য চ্যাটার্জি, দুপুর সাড়ে বারোটা থেকে প্রতি পদে নিজে হিন্দু কি না সেই পরিচয় দিতে বা ‘মেরুকরণের’ শিকার হতে বাধ্য হয়েছিলেন। মৌজপুর স্টেশনে এক ‘হিন্দুসেনা’ তাকে তিলক লাগিয়ে দিতে চেয়েছিল। নাছোড়বান্দা হয়ে বলা তার ডায়লগ ছিল, ‘তিলক লাগিয়ে নিলে আপনার কাজ করা সহজ হবে... আপনিও তো হিন্দু; কাজেই ক্ষতি কী?’।
সেই বিড়ম্বনা কাটিয়ে কিছু দূর এগিয়ে একটা আগুন লাগা বাসার দিকে যেতেই আবার বাধা। তিনি ছবি তুলতে যেতেই ওদের একজন বলে ওঠে, ‘আপনিও তো হিন্দু, কেন ও-দিকে যাচ্ছেন? আজ হিন্দুরা জেগে উঠেছে’। এভাবে বাধা পেয়ে ঘুরে অন্য দিক দিয়ে স্পটে পৌঁছতে চেষ্টা করলে এবার আরেক দল লাঠি হাতে যারা তাকে ফলো করেছিল সে বলে ওঠে ‘তুই তো দেখি খুবই চালাক! তুই কি হিন্দু, না মুসলমান? এরপরই তারা সাংবাদিক অনিন্দ্যর প্যান্ট খুলে ধর্মীয় চিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করে। কোনোমতে বিনয় দেখিয়ে মাফ চেয়ে তিনি পালিয়ে আসেন।
এর পরের বর্ণনা আরো চরমের। তিনি এবার এলাকা ছেড়ে পালানোর কথা ভাবছেন। একটা সিএনজি (অটো) পেয়ে তাতে চড়ে রওনা দেন। রাস্তায় চার তরুণ তাদের আটকে সিনজি থেকে জামার কলার ধরে টেনে-হিঁচড়ে বের করে তারা হিন্দু না মুসলমান জানতে চায়। তিনি নিজে নিরীহ সাংবাদিক বলে পার পেলেও ঘটনাচক্রে ড্রাইভার ছিল মুসলমান। বহু অনুনয় করে ড্রাইভাব ছাপোষা বলে সে যাত্রায় তারা পার পায়।
উপরের চারটা বর্ণনায়, আপনি হিন্দু হলে মাফ, না হলে টর্চার, তাতে মৃত্যু হলেও এরা বেপরোয়াÑ এটাই বিজেপির মেরুকরণের রাজনীতি। শুরুতেই কপালে তিলক এঁকে দেয়ার অফার, এর মানে হলোÑ সেই বুশের নীতি, হয় আপনি আমার পক্ষে না হয় আমার এনিমি’। আপনি হিন্দু হলে বিজেপির তিলক আপনাকে পরতেই হবে আর মুসলমান হলে নির্যাতিত বা মরণ সইতে হবে।
এই রিপোর্টের শুরুতে, ওসব বিজেপি কর্মীকে বর্ণনা করতে কিছু শব্দ ব্যবহার করেছেন তিনি। যেমন, এদের কারণেই দিল্লি ‘নিয়ন্ত্রণহীন’ হয়ে গেছে। এরা ‘মিসগাইডেড ইয়ুথ’। ‘আইন হাতে তুলে’ নেয়া ‘ভায়োলেন্স’ ছড়াচ্ছে। এরা ‘ধর্মীয় আইডেনটিটি’ভিত্তিক ভায়োলেন্স করছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, গত ছয় বছর ধরে এগুলোই কি ভারতে চালু ছিল না? মুসলমান হলে জয় শ্রীরাম বলানো, তাকে মাটিতে শুইয়ে বুকের উপর লাফ দিয়ে উঠে জোড়া পায়ের লাথিÑ অথচ চার দিকে গোল হয়ে নির্বিকার মজা দেখাÑ এই কমন চিত্র কি অনিন্দ্যরা দেখেনি? এমনকি মোদির সরকারের পক্ষ থেকে এগুলো সব গুজব বলে মন্ত্রীর বয়ান কি মিডিয়া ছাপেনি? তখন কি কেবল মনে হয়েছিল আমি তো সাংবাদিক অথবা হিন্দুগোষ্ঠীর! তাই নয় কি? তাহলে আজ অনিন্দ্যদের দুঃখের কথা কে শুনবে? সারা ভারতÑ সুপ্রিম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশন পর্যন্ত এই নষ্ট মেরুকরণের বিজেপিকেই রুখবার চেষ্টার দায়িত্ব পালন করেনি? বরং নির্বাচন করতে, ক্ষমতায় যেতে জায়গা করে দেয়নি? আজ আঁতকে উঠে লাভ কী?
বলা হয়, বিজ্ঞানের আবিষ্কারগুলো বেশির ভাগই নির্দিষ্ট করে খুঁজতে গিয়ে পাওয়া নয়। বরং অন্য কিছু খুঁজতে গিয়ে পথে পড়ে পাওয়া। দেখা যাচ্ছে মোদি-অমিতও নাগরিকত্ব প্রমাণের যে পথ খুঁজছিলেন এই ঘটনায় এর এক সহজ সমাধান পাওয়া গেছে। এখন দেখা যাচ্ছে, প্যান্ট খুলে দেখা, চেক করাই নাগরিকত্বের বেস্ট প্রমাণ। এত কাগজ এনআরসি, সিএএ বা এনপিআর ইত্যাদি এসবের আর প্রয়োজন কী!

 


আরো সংবাদ