গাজীপুরে অটোরিকশাচালক হত্যা : রহস্য উদ্ঘাটন, গ্রেফতার ৩

পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০ আগস্ট বিকেলে আতাউর রহমানকে ফোন করে ডেকে নির্জন কলাবাগানের পাশে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রশি দিয়ে গলা চেপে ধরে এবং লোহার রড ও হাতুড়ি দিয়ে মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে তাকে হত্যা করা হয়।

মোহাম্মদ আলী ঝিলন, গাজীপুর

Location :

Gazipur
পিবিআই’র প্রেস ব্রিফিং, (ডানে) গ্রেফতার হত্যার সাথে জড়িত দুই আসামি
পিবিআই’র প্রেস ব্রিফিং, (ডানে) গ্রেফতার হত্যার সাথে জড়িত দুই আসামি |নয়া দিগন্ত

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে চালককে হত্যার ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ ঘটনায় সরাসরি জড়িত দু’জনকে গ্রেফতারের পাশাপাশি ছিনতাইকৃত অটোরিকশা ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া চোরাই অটোরিকশা ক্রয় ও হেফাজতে রাখার অভিযোগে মো: কিবরিয়া (৪২) নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

পিবিআই জানায়, নিহত আতাউর রহমান আতা (৬০) কাপাসিয়া উপজেলার মিজজানগর এলাকার একজন কৃষক ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক ছিলেন। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিকেলে জীবিকার তাগিদে অটোরিকশা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন তিনি। রাত ৮টার আগে সনমানিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণগাঁও মিজজানগর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশে একটি নির্জন কলাবাগানের সামনে ছিনতাইকারীরা তাকে আটক করে নির্মমভাবে হত্যা করে। পরে তার অটোরিকশা ও একটি বাটন মোবাইলফোন নিয়ে পালিয়ে যায়।

এদিকে ছেলের মৃত্যুর সংবাদ সহ্য করতে না পেরে আতাউর রহমানের ৭৫ বছর বয়সী মা জহুরা খাতুনও হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। একই দিনে মা ও ছেলের মৃত্যুতে এলাকায় শোক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

কাপাসিয়া থানায় মামলা দায়েরের পর পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো: মোস্তফা কামালের সার্বিক দিকনির্দেশনায় এবং পিবিআই গাজীপুর জেলা ইউনিটের পুলিশ সুপার মো: রকিবুল আক্তারের তত্ত্বাবধানে পিবিআইয়ের একটি দল তদন্ত শুরু করে। অ্যাডভান্সড আইসিটি, ডিজিটাল ফরেনসিক ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শুক্রবার (২১ আগস্ট) রাতে কাপাসিয়ার চালার বাজার ও নরোত্তমপুর এলাকা থেকে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতার হওয়া ‍দু’জন হলেন— কাপাসিয়া থানার ভাগটিয়া চালার বাজার গ্রামের রাজ্জাক খানের ছেলে রাজীব খান (২৯) ও মিজজানগর এলাকার নাছির উদ্দীনের ছেলে নকিবুল হাসান ওরফে রাকিব (২৪)।

তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে নরসিংদীর মনোহরদী থানাধীন হাতিরদিয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকার ‘আল-মদিনা এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি দোকান থেকে ছিনতাই করা অটোরিকশাটি উদ্ধার করা হয়। চোরাই অটোরিকশাটি ক্রয় ও হেফাজতে রাখার অভিযোগে দোকানের মালিক মো: কিবরিয়াকে (৪২) গ্রেফতার করা হয়। এছাড়া আসামিদের কাছ থেকে অটোরিকশা বিক্রির নগদ ২২ হাজার টাকা এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত লোহার রড, হাতুড়ি ও রশি উদ্ধার করা হয়েছে।

গ্রেফতার রাজীব খান ও নকিবুল হাসান আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তারা জানান, ঋণের দায়ে জর্জরিত হয়ে তারা অটোরিকশা ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেন এবং নকিবুলের দূরসম্পর্কের আত্মীয় হওয়ায় আতাউর রহমানকে সহজ টার্গেট হিসেবে বেছে নেয়া হয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০ আগস্ট বিকেলে আতাউর রহমানকে ফোন করে ডেকে নির্জন কলাবাগানের পাশে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রশি দিয়ে গলা চেপে ধরে এবং লোহার রড ও হাতুড়ি দিয়ে মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে তাকে হত্যা করা হয়। পরে অটোরিকশাটি নরসিংদীর হাতিরদিয়া এলাকায় ধুয়ে পরিষ্কার করে কিবরিয়ার কাছে ৪২ হাজার টাকায় বিক্রি করে টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়।

পিবিআই গাজীপুর জেলা ইউনিট ইনচার্জ পুলিশ সুপার মো: রকিবুল আক্তার বলেন, ‘একজন নিরীহ অটোরিকশাচালককে হত্যা এবং তার পরপরই শোকাহত মায়ের মৃত্যুর ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক। অপরাধীরা ভেবেছিল নির্জন স্থানে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে তারা পার পেয়ে যাবে। কিন্তু পিবিআইয়ের পেশাদারিত্ব ও আধুনিক প্রযুক্তির দক্ষ ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই চাঞ্চল্যকর জোড়া মৃত্যুর নেপথ্যে থাকা মূল আসামিদের গ্রেফতার ও গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের সাথে আরো কারো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি-না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে দ্রুততম সময়ে আদালতে যথাযথ চার্জশিট দাখিলের জন্য তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া হচ্ছে।’

মামলাটির তদন্ত তদারকি করছেন পিবিআই গাজীপুর জেলা ইউনিট ইনচার্জ পুলিশ সুপার মো: রকিবুল আক্তার। তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান আনসারী।