প্রধানমন্ত্রী

২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে কর্মীর হাতে রূপান্তর করতে হবে

‘ফ্যাসিবাদের সরকার কিভাবে দেশের শিক্ষাখাতকে ধ্বংস করেছিল আমরা তা দেখেছি। কৃষি ব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়েছিল। মানুষের কথা বলার অধিকার ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল। এ সবের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ ফুঁসে ওঠে। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে মানুষ সেই সরকারের পতন ঘটিয়েছে। এরপর দেশের মানুষ ভোটের মাধ্যমে তাদের পছন্দের সরকার গঠন করেছে।’

নয়া দিগন্ত অনলাইন
সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান |সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষ তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন দেখতে চায়। তারা দেখতে চায় প্রিয় মাতৃভূমিকে পৃথিবীর বুকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে।

তিনি বলেন, সামনে এগিয়ে যেতে এবং মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে দেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে কর্মীর হাতে রূপান্তর করতে হবে।

শনিবার (১৫ আগস্ট) রাজধানীর মহাখালীর টিঅ্যান্ডটি মাঠে মরহুমা প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দুস্থ, অসহায় ও অসুস্থ মানুষের মাঝে চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

তারেক রহমান বলেন, একটি শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে, তখনো তার হাঁটতে শিখতে ১৮ মাসের মতো সময় লাগে। আপনাদের নির্বাচিত সরকারের বর্তমান বয়স হলো মাত ছয় মাস। এই সময়ে আমরা কিভাবে আপনাদের উন্নয়নে কাজ করছি আপনারা দেখেছেন।

তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের সময় আমরা দেখেছি সামগ্রিকভাবে পুরো বাংলাদেশের কী অবস্থা হয়েছিল। আমরা দেখেছি কিভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়া হয়। কিভাবে মেগা প্রজেক্টগুলো নিজেদের লোক দিয়ে চার-পাঁচগুণ বেশি টাকা দিয়ে দেশের অর্থ বিদেশের পাচার করে দেয়া হয়েছে। দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরেকটি দেশের ওপর নির্ভরশীল করে তোলা হয়েছিল। সে সময় মানুষক বাধ্য করা হয়েছিল সেই দেশে গিয়ে চিকিৎসা নিতে।

তারেক রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদের সরকার কিভাবে দেশের শিক্ষাখাতকে ধ্বংস করেছিল আমরা তা দেখেছি। কৃষি ব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়েছিল। মানুষের কথা বলার অধিকার ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল। এ সবের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ ফুঁসে ওঠে। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে মানুষ সেই সরকারের পতন ঘটিয়েছে। এরপর দেশের মানুষ ভোটের মাধ্যমে তাদের পছন্দের সরকার গঠন করেছে।

তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে আমরা দেশের মানুষের কাছে ৩১ দফা উপস্থাপন করেছিলাম। এই ৩১ দফার মধ্যে আমরা বলেছি, নির্বাচিত হলে কিভাবে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, কিভাবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই। শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ও প্রশক্ষিণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানে কথা বলেছি, নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে তাদের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, এই সেই মাঠ, নির্বাচনের পর এই মাঠেই আমরা আমাদের প্রথম প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছি। আমরা মা-বোনদের দেওয়া ফ্যামিলি কার্ড এর মাধ্যমে সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছি। আমরা কৃষক ভাইদের পাশে দাঁড়িয়েছি তাদের কৃষক কার্ড দিয়ে ও ১০ হাজার টাকা লোন মওকুফ করে। সরকার গঠনের পর প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে আমরা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছি। দেশের ১৩ লাখ কৃষককে কৃষি লোন সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। অথচ পাশের দেশ কিভাবে বাঁধ তৈরি করে পানির সমস্যা সৃষ্টি করেছে। এর সমাধানে আমরা শহীদ জিয়ার খাল খননের কর্মসূচি আবার শুরু করতে চেয়েছিলাম নির্বাচনে জেতার পর। আমরা সরকার গঠনের পর একমাসের মধ্যে যেমন ফ্যামিলি কার্ড করেছি, তেমনি খাল খনন কর্মসূচির শুরু করেছি। এই ছয় মাসে আমরা নয়শো কিলোমিটারের মতো খাল খনন করেছি যার মাধ্যমে দেশের অনেক উপজেলার মানুষ যেমন পানির সুবিধা পাচ্ছে। কৃষকরা পাচ্ছে সেঁচের সুবিধা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ ৭১ সালে স্বাধীন হয়েছে। গণতন্ত্র বারবার হোঁচট খেয়েছে। সবসময় আমরা বলেছি গণতন্ত্রের কার্যক্রম দেশে চালু রাখতে পারলে জবাবদিহিতা থাকবে।

জবাবদিহিতা থাকলে দেশের মানুষের জন্য ভালো কাজ করা সম্ভব হবে। কারণ জবাবদিহিতার কারণে সরকার সেই সব পদক্ষেপ গ্রহণ করবে যেগুলোতে মানুষের ওপর হয়, দেশের উপকার হয়।

তিনি বলেন, আপনারা দেখেছেন, গ্রাম অঞ্চলগুলোতে বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের বেশির ভাগ শিশু সরকারি প্রাথমিক স্কুলে পড়ে। সমগ্র দেশে সরকারি প্রাইমারি স্কুলগুলোতে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ শিশু পড়াশোনা করে। আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি, তাদের প্রত্যেককে বছরে একটি করে নতুন স্কুল ড্রেস দেবো। একইসাথে ছোট ছোট বাচ্চাদের আমরা স্কুল ব্যাগ পর্যন্ত দেবো। সেটি শহরে হোক বা গ্রামে। ইনশাআল্লাহ আগামী এক মাসের মধ্যে এই কার্যক্রম শুরু হবে।

তারেক রহমান বলেন, এই সরকারকে বাংলাদেশের মানুষ নির্বাচিত করেছে। তাই সরকারের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে মানুষের জন্য কাজ করা। তাই আমরা মানুষের দৌরগোড়ায় স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দিতে প্রত্যেকটি উপজেলা হাসপাতালকে প্রথমে ৫০ বেড থেকে ১০১ বেড করার সিদ্ধান্ত নিলেও তিন দিন আগে সেটি ১৫১ বেডে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ইনশাআল্লাহ আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের ৫০৩টি উপজেলা হাসপাতালে এ ব্যবস্থা করা হবে। যেখানে মানুষ তার প্রয়োজন চিকিৎসা সুবিধা নিতে পারবে।

ফ্যাসিবাদের সরকার দেশের অর্থনীতি থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি ব্যবস্থাকে বিধ্বস্ত করে গেছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মানুষ এখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে দেশকে গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য নির্বাচিত সরকার হিসেবে আমরা দিন-রাত পরিশ্রম করছি।

তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকার বিদ্যুৎ সেক্টরেই প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা বিভিন্নভাবে দেনা করে রেখে গিয়েছে। আমি জানি বিগত কিছুদিন ধরে দেশের মানুষ বিদ্যুতের কষ্ট পাচ্ছে।

গ্যাস বাংলাদেশের একটি প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল। বাংলাদেশের নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ যে গ্যাস কূপগুলো রয়েছে বিগত ১৭ বছর স্বৈরাচাররা একটি গ্যাস কূপও নতুন করে খনন করেনি বা করতে দেয়নি। তারা এই পুরো সেক্টরটিকে বিদেশীদের হাতে ছেড়ে দিয়েছিল।

কিন্তু আপনাদের নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার সাথে সাথে আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বাপেক্স দেশের মাটিতে গ্যাস সংরক্ষণ কার্যক্রম দ্রুত শুরু করবে যাতে করে এই গ্যাস কূপের খনন নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের মানুষের হাতে থাকে।

এখন এই মূল্যবান গ্যাসের একটি বড় অংশ আমাদের বিদেশ থেকে নিয়ে আসতে হয়। জাহাজের মাধ্যমে এনে যে স্টোরেজের মধ্যে রাখতে হয় সেই সংখ্যা মাত্র দু’টি। বিগত অন্তবর্তকালীন সরকারের সময় আরেকটি জাহাজের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল কিন্তু পরে সেটিকে ক্যন্সেল করে তারা। আজকের দু’টি জাহাজের একটিতে হঠাৎ করে দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার কারণে গ্যাসের এই সমস্যা দেখা দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এরই মধ্যে কারিগরি ত্রুটি সারানো হয়েছে। আশা করি ইনশাআল্লাহ আল্লাহর রহমত থাকলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে গ্যাসের সমস্যা অনেকাংশে কমে আসবে। সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ যে বিদ্যুতের কষ্ট পাচ্ছেন আমি আন্তরিকভাবে তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি। কিন্তু আমরা কাজ করছি যত দ্রুত সম্ভব মানুষকে এই কষ্টের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য।

তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে আপনারা ৯১ সালে নির্বাচিত করেছিলেন এই আসন থেকে। ৯১ সালে তিনি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পরে আমরা দেখেছি ফ্যাসিবাদকে মানুষ এই দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে। তারা বলেছিল এক মিনিটের জন্য বিএনপি সরকারকে শান্তিতে থাকতে দেবো না। তারা বিভিন্ন অরাজকতা সৃষ্টি করে সেদিন চেষ্টা করেছিল সরকারকে ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য কিন্তু ৯১ সালেও বাংলাদেশের মানুষের সমর্থন ছিল বিএনপির পাশে। সেই জন্য সরকারকে তারা ব্যর্থ করতে পারেনি।

তিনি আরো বলেন, ইনশাআল্লাহ তৃতীয় জাহাজটি চলে আসলে গ্যাসের সমস্যার অনেকাংশে কমে যাবে। তবে এর জন্য অবশ্যই আমাদের ধৈর্য ধারণ করতে হবে। কারণ এই জাহাজগুলো বানাতে অযথেষ্ট সময় প্রয়োজন হয়। পৃথিবীর নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশে এই জাহাজগুলো তৈরি করে। অনেক দামি জাহাজ এগুলো। আমরা চাইনিজদের সাথে কথা বলেছি। তারা চেষ্টা করছে দ্রুত জাহাজ তৈরি করে বাংলাদেশে পাঠাতে। এর মধ্যে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথে কথা বলেছি। তারাও চেষ্টা করছে আমাদের গ্যাসে সহযোগিতা করতে।

তারেক রহমান বলেন, সবার উদ্দেশ্যে বলতে চাই বিএনপি জনগণের জন্য কাজ করছে। বিএনপির পরিকল্পনা রয়েছে জনগণের জন্য। ইনশাআল্লাহ আগামী সংসদে আগামী ১০ বছর আমরা কিভাবে এই দেশের মানুষের জন্য জ্বালানি সমস্যার সমাধান করব সেই পরিকল্পনা দেবো।

তিরি বলেন, আজকে এই সব রাজনৈতিক দলকে পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, জনগণের প্রতি আপনাদের দায়িত্ব থাকলে জনগণের সামনে আপনাদের পরিকল্পনা নিয়ে আসুন। আমি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলাম, দেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যা সমাধানে সরকারের চেয়ে ভালো পরিকল্পনা দিলে বা আগামী ছয় মাসের মধ্যে সমস্যা সমাধান করতে পারলে তাদের প্রত্যেকটি পরিকল্পনা আমরা বাস্তবায়ন করব। আর শুধু জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য গুজব ছড়ালে অবশ্যই তাদের জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, আজ আমি কি পেলাম সেটি বড় কথা নয়। দেশকে, দেশের মানুষকে আমি কি দিতে পারলাম সেটি বড় কথা। আসুন এ কথাকে মনে ধারণ করে, এই কথার ওপর শপথ গ্রহণ করে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে হাত তুলে মোনাজাত করি। দেশ গঠনের যে পথ আমদের শহীদ জিয়া দেখিয়ে গিয়েছেন, যে পথে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া চলেছেন প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে আমরা সেই পথে দেশকে ধাবিত করতে চাই।

তিনি বলেন, বাংলাদেশকে সেই পথে এগিয়ে নিতে চাই। জননেত্রী খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিনে এই হোক আমাদের শপথ। এটাই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা।

অনুষ্ঠানে ঢাকা-১৭ আসনের বিভিন্ন অঞ্চলের নেতারা বক্তব্য দেন। এ সময় মঞ্চ উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো: শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, ঢাকা-১৭ আসনের প্রতিনিধি ও প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব-২ আব্দুর রহমান সানী প্রমুখ। বাসস