দেশকে জুয়া ও মাদকমুক্ত করার পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

‘বাংলাদেশ বর্তমানে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক লভ্যাংশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে, যেখানে কর্মক্ষম যুব জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সর্বোচ্চ। এই অমিত সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করতে সরকার মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে এবং তা কঠোরভাবে বাস্তবায়নে দৃঢ়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।’

নিজস্ব প্রতিবেদক

Location :

Dhaka City
ঢাকায় ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের আলোচনা সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ
ঢাকায় ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের আলোচনা সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ |নয়া দিগন্ত

‘বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী দেশকে জুয়া ও মাদকমুক্ত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে’ বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

শুক্রবার (২৬ জুন) ঢাকায় ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে 'মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস ২০২৬' উপলক্ষে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর আয়োজিত আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো: হাসান মারুফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ বর্তমানে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক লভ্যাংশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে, যেখানে কর্মক্ষম যুব জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সর্বোচ্চ। এই অমিত সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করতে সরকার মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে এবং তা কঠোরভাবে বাস্তবায়নে দৃঢ়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘দেশের সম্ভাবনাময় ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথ বিনির্মাণে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে তরুণ সমাজকে অবশ্যই মাদকমুক্ত রাখতে হবে। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে অন্যতম অঙ্গীকার ছিল দেশের যুব সমাজকে মাদক ও জুয়ার করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করা। আমরা সে অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছি।’

মন্ত্রী বলেন, ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সশস্ত্র মাদক কারবারিদের সাথে ফাইট করছেন, কিন্তু তাদের হাতে কোনো অস্ত্র নেই। এই আইনগত শূন্যতা ও আধুনিক চ্যালেঞ্জ দূর করতে আগামী ২-১ দিনের মধ্যে মহান জাতীয় সংসদে 'মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনী বিল' উত্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে এই বাহিনীকে একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন অর্গান হিসেবে শক্তিশালী করা হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারকারী সশস্ত্র মাদক কারবারি ও চোরাকারবারিদের শক্ত হাতে দমনে অধিদফতরের কর্মকর্তাদের যুগোপযোগী প্রশিক্ষণসহ ৯ এমএম পিস্তল ও আধুনিক অস্ত্র দেয়া হবে।’

আদালতে বিচারাধীন মাদক মামলার জট প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, শুধুমাত্র ঢাকাতেই প্রায় ৮০ হাজার মাদকের মামলা পেন্ডিং রয়েছে। বিচারক স্বল্পতার কারণে এই বিপুল সংখ্যক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি উত্তরণে সংশোধিত আইনে মামলার সংখ্যা বিবেচনায় যেখানে প্রয়োজন, সেখানে মাদকের দ্রুত বিচার নিশ্চিতে 'বিশেষ ট্রাইব্যুনাল' স্থাপনের কঠোর বিধান রাখা হচ্ছে। এ ছাড়া মাদক নিখুঁতভাবে শনাক্তকরণের জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরে আধুনিক 'ডগ স্কোয়াড' সংযোজন এবং সিআরপিসি অনুযায়ী আসামি গ্রেফতারের পর আইনি প্রক্রিয়ার অন্তর্বর্তী সময়ে রাখার জন্য 'হাজতখানা' স্থাপনের আইনি প্রস্তাব করা হয়েছে।

মাদকের রাসায়নিক পরীক্ষার জালিয়াতি রুখতে দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে উন্নত কেমিক্যাল ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হবে বলেও তিনি জানান।

ডিজিটাল অপরাধের চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে মাদক ও জুয়ার অপরাধসমূহ সাইবার স্পেস এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরিত হয়েছে। মাদক পাচারকারী চক্র বর্তমানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ ব্যবস্থার আড়ালে তরুণ সমাজকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে।’

