রোহিঙ্গাদের জাতিগত পরিচয় অস্বীকার করে মিয়ানমারের বিবৃতি কী বার্তা দিচ্ছে

বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরে থাকা তিন লাখের কিছু বেশি ‘বাস্তুচ্যুত’ মানুষকে ফিরিয়ে নিতে ইচ্ছার কথা যেমন বলা হয়েছে, তেমনি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেয়া তালিকায় যে সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে, তা নিয়ে আপত্তিও জানিয়েছে দেশটি।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
রাখাইনে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের পর বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় আট লাখের বেশি রোহিঙ্গা
রাখাইনে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের পর বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় আট লাখের বেশি রোহিঙ্গা |ফাইল ছবি

মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আবারো ‘বাঙালি’ দাবি করে নতুন একটি বিবৃতি দিয়েছে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। রাখাইনের বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া ব্যক্তিদেরই ফেরত নেয়া হবে বলে এতে বলা হয়েছে।

মিয়ানমারের দেয়া ওই বিবৃতিতে রাখাইন রাজ্যের ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে’ বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরে থাকা তিন লাখের কিছু বেশি ‘বাস্তুচ্যুত’ মানুষকে ফিরিয়ে নিতে ইচ্ছার কথা যেমন বলা হয়েছে, তেমনি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেয়া তালিকায় যে সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে, তা নিয়ে আপত্তিও জানিয়েছে দেশটি।

এছাড়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করে মিয়ানমার দাবি করেছে, যে জাতিগত নামে (রোহিঙ্গা) তাদেরকে পরিচয় করানো হচ্ছে সেই নামে কোনো গোষ্ঠী দেশটিতে নেই।

মিয়ানমারের এই বিবৃতি নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি বাংলাদেশ।

তবে বিবৃতিটিকে পুরনো কৌশলের পুনরাবৃত্তি হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, বিবৃতিতে যেসব ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তার মাধ্যমে কেবল নিজস্ব ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে মিয়ানমার।

একইসাথে এই বিবৃতির মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে আবারো আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি হলো বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।

বিবৃতিতে যা বলা হয়েছে

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে শনিবার একটি বিবৃতি দিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। যেখানে দাবি করা হয়েছে যে, এই ইস্যুতে গণমাধ্যমে ‘একপেশে, ভুল তথ্য ও অপতথ্য’ প্রচার করা হচ্ছে। তাদের জাতিগত পরিচয় নিয়েও বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে বলে দাবি দেশটির।

তারা বলছে, অন্যান্য দেশে যাওয়া ব্যক্তিদের ‘মিয়ানমারে কখনো না থাকা একটি জাতিগত পরিচয়’ দিয়ে পরিচিত করা হচ্ছে।

‘বাংলাদেশের ক্যাম্পে থাকা সবাইকে মিয়ানমারের বলে প্রচার করা হচ্ছে। অন্যান্য দেশে যাওয়া ব্যক্তিদের— মিয়ানমারে কখনো না থাকা একটি জাতিগত পরিচয় দেয়া হচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে’ বলে বিবৃতিতে উদ্বেগ জানিয়েছে মিয়ানমার।

এছাড়া বাংলাদেশের প্রসঙ্গ টেনে বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, ‘দুই দেশের মধ্যে সমাধানের বিষয় হলেও এটিকে আন্তর্জাতিক ইস্যু হিসেবে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।’

মিয়ানমারের দাবি, ২০১৬ সালের অক্টোবর-নভেম্বর ও ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে আরসা ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ পুলিশ ফাঁড়ি ও ব্যাটালিয়নে সমন্বিত হামলা চালায়। যার ‘প্রতিরক্ষামূলক জবাব’ হিসেবে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালায় দেশটির রাষ্ট্রীয় বাহিনী। আরসার হুমকির কারণে স্থানীয় জাতিগোষ্ঠীর মানুষ অন্য শহর ও গ্রামে চলে যায়, আর ‘বিপুল সংখ্যক বাঙালি’ বাংলাদেশে পালিয়ে যায়।

মিয়ানমারের দাবি, আরসার হামলার আগে বুথিদং, মংডু ও রাথিডং টাউনশিপে ৭ লাখ ৪০ হাজারের বেশি ‘বাঙালি’ বসবাস করত। ঘটনার পর সেখানে দুই লাখের বেশি থেকে যায় এবং ৫ লাখ ৪০ হাজার বাংলাদেশে চলে যায়।

এই হিসাবের ভিত্তিতে মিয়ানমারের দাবি, ‘রাখাইন থেকে ১০ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত’— এই তথ্যটি সঠিক নয়।

বিবৃতি অনুযায়ী, বাস্তুচ্যুতদের ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশের সাথে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে তিনটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করেছে মিয়ানমার।

চুক্তি অনুযায়ী তিন দফায় তাদেরকে ফেরত নেয়ার প্রস্তুতি নেয়া হলেও ‘একজনও ফেরত যায়নি’ বলে দাবি করেছে নেপিদো।

বাংলাদেশের দেয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকার মধ্যে ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত মিয়ানমার ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনকে যাচাই করেছে।

যার মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জন রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা বলে প্রমাণিত, ৪ হাজার ২৪১ জন ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত’ বলে চিহ্নিত এবং ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।

যাচাই হওয়া বাস্তুচ্যুতদের দ্রুত ফেরত নিতে ‘আন্তরিক সদিচ্ছা’ নিয়ে কাজ চলছে বলেও জানিয়েছে মিয়ানমার।

তারা বলছে, রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরো স্থিতিশীল হলে যাচাই হওয়া রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দাদের গ্রহণ করা হবে।

