যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রের সূচক ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন : প্রতিবেদন

স্টকহোমভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ইলেকটোরাল অ্যাসিস্ট্যান্স—ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং বিচার পাওয়ার সুযোগ—সব কটির অবস্থাই অন্তত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
আন্তর্জাতিক আইন-কানুন থেকে সরে আসছে ওয়াশিংটন
আন্তর্জাতিক আইন-কানুন থেকে সরে আসছে ওয়াশিংটন |সংগৃহীত

ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘হুমকি ও পদক্ষেপের’ কারণে বিশ্বজুড়ে আইনের শাসনও উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে বলে জানিয়েছে একটি শীর্ষস্থানীয় গবেষণা সংস্থা।

স্টকহোমভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ইলেকটোরাল অ্যাসিস্ট্যান্স—ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং বিচার পাওয়ার সুযোগ—সব কটির অবস্থাই অন্তত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইডিয়ার বার্ষিক ‘গ্লোবাল স্টেট অব ডেমোক্রেসি’ প্রতিবেদনে ১৭৪টি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ১৯৭৫ সাল থেকে গণতন্ত্রের কার্যকারিতা পরিমাপ করে আসা এই আন্তঃসরকারি সংস্থার প্রতিবেদনটিকে এ ধরনের সবচেয়ে বিস্তৃত গবেষণা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়া বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রের অবনতি বিশেষভাবে স্পষ্ট। তবে এটি বিশ্বজুড়ে চলমান একটি বৃহত্তর প্রবণতারই অংশ। ২০২৫ সাল ছিল টানা ১১তম বছর, যখন গণতান্ত্রিক অগ্রগতির চেয়ে অবনতির মুখে পড়া দেশের সংখ্যা বেশি ছিল। সংস্থাটির রেকর্ডে এটিই সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণের সময়কাল।

প্রতিবেদনের লেখকেরা বলেছেন, ‘২০২৫ সালে গণতন্ত্রের জন্য বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ এবং এর ক্ষয় ঠেকানোর কঠিনতা—দুটিই যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট হয়েছে এবং আরো জটিল হয়েছে।’

তাদের ভাষায়, ‘প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্রুত নির্বাহী শাখায় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেন এবং ব্যক্তিগত কিছু লক্ষ্য এগিয়ে নেয়া ও কথিত শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে সেই ক্ষমতা ব্যবহার করেন... এর ফল হয়েছে ব্যাপক। দেশে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইনের শাসন দুর্বল হয়েছে এবং দীর্ঘদিনের মিত্রতা ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে।’

ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়ার মহাসচিব কেভিন কাসাস-জামোরা সতর্ক করে বলেছেন, গণতন্ত্রের অবনতি হলে সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়ে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের গবেষণার মূল বার্তা হলো, যেকোনো দেশের নিরাপত্তা কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে গণতন্ত্রে বিনিয়োগ থাকা উচিত। গণতন্ত্রের মানের অবনতি এবং সংঘাত বৃদ্ধির মধ্যে যে সম্পর্ক রয়েছে, নীতিনির্ধারণ বা জনপরিসরের বিতর্ক—কোথাও তা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে না।’

সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন পৃথক গবেষণা প্রতিষ্ঠান উপসালা কনফ্লিক্ট ডেটা প্রোগ্রামের তথ্যও একই দিকে ইঙ্গিত করছে। ১৯৪৬ সাল থেকে সংরক্ষিত তাদের তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সহিংস সংঘাতের সংখ্যা ছিল অন্য যেকোনো বছরের তুলনায় বেশি। আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংঘাতের সংখ্যাও ছিল সর্বোচ্চ।

তবে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের কথাও উল্লেখ করেছে ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়ার প্রতিবেদন। অস্ট্রেলিয়ায় বর্ণবাদবিরোধী কৌশল এবং শিশুদের অনলাইন গোপনীয়তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর মতামত নেয়া হয়েছে। সিরিয়ায়ও প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের দমনমূলক একনায়কতন্ত্রের পতনকে ইতিবাচক ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় তরুণদের নেতৃত্বে গণবিক্ষোভ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা নেতাদের সরিয়ে দিয়েছে। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘অল্প সময়ে ব্যাপক ও অর্থবহ সংস্কার করা কঠিন প্রমাণিত হয়েছে।’

কাসাস-জামোরা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ঘটনাপ্রবাহ যে অন্য দেশগুলোকেও প্রভাবিত করেছে, তা স্পষ্ট। ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়া ২০২১ সালে প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক ‘পশ্চাদপসরণশীল’ দেশের তালিকায় যুক্ত করে। সংস্থাটি বলেছিল, ২০১৯ সাল থেকেই দেশটিতে ‘দৃশ্যমান অবনতি’ শুরু হয়েছিল।

গবেষণা সংস্থাটি ৫০ বছরের গণতান্ত্রিক সূচকের ওপর ভিত্তি করে দেশগুলোর মূল্যায়ন করে। এরপর দেশগুলোকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়—গণতান্ত্রিক দেশ, ‘হাইব্রিড’ সরকার এবং কর্তৃত্ববাদী শাসন।

বিশ্বজুড়ে ২০২৫ সালে গণতন্ত্রের সবচেয়ে দুর্বল ক্ষেত্র ছিল আইনের শাসন। ৭১টি দেশ, অর্থাৎ মূল্যায়ন করা দেশগুলোর ৪১ শতাংশ, এ ক্ষেত্রে নিম্নমানের অবস্থানে ছিল। একই সঙ্গে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতিও হয়েছে। ২৯টি দেশে আইনের শাসনের সূচকে পতন ঘটেছে।

কাসাস-জামোরা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে যা ঘটে, তা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এখন নির্বাচন অস্বীকারের এক মহামারি চলছে। এর প্রথম রোগী হলেন হোয়াইট হাউসের বর্তমান বাসিন্দা।’

তবে তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রের মানের এই অবনতি অনিবার্য বা স্থায়ী—আমি তা বলতে রাজি নই। এটি ঘুরিয়ে দেয়া সম্ভব।’ তার ভাষায়, ‘আমরা একটি অস্থিতিশীল বিশ্বে বাস করছি। এর অর্থ হলো, এমন ঘটনাও ঘটতে পারে, যা ইতিবাচক রাজনৈতিক পরিবর্তনের নতুন সুযোগ তৈরি করবে।’

তবু নেপাল, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে ইতিবাচক কিছু লক্ষণ দেখা গেলেও সামগ্রিক চিত্রটি হতাশাজনক। প্রতিবেদনের লেখকেরা বলেছেন, ‘মানুষ গণতান্ত্রিক অবনতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালিয়ে গেলেও নাগরিক পরিসর সংকুচিত হচ্ছে।’ তাদের মতে, জনসম্পৃক্ততার বিরুদ্ধে কৌশলগত মামলা, বিদেশি এজেন্টবিষয়ক আইন এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার মতো পদক্ষেপের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে নাগরিক সমাজ ও নাগরিক অংশগ্রহণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।