‘দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খান খান!’—না, এখানে হীরক রাজার দেশের কোনো অত্যাচারী শাসককে গদি থেকে নামাতে জনতার সম্মিলিত পেশী শক্তি ব্যবহার করা হয়নি; কিংবা হাতের লীলা দেখিয়ে রাজ্য জয় করতে হয়নি। তবে জনতার সেই একই শক্তির অসামান্য লীলা জাপানে দেখা গেছে ১৬১১ সালে তৈরি এক দুর্গের ৩৬০ টন ওজনের এক সুবিশাল মিনার সরাতে! প্রযুক্তি ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ভিড়ে সেটি সরাতে কোনো দানবীয় ক্রেন আনা হয়নি; বরং সরাতে লেগেছে অন্তত ১,৮০০ মানুষের ৩৬০০ হাতের পেশী শক্তি, মোটা রশি আর কাঠের রোলার। প্রাচীন স্থাপত্যকে অক্ষত রেখে হাত দিয়ে টেনে দুর্গ সরানোর এই অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখে বিশ্বজুড়ে চরম বিস্ময়ের ঝড় উঠেছে।

ঐতিহাসিক হিরোসাকি দুর্গের মিনার
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) জানিয়েছে, জাপানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আওমোরি প্রশাসনিক অঞ্চলের ঐতিহাসিক হিরোসাকি দুর্গের প্রতিরক্ষামূলক দেয়াল বা প্রাচীর সংস্কারের পর এর মূল মিনারটিকে আগের নির্দিষ্ট জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। শত বছরের প্রাচীন ও জাতীয়ভাবে সংরক্ষিত এই স্থাপত্যকে না ভেঙে বা খুলে না ফেলে পুরোপুরি অক্ষত অবস্থায় সরানোর জন্য জাপানের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ‘হিকিয়া’ কৌশল বেছে নিয়েছেন প্রকৌশলীরা। মূলত ভবনের নিচে কাঠের রোলার ও ট্র্যাক বসিয়ে না ভেঙে টেনে সরানোর এই কৌশল জাপানে যুগ যুগ ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
টানার সময় চারপাশজুড়ে ওঠে উদ্দীপ্ত স্লোগান—‘সো-রে, সো-রে!’ বলতে পারেন, আমাদের মারো টান হেইওর জাপানি সংস্করণ। এই চাঙ্গা কণ্ঠে তাল মিলিয়ে একেকটি ৮০ জনের দল ৩০ মিটার দীর্ঘ একেকটি শক্ত রশি ধরে সজোরে টান দেন। বিশেষ রোলার ও ট্র্যাকে বসানো ৩৬০ টনের সুবিশাল কাঠামোটি শনিবার ১.১৩ মিটার এবং রবিবারে আরও ১.০৯ মিটার সামনে অগ্রসর হয়। হিরোসাকি সিটির উদ্যান ও সবুজায়ন বিভাগের প্রধান কেনসুকে হায়াসাকা জানান, ১,৮০০ জন স্বেচ্ছাসেবক নেওয়ার এই ঐতিহাসিক কর্মযজ্ঞে যোগ দিতে দেশ-বিদেশ থেকে প্রায় ৮,০০০ আবেদন জমা পড়েছিল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা থেকেও উৎসাহী পর্যটকরা কেবল এই দুর্গে টান দিতে জাপানে ছুতে এসেছিলেন।
হিরোশিমা থেকে একাই ছুটে এসেছিলেন ৬১ বছর বয়সী বৃদ্ধ মতোহারু নাকাতা। রশিতে টান দেওয়া শেষে আবেগপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, "১১ বছর আগেও ঠিক এভাবেই দুর্গটি টেনেছিলাম। আজ আবার এই সুযোগ পেয়ে দারুণ লাগছে।" মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলি বাহিনীর বর্বর বোমার আঘাতে যখন ফিলিস্তিনের শত শত বছরের প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহাসিক মসজিদ ও ঘরবাড়ি ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তখন সাধারণ মানুষের যৌথ শক্তিতে একটি ঐতিহ্যকে ভালোবাসার সাথে আগলে রাখার এই উদ্যোগ যেন আধুনিক সভ্যতার মুখে এক নীরব প্রতিবাদ ও বার্তা।

‘দড়ি ধরে মারো টান...'
অগাস্টের শেষ পর্যন্ত এই আনন্দমুখর আয়োজনে মোট ৪,১০০ জন স্বেচ্ছাসেবক হাত দিয়ে টেনে মিনারটিকে ৫ মিটার সরাবেন। এরপর বাকি ৭৩ মিটার পথ সরানো হবে যন্ত্রপাতির সাহায্যে। ২০৩৩ সাল নাগাদ সব কাজ শেষে এটি সাধারণের জন্য পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে।
যে সমাজে ক্ষমতার দম্ভ বা হিংসার থাবায় ঐতিহ্য ধ্বংসের খেলা চলে, সেখানে সাধারণ মানুষের হাতের ছোঁয়ায় ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার এই লড়াই প্রমাণ করে—জনতার ঐক্যবদ্ধ ‘টান’ কেবল কোনো অত্যাচারী রাজাকেই ধূলিসাৎ করে না, বরং চাইলে ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া গৌরবকেও স্বস্থানে ফিরিয়ে এনে মাথা উঁচু করে দাঁড় করাতে পারে!