মিয়ানমার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বিবৃতির প্রেক্ষিতে শনিবার রাত পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি বাংলাদেশ। এ নিয়ে বিবিসির পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া জানতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।

পুরনো কৌশল

২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে সেনাবাহিনীর নির্যাতনে মুখে প্রায় সাড়ে ৭ লাখের মতো রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়।

এর আগে ও পরে বিভিন্ন সময় আরো প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখের মতো রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে এসেছে।

গত ২৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১১ লাখ ৮৯ হাজার।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে অং সান সু চি’র নেতৃত্বাধীন মিয়ানমারের তৎকালীন বেসামরিক সরকারের সাথে বাংলাদেশ একটি চুক্তি করেছিল, যার মধ্যস্থতা করেছিল চীন।

এর অংশ হিসেবে ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বরের মধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রথম দলটিকে মিয়ানমারে নিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও সেটি আর বাস্তবে আলোর মুখ দেখেনি।

এরপর ২০১৯ সালে আগস্টে চীনের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর আরেকটি উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু নাগরিকত্বের বিষয়টি সুরাহা না হওয়ায় রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় যেতে চায়নি।

২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে আট লাখ রোহিঙ্গার একটি তালিকা মিয়ানমারকে দিয়েছিল বাংলাদেশ।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে দ্বিপক্ষীয়, বহুপক্ষীয় আলোচনা এবং সমঝোতার চেষ্টা হয়েছে একাধিকবার। কিন্তু তাদের নিজ দেশে ফেরত যাওয়ার প্রসঙ্গ আলোচনায় এলেও বাস্তব রূপ পায়নি।

এবার যে বিবৃতি মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিয়েছে, সেটিকে সময়ক্ষেপণের পুরনো কৌশল হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

এছাড়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশ যে অবস্থান তৈরি করেছে, তার বিপরীতে নিজেদের একটি পাল্টা অবস্থান এই বিবৃতির মাধ্যমে তৈরির চেষ্টা মিয়ানমার করেছে বলেও মত অনেকের।

মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘অতীতে নানাভাবে সময়ক্ষেপণের যে চেষ্টা মিয়ানমারের ছিল, এবারো সেই পথেই হেঁটেছে তারা।’

তিনি বলেন, ‘অতীতেও বাংলাদেশ যখন আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের তালিকা পাঠিয়েছিল, তখনও সেটি নিয়ে যাচাইবাছাইয়ের নামে সময়ক্ষেপণের কৌশল নিয়েছিল মিয়ানমার।’

‘অতীতে যখন তারা প্রত্যাবাসনে রাজি হলো তখনো এমন একটি সংখ্যা তারা উল্লেখ করেছিল। যেখানে একই পরিবারের দুইজনকে হয়তো বৈধ বলেছে, আর একজনকে বলেছে অবৈধ। অর্থাৎ বাবাকে নিচ্ছে, মা বাদ; আবার মা-বাবা বৈধ, কিন্তু সন্তান বাদ। এরকম একটা দুষ্টু বুদ্ধির কারণে পরে আর রিপাট্রিয়েশন হয়নি,’ বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

এবারো মিয়ানমার সেই কৌশল নিয়েছে বলেই মনে করেন বিশ্লেষকদের অনেকে।

এছাড়া, আন্তর্জাতিক পরিসরে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিয়ে নিজেদের অবস্থানও মিয়ানমার প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে বলে মনে করেন শরণার্থী বিষয়ে বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর।

তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক পরিসরে রোহিঙ্গা ক্রাইসিস সমাধান নিয়ে যে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে, তার কাউন্টার হিসেবে মূলত এই ন্যারেটিভটা তারা সামনে এনেছে।’

রোহিঙ্গা নামে কোনো জাতিগোষ্ঠী মিয়ানমারে নেই, এই বিষয়টিও আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিষ্ঠিত করারও একটি চেষ্টা এই বিবৃতিতে রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

১৩৫টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি দেয় না মিয়ানমার। তারা রোহিঙ্গাদের বারবরই ‘বাঙালি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে।

‘এটা তাদের এক ধরনের ছক, যেটা আমরা আগেও দেখেছি। এটা বিশ্বাস করার আসলে তেমন কারণ নেই যে তারা সত্যিকার অর্থেই ফেরত নেবে,’ বলেন আসিফ মুনীর।

এছাড়া এই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা, তারা বাঙালি না রোহিঙ্গা এসব নিয়ে এই বিবৃতিতে নানা বক্তব্য থাকলেও তাদের ফিরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে যে প্রস্তুতি বা নিরাপত্তার বিষয়গুলো রয়েছে তা নিয়ে কোনো আলোচনা নেই।

আসিফ মুনীর বলেন, ‘মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বর্তমানে যে সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের ইতিবাচক অবস্থান দেখানোর একটি চেষ্টা হতে পারে।’

‘মিয়ানমারে ক’দিন আগেই নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সরকার গঠন হয়েছে। যদিও অভিযোগ রয়েছে যে, এটি তাদের যে মিলিটারি গভর্নমেন্ট তাদেরই স্বীকৃতি দেয়ার একটা প্রক্রিয়া। এই গণতান্ত্রিক রূপটিকেও তারা এই বিবৃতির মাধ্যমে জায়েজ করার চেষ্টা করেছে,’ বলেন তিনি।

অবশ্য মিয়ানমারের এই বিবৃতি দেয়ায় দীর্ঘদিন পরে হলেও এই ইস্যুতে আলোচনার একটি সুযোগ আবারো তৈরি হলো বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সূত্র : বিবিসি