সেরা ৮ লিগ্যাল এইড অফিসারকে স্বীকৃতি দেবে সরকার

‘নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে আইনগত সহায়তা সেবা প্রদানে অসাধারণ ও অনুকরণীয় ভূমিকা রাখা কর্মকর্তাদের যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যেই দেশের আটটি বিভাগের প্রতিটি থেকে একজন করে মোট আটজন সেরা লিগ্যাল এইড অফিসারকে স্বীকৃতি দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।’

নিজস্ব প্রতিবেদক
‘অ্যাকিলারেটিং ডিজিটাল লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের দুই দিনব্যাপী সমন্বয় সভা
‘অ্যাকিলারেটিং ডিজিটাল লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের দুই দিনব্যাপী সমন্বয় সভা |নয়া দিগন্ত

আইনগত সহায়তা সেবায় অসাধারণ ও অনুকরণীয় ভূমিকা রাখা দেশের আটজন লিগ্যাল এইড অফিসারকে স্বীকৃতি দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশের আটটি বিভাগের প্রতিটি থেকে একজন করে মোট আটজনকে ‘সেরা লিগ্যাল এইড অফিসার’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হবে।

শনিবার (১৫ আগস্ট) সকালে গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুরে ব্র্যাক-সিডিএমে বিচারক, লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অংশগ্রহণে ‘অ্যাকিলারেটিং ডিজিটাল লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের দুই দিনব্যাপী সমন্বয় সভার উদ্বোধনকালে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান এ উদ্যোগের কথা জানান।

আইনমন্ত্রী বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদফতরের মহাপরিচালককে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। তার মতে, মাঠপর্যায়ে অসাধারণ কর্মদক্ষতা দেখানো কর্মকর্তাদের স্বীকৃতি দিলে তাদের কাজের প্রতি উৎসাহ বাড়বে এবং অন্য কর্মকর্তারাও ভালো কাজ করতে অনুপ্রাণিত হবেন।

আইনমন্ত্রী বলেন, নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে আইনগত সহায়তা সেবা প্রদানে অসাধারণ ও অনুকরণীয় ভূমিকা রাখা কর্মকর্তাদের যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যেই দেশের আটটি বিভাগের প্রতিটি থেকে একজন করে মোট আটজন সেরা লিগ্যাল এইড অফিসারকে স্বীকৃতি দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, লিগ্যাল এইড কর্মকর্তারা সুবিধাবঞ্চিত মানুষের ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাদের কার্যক্রম আরো গতিশীল ও কার্যকর করতে স্বীকৃতি ও প্রণোদনার ব্যবস্থা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

আইনমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের স্বীকৃতি শুধু কর্মকর্তাদের কর্মসম্পাদনে উৎসাহ বাড়াবে না, তাদের আর্থিক প্রণোদনা দেয়ার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয়টি বিবেচনায়ও এ স্বীকৃতি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এর মাধ্যমে লিগ্যাল এইড কর্মকর্তাদের মধ্যে দক্ষতা, জবাবদিহি ও সেবার মান বাড়ানোর প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

শুধু লিগ্যাল এইড কর্মকর্তাই নন, বিচার বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেও অসাধারণ ও অনুকরণীয় কর্মসম্পাদনের জন্য ২০ জনকে স্বীকৃতি দেয়ার উদ্যোগ নেয়ার কথা জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী।

তিনি বলেন, সারাদেশের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের কর্মসম্পাদন মূল্যায়নের মাধ্যমে এই ২০ জনকে নির্বাচন করে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।

আইনমন্ত্রীর এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বিচারিক ও আইনগত সহায়তা সেবায় কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা আরো বাড়ানো এবং জনগণের প্রতি তাদের দায়িত্বশীলতা জোরদার করা।

Law Minister 2

সমন্বয় সভায় সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ডিজিটাল আইনি সহায়তা কার্যকরভাবে পৌঁছে দেয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে আলোচনা করা হয়।

এ লক্ষ্যে নয়টি জেলার ৫৭টি উপজেলা লিগ্যাল এইড কমিটি এবং ৪১৩টি ইউনিয়ন লিগ্যাল এইড কমিটির কার্যক্রম আরো কার্যকর ও সমন্বিত করার উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়। জেলাগুলো হলো রাজবাড়ী, হবিগঞ্জ, বরগুনা, নেত্রকোনা, জয়পুরহাট, ঠাকুরগাঁও, ঝিনাইদহ, খাগড়াছড়ি ও বগুড়া।

এসব কমিটিকে তৃণমূল পর্যায়ে আইনি সহায়তা পৌঁছে দেয়ার কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে দরিদ্র, নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত মানুষ সহজে আইনি পরামর্শ ও সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আদালতে যাওয়ার আগেই মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরির বিষয়েও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। মামলাজট কমাতে মধ্যস্থতার কার্যকারিতার ওপর সরকার সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এর আগে আইনমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, কার্যকর বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালু করা গেলে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

আইনমন্ত্রী বলেন, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা মানবাধিকার নিশ্চিত করারই অংশ। প্রত্যেক মানুষের কিছু অবিচ্ছেদ্য, সহজাত ও সার্বজনীন অধিকার রয়েছে। নাগরিকরা যাতে এসব অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

তিনি বলেন, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার শুধু বিরোধ নিষ্পত্তি বা মধ্যস্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মূল লক্ষ্য প্রত্যেক নাগরিকের মানবাধিকার সংরক্ষণ, সুরক্ষা ও নিশ্চিত করা। এমনকি গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিরও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার রয়েছে এবং রাষ্ট্রকে তা নিশ্চিত করতে হবে।

আইনি সহায়তা সেবাকে আরো সহজলভ্য করতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন আইনমন্ত্রী। তার মতে, প্রযুক্তির মাধ্যমে আইনি সহায়তা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি আবেদন গ্রহণ, মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ আরো সহজ করা সম্ভব।

তবে ডিজিটাল সেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের সম্ভাব্য ঝুঁকিও বিবেচনায় নেয়ার কথা বলেন তিনি।

সভায় আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০-এর ২০২৬ সালের সংশোধনীর আলোকে অনলাইন বিরোধ নিষ্পত্তি বা ওডিআর ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং মধ্যস্থতার সাথে ডিজিটাল আইনি সহায়তা ব্যবস্থার সমন্বয় নিয়েও আলোচনা হয়।

ডিজিটাল লিগ্যাল এইড সিস্টেমের নকশা, উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন এবং এ বিষয়ে পরিচালিত গবেষণার ফলাফলও সভায় উপস্থাপন করা হয়।

দেশে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ বিচারাধীন মামলা রয়েছে উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী আগামী এক বছরের মধ্যে মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার লক্ষ্য জানিয়েছেন। এর আগে জুলাইয়ে তিনি বলেছিলেন, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ২০ লাখে নামিয়ে আনা সম্ভব।

মামলাজট কমাতে লিগ্যাল এইড, মধ্যস্থতা, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও বিচারিক কার্যক্রমের সমন্বিত ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। বিশেষ করে যেসব বিরোধ আদালতে মামলা করার আগেই মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা সম্ভব, সেসব ক্ষেত্রে লিগ্যাল এইড ব্যবস্থাকে কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

সভায় বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অধিদফতরের মহাপরিচালক মো: মঞ্জুরুল হোসাইনের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন ইউএনডিপি বাংলাদেশের সিনিয়র রুল অব ল, জাস্টিস অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার রোমানা শোয়েগার, বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স বাইবা জারিনা এবং আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা।

দুই দিনব্যাপী সভার দ্বিতীয় দিনে জেলা ও দায়রা জজরা প্রশিক্ষণ, লিগ্যাল এইড কমিটির কার্যক্রম, আইনি সহায়তা-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ ও প্রতিবেদন প্রণয়ন বিষয়ে আলোচনা করবেন। একইসাথে নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের জন্য বিচারিক সেবা ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হবে এবং ডিজিটাল সেবা উন্নয়নের ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হবে।