রