অতি বৃষ্টিতে বন্যা ও ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫১

৭ জেলায় পানিবন্দী আড়াই লাখের বেশি

আবহাওয়া অধিদফতর যে পূর্বাভাস দিয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে, আগামী পাঁচ দিনেও পরিস্থিতির তেমন একটা উন্নতি হবে না।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার একটি বন্যাক্রান্ত এলাকা
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার একটি বন্যাক্রান্ত এলাকা |নয়া দিগন্ত

টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা বৃষ্টিপাত প্রথমে পার্বত্য চট্টগ্রামে বন্যা, ভূমিধস ও মৃত্যুর কারণ হলেও এখন তা ঢাকাসহ বেশির ভাগ জেলাতেই জনজীবন বিপর্যন্ত করে তুলেছে।

অতিবৃষ্টি, পাহাড়ী ঢল ও পাহাড়ধসে ক্ষয়ক্ষতি ও ত্রাণ সামগ্রী বরাদ্দ ও বিতরণ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বন্যা আক্রান্ত জেলা সাতটি।

সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এ দুর্যোগে বান্দরবান, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলায় এপর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১ জনে। আহত হয়েছেন ৩৯ জন।

রোববার (১২ জুলাই) দেয়া ওই প্রতিবেদনে মন্ত্রণালয়টি জানিয়েছে, পার্বত্য জেলাগুলোর মধ্যে শুধুমাত্র কক্সবাজারেই ভূমিধসে এপর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ২৮ জনের।

বান্দরবানে সাতজন ও চট্টগ্রামে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে জানিয়েছে দুর্যোগ মন্ত্রণালয়।

বৈরী আবহাওয়া ও বন্যা পরিস্থিতির কারণে এরইমধ্যে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের তিন দিনের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।

এদিকে, আবহাওয়া অধিদফতর যে পূর্বাভাস দিয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে, আগামী পাঁচ দিনেও পরিস্থিতির তেমন একটা উন্নতি হবে না।

বরং আগামী পাঁচ দিনই আট বিভাগের কোথাও কোথাও হালকা থেকে মাঝারি ধরনের ভারী বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।

এর কারণ হিসেবে আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের উপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারী অবস্থায় বিরাজমান আছে।

এদিকে, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, পাঁচটি জেলার তিনটি নদীর পানি পাঁচটি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এছাড়াও আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে এবং উজানে ভারতের আসাম, মেঘালয় প্রদেশে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে বলেও জানিয়েছে এই কেন্দ্র।

বন্যা আক্রান্ত জেলায় মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতি

অতিবৃষ্টি, পাহাড়ী ঢল ও পাহাড়ধসে ক্ষয়ক্ষতি ও ত্রাণ সামগ্রী বরাদ্দ ও বিতরণ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পাঠানো রোববারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণে বন্যা আক্রান্ত হয়েছে সাতটি জেলা।

এর মধ্যে রয়েছে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ।

এসব জেলায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

একইসাথে, এসব জেলায় ২ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি পরিবার এখনো পানিবন্দী রয়েছে।

বন্যা আক্রান্ত সাত জেলায় ক্ষতিগ্রস্তদের আশ্রয়ের জন্য ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন আশ্রয় নিয়েছে বলে জানিয়েছে দুর্যোগ মন্ত্রণালয়।

এছাড়া সরকার বন্যা আক্রান্তদের নগদ টাকা ও চাল ত্রাণ দিয়েছে।

এদিকে, খাগড়াছড়ির সাজেক পর্যটন কেন্দ্রে আটকেপড়া পর্যটকদের এরইমধ্যে উদ্ধার করেছে সেনাবাহিনী। সেখানকার পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে।

এরইমধ্যে সড়ক, বাজার ও বাসাবাড়ি থেকে পানি নেমে যাওয়ায় ভোগান্তি কমেছে খাগড়াছড়ির মানুষের। ঘর-বাড়িতে ফিরেছে মানুষজন। দোকানপাট খুলতে শুরু করেছে।

তবে দুয়েকটি স্থানে এখনো জলাবদ্ধতা আছে এবং কিছু পরিবার এখনো পানিবন্দী রয়েছে।

এছাড়া গত তিন দিন ধরে বৃষ্টিপাতের মাত্রা কমেছে এবং থেমে থেমে বৃষ্টি হলেও ভারী বর্ষণ হয়নি খাগড়াছড়িতে।

এছাড়া, রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়িতে কয়েক স্থানে ভূমিধসের কারণে চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রাম বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত

চলমান বন্যা পরিস্থিতির কারণে আগামী ১৬ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে সব জেলায় এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।

শনিবার বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামানের সই করা এক অফিস আদেশে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।

বন্যা, বৃষ্টিপাত নিয়ে যে পূর্বাভাস

আগামী ২৪ ঘণ্টায় বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার সাঙ্গু, মাতামুহুরী এবং মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার মনু, ধলাই, খোয়াই ইত্যাদি ইত্যাদি নদীর পানি সমতলে কমে যেতে পারে এবং নদী সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলগুলোতে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

এদিকে, ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় গত ২৪ ঘণ্টায় ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর।

রোববার দুপুর ১২টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণের সতর্কবার্তা দিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর।

সক্রিয় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে এই বৃষ্টিপাতের সতর্কবার্তা দিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর।

আজ সোমবার রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারী ধরনের ভারী বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে অধিদফতর।

তবে, ঢাকা, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, খুলনা ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারী ধরনের ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে বলেও জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, পাঁচটি জেলার তিনটি নদীর পানি পাঁচটি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এর মধ্যে বান্দরবানে সাঙ্গু নদী, চট্টগ্রাম স্টেশনে দোহাজারী, সুনামগঞ্জের মারকুলি স্টেশনে ও সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ স্টেশনে কুশিয়ারা নদী এবং নেত্রকোনার কলমাকান্দা স্টেশনে সোমেশ্বরী নদীর বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র।

একইসাথে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় কয়েকটি নদীর পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতি হতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র।

এর মধ্যে মুহুরী, ফেনী, সেলোনিয়া, হালদা, সারিগোয়াইন, যাদুকাটা, সোমেশ্বরী ও ভুগাই-কংস, তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র।

এর ফলে ফেনী, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলায় স্বল্পস্থায়ী বন্যা হতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।