বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পরপরই যারা রাষ্ট্রের রূপান্তরের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তারা জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে একদলীয় শাসন চাপিয়ে দিয়েছিলেন।
রোববার (১৯ জুলাই) রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) মিলনায়তনে ‘জুলাই শহীদ সাংবাদিক সম্মাননা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল (এনইসি)। এতে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির সভাপতি মাহমুদুর রহমান।
মির্জা ফখরুল বলেন, দীর্ঘ ১৫-১৬ বছরের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান এবং অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নতুন রাষ্ট্র নির্মাণের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ পেয়েছে। এই সুযোগের সৎ ব্যবহার করতে হবে। হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই, কারণ বাংলাদেশের মানুষ পরিবর্তন আনতে পারে।
তিনি বলেন, শহীদদের স্বজনদের সামনে দাঁড়ালে নিজেকে অপরাধী মনে হয়। দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অসংখ্য মানুষ প্রাণ দিয়েছেন, গুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে জুলাইয়ের আন্দোলনে ছাত্র-শ্রমিক-জনতার আত্মত্যাগ জাতির জন্য এক গভীর বেদনার স্মৃতি হয়ে থাকবে। এই আত্মত্যাগ যেন কখনো বিস্মৃত না হয়, সেজন্য ইতিহাস মনে রাখা জরুরি।
তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের মধ্য দিয়েই দেশে ফ্যাসিবাদী শাসনের পথ তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার একদলীয় শাসন কায়েমের লক্ষ্যে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করেছে এবং ভিন্নমত দমনে হত্যা, গুম ও নির্যাতনের পথ বেছে নিয়েছিল।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, দেশের মানুষ স্বাধীনতার পর থেকেই নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বারবার সংগ্রাম করেছে। এবারো সেই দীর্ঘ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াই হয়েছে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলন এবং পরবর্তীতে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ নতুন স্বপ্ন ও আশার জন্ম দিয়েছে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অল্প সময়ে ১৫ বছরের লুটপাট, ধ্বংস ও অব্যবস্থাপনা দূর করা সম্ভব নয়। তবে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে। কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও গণতান্ত্রিক শক্তির ওপর আস্থা রেখে এগিয়ে যেতে হবে।
মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপি কোনো বিপ্লবী দল নয়। বিএনপি একটি উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। দলটি বিশ্বাস করে নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে জনগণের কল্যাণে কাজ করতে। ৩১ দফা, জুলাই সনদ এবং জনগণের সাথে করা অঙ্গীকার বাস্তবায়নেই বিএনপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি বলেন, জুলাই সনদে যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের পাশাপাশি যেসব বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে, সেগুলো নির্বাচিত সরকার নিজ নিজ নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী বাস্তবায়ন করবে, এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। অথচ এ নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে।
সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আন্দোলন সংগ্রামের পাশাপাশি এখন আলোচনার রাজনীতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। সংসদীয় কমিটিতে অংশ নিয়ে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কারে সব রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা করা উচিত। আলোচনার মাধ্যমেই জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব।
তিনি আরো বলেন, বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মী কারাবন্দী হয়েছেন, লাখ লাখ মানুষের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং প্রায় ১ হাজার ৭০০ নেতাকর্মী গুমের শিকার হয়েছেন। শহীদ ও গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি রাষ্ট্র এবং সমাজের দায়বদ্ধতা রয়েছে। সরকারের কিছু উদ্যোগ থাকলেও তা আরো কার্যকর ও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন।
মির্জা ফখরুল বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এমন একটি রাষ্ট্র রেখে যেতে হবে, যেখানে অধিকার আদায়ে আর কাউকে প্রাণ দিতে হবে না। মতভেদ থাকলেও সঙ্ঘাত নয়, আলোচনার পথেই সমাধান খুঁজতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ পরিবর্তন আনতে সক্ষম এবং সেই পরিবর্তন অবশ্যই আসবে এ বিশ্বাস থেকেই সবাইকে এগিয়ে যেতে হবে।
দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন বাবর, প্রতিদিনের বাংলাদেশের সম্পাদক মারুফ খান কামাল, ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল ইসলামসহ জুলাইয়ে শহীদ সাংবাদিকদের পরিবারের সদস্যরা।
অনুষ্ঠানে জুলাই শহীদ সাংবাদিকদের পরিবারের মাঝে সম্মাননা ও নগদ অর্থ প্রদান করা হয়।



