বাজেট ঘোষণার দুই মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তামাক কোম্পানিগুলো পুরনো দামের সিগারেট নতুন দামে বিক্রি করে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তামাক কর বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা। তাদের অভিযোগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্দেশনা অনুযায়ী পুরনো দামের সিগারেটের প্যাকেটে নতুন সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) উল্লেখ করার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা করা হচ্ছে না। পুরনো দামের প্যাকেটের সিগারেটই বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে।
রোববার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরোর সম্মেলন কক্ষে ‘জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রাজস্ব বৃদ্ধিতে তামাক কর নীতি’ শীর্ষক কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরো (বিইআর) ও বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি) যৌথভাবে এ কর্মশালার আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরোর পরিচালক মাসুদা ইয়াসমিন। প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব ড. মো. এনামুল হক।
কর্মশালায় ‘তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ, প্রোপাগান্ডা ও বাস্তবতা’ শীর্ষক সেশনে বিএনটিটিপির টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য, সাংবাদিক ও গবেষক সুশান্ত সিনহা এবং ‘বাংলাদেশের তামাক কর ব্যবস্থা’ শীর্ষক সেশনে বিএনটিটিপির প্রকল্প পরিচালক হামিদুল ইসলাম হিল্লোল সহায়ক হিসেবে বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিইআরের তামাক কর প্রকল্পের সিনিয়র প্রজেক্ট ও যোগাযোগ কর্মকর্তা ইব্রাহীম খলিল।
ড. মো. এনামুল হক বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর তামাক নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি বিস্তারিত তামাক কর নীতি থাকা প্রয়োজন। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে তামাক কর নীতির রূপরেখাসহ সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সরকারের রাজস্ব বাড়াতে এনবিআর একটি কার্যকর তামাক কর নীতি প্রণয়ন করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অধ্যাপক মাসুদা ইয়াসমিন বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাক নিয়ন্ত্রণে সরকারকে আরো কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। তামাকের ওপর নির্ভরতা পর্যায়ক্রমে কমিয়ে বিকল্প রাজস্ব আয়ের পথ খুঁজতে হবে। তামাকের কারণে সরকারের রাজস্ব আয়ের তুলনায় স্বাস্থ্য ব্যয় অনেক বেশি। তাই তামাকজাত পণ্যে কার্যকরভাবে কর বাড়ানোর উপায় বের করার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও জনস্বাস্থ্য খাতে গুরুত্ব দিতে হবে।
হামিদুল ইসলাম হিল্লোল বলেন, তামাকজাত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি ঠেকাতে তামাক কোম্পানিগুলো চোরাচালান নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ায় বলে তারা মনে করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, চোরাচালানসংক্রান্ত অনেক সংবাদ একই ধরনের এবং এসব ঘটনায় দায়ীদের শনাক্ত বা আটকের তথ্য পাওয়া যায় না। জাতীয় বাজেটের আগে চোরাচালানের খবর বাড়ার বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে সিগারেটের দাম কম। তাই চোরাচালান নিয়ে সাজানো ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের মাধ্যমে তামাক কোম্পানিগুলো জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। বাজেট প্রস্তাবনায় ‘তদূর্ধ্ব’ শব্দ বাদ দিয়ে তামাকজাত পণ্যে সুনির্দিষ্ট কর আরোপ এবং জাতীয় তামাক কর নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি।
সুশান্ত সিনহা বলেন, বাজেট পাসের পর দ্রুত নতুন দামের সিগারেট বাজারে সরবরাহ করার কথা থাকলেও তামাক কোম্পানিগুলো তা করছে না। বরং পুরনো দামের সিগারেট সরবরাহ করে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, তামাকজাত পণ্যে রাজস্ব ফাঁকির অন্যতম কারণ বর্তমান বহুস্তরভিত্তিক কর কাঠামো। রাজস্ব বাড়াতে এ কাঠামোর পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট তামাক কর কাঠামো চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এমআরপির চেয়ে বেশি দামে সিগারেট বিক্রি বন্ধে এনবিআর ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে যৌথভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।



