দ্রুত নগরায়ণের ফলে সৃষ্ট জলবায়ু ঝুঁকি, আবাসন সঙ্কট ও জীবিকার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ‘জাতীয় নগর নীতি-২০২৫’, ‘স্থানিক পরিকল্পনা আইন-২০২৬’ এবং ‘জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (২০২৩-২০৫০)’ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে ১৬ দফা প্রস্তাবনা গ্রহণ করেছে ‘নবম আরবান ডায়ালগ-২০২৬’।
নগর ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ, অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনা এবং জলবায়ু সহিষ্ণু নগর উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে এসব সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
বুধবার (২৪ জুন) রাজধানী ঢাকার একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত আরবান আইএনজিও ফোরাম বাংলাদেশ আয়োজিত দিনব্যাপী এ সংলাপে বক্তারা বলেন, ক্রমবর্ধমান নগরায়ণের চাপে শহরগুলোতে আবাসন, পানি, স্যানিটেশন, জীবিকা ও পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়ছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা জরুরি।
সংলাপের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: সাইদুর রহমান খান।
তিনি বলেন, ‘উন্নয়ন কার্যক্রমের সাথে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে সম্পৃক্ত না করলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিশ্বে সফল উদাহরণ সৃষ্টি করলেও দ্রুত নগরায়ণের প্রেক্ষাপটে নগর দুর্যোগ প্রস্তুতি আরো জোরদার করতে হবে।’
সচিব জানান, ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রায় এক লাখ নগর স্বেচ্ছাসেবক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যার মধ্যে ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। একই সাথে ফায়ার সার্ভিস, আবহাওয়া অধিদফতর ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রস্তুতি, পূর্বনির্ধারিত অ্যাসেম্বলি পয়েন্ট, উদ্ধার সরঞ্জাম এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। দুর্যোগ প্রস্তুতিকে আরও টেকসই করতে শিক্ষা ব্যবস্থায় দুর্যোগ সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করা, স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, খাল পুনঃখনন, বৃক্ষরোপণ এবং জলবায়ু-সহনশীল নগর পরিকল্পনার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক এবং ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষাপটে নগর সক্ষমতা বৃদ্ধি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যমান অবকাঠামোগত ঘাটতি ও আর্থ-সামাজিক বৈষম্য দূর করতে সুপরিকল্পিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই।
সংলাপে গৃহীত ১৬ দফা ঘোষণাপত্রে বলা হয়, ভূমি মালিকানার আইনি জটিলতা নির্বিশেষে বস্তিবাসীসহ সব নাগরিকের নিরাপদ পানি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও উন্নত স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শহরাঞ্চলে ক্রমবর্ধমান দাবদাহ মোকাবিলায় জাতীয় হিট অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন, কর্মজীবী মায়েদের জন্য এলাকাভিত্তিক চাইল্ড কেয়ার হাব প্রতিষ্ঠা এবং বর্জ্য ও স্যানিটেশন কর্মীদের পৌর ব্যবস্থাপনার মূল কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করে তাদের ন্যায্য মজুরি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রস্তাব করা হয়।
ঘোষণাপত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে সবুজ ও নীল অবকাঠামো (গ্রিন অ্যান্ড ব্লু ইনফ্রাস্ট্রাকচার) উন্নয়নের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়।
দিনব্যাপী আয়োজিত সংলাপের তিনটি কারিগরি অধিবেশনে সাশ্রয়ী আবাসন, নগর জীবিকায়ন এবং জলবায়ু সহিষ্ণু উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এতে অংশ নেয়া কমিউনিটি প্রতিনিধিরা তাপপ্রবাহ, জলাবদ্ধতা, আবাসন সঙ্কট এবং মৌলিক সেবার ঘাটতির কারণে তাদের দৈনন্দিন জীবনসংগ্রামের নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান। তিনি সংলাপে গৃহীত সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
পুরো আয়োজনে বিভিন্ন প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন নগর বিশেষজ্ঞ ড. কে এম নুরুজ্জামান, জলবায়ু গবেষক অধ্যাপক ড. নাজনীন আহমেদ, সমাজবিজ্ঞানী ড. এম এ কাশেমসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি, নগর গবেষক ও নগরকর্মীরা।
আরবান আইএনজিও ফোরাম বাংলাদেশ ২০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার একটি সক্রিয় প্ল্যাটফর্ম। সংগঠনটি বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান নগরায়ণজনিত সমস্যা সমাধান, নগর দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছে।
আয়োজকদের মতে, সংলাপে গৃহীত কৌশলগত দলিল ও সুপারিশসমূহ ভবিষ্যতে জাতীয় পর্যায়ের আইন, নীতি ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে কার্যকর দিকনির্দেশনা হিসেবে ভূমিকা রাখবে।