তিনি বলেন, ‘১৮৬৭ সালের প্রাচীন জুয়া প্রতিরোধ আইন দিয়ে বর্তমান যুগের আধুনিক অনলাইন বেটিং ও ক্রিপ্টো-অপরাধ দমন সম্ভব নয়। মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ব্যবহার করে বেনামী সিমের মাধ্যমে ওটিপি ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে যে অর্থ পাচার বা মানি লন্ডারিং হচ্ছে, তা কঠোরভাবে ট্র্যাকিংয়ের জন্য এনটিএমসি-এর পরামর্শে আইনি কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হচ্ছে।’

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সরকার শুধু খুচরা বিক্রেতা বা বহনকারীদের ধরপাকড়েই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মাদক ব্যবসার মূল হোতা, অর্থ জোগানদাতা বা গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। মাদকের কালো টাকা দিয়ে অর্জিত সমস্ত অবৈধ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার জন্য নতুন সংশোধনীতে কঠোর ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮’ এবং ‘মানি Laundering প্রতিরোধ আইন, ২০১২’ এর আওতায় কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ইতোমধ্যে এ ধরনের ৯টি মানি লন্ডারিং মামলা দায়ের করেছে এবং আরও ২৩টি গুরুতর অনুসন্ধান বর্তমানে চলমান রয়েছে।’

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কোস্টগার্ড, র‍্যাব ও পুলিশের সমন্বিত ভূমিকার প্রশংসা করে মন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকার উত্তরার মতো জায়গায় জঘন্যতম সিনথেটিক ড্রাগ 'কিটামিন'-এর ল্যাবরেটরি আবিষ্কার হওয়া প্রমাণ করে অপরাধীরা কতখানি আধুনিক। প্রথাগত মাদকের পাশাপাশি নতুন সিনথেটিক ও সেমি-সিনথেটিক মাদক বা ‘নিউ সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্টেন্সেস’ (NPS)-এর প্রাদুর্ভাব মাদকাসক্তির ঝুঁকিকে আরো ঘনীভূত করেছে। তাই আমাদের আইনকেও অত্যাধুনিক করতে হবে।’

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘মাদকাসক্তি একটি মারাত্মক মানসিক ও শারীরিক ব্যাধি। যারা এর ফাঁদে পড়েছেন, তারা সমাজ বা রাষ্ট্রের চোখে অপরাধী নন, বরং তারা রোগী। তাই তাদের সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে বিভাগীয় পর্যায়ে ২০০ শয্যার সরকারি নিরাময় কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। একই সাথে সরকারি ও বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা এবং মনো-সামাজিক কাউন্সেলিং জোরদার করা হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বেসরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোর মানোন্নয়নে সরকার আর্থিক অনুদান বৃদ্ধি করেছে এবং এডিকশন প্রফেশনালদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘মাদক কোনো একক দেশের বা একক সংস্থার পক্ষে দূর করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন।’

তিনি দেশের যুবসমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষায় সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অভিভাবক, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজ এবং সকল স্বেচ্ছাসেবী ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান।

মন্ত্রী এর আগে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন প্রাঙ্গণে স্থাপিত মাদকবিরোধী বিশেষ স্টল পরিদর্শন করেন।

অনুষ্ঠানে মাদকবিরোধী জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের থিম সং প্রদর্শন করা হয়। মাদকাসক্তি থেকে মুক্ত একজন ব্যক্তি অনুষ্ঠানে তার অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেন। এছাড়া মন্ত্রী বার্ষিক মাদক প্রতিবেদন ও বিশেষ স্যুভেনিরের মোড়ক উন্মোচন করেন এবং মাদকবিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আয়োজিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার ও সনদপত্র তুলে দেন।

উল্লেখ্য, মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস' এর এবারের প্রতিপাদ্য হলো- ‘বিশ্ব মাদক সমস্যা: বিদ্যমান ইস্যু, নতুন চ্যালেঞ্জ, উদ্ভাবনী প্রতিক্রিয়া’।

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, মাদক নিরাময় ও গবেষণার সাথে জড়িত সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধিবৃন্দ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজ এবং প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার সাংবাদিকগণ উপস্থিত ছিলেন।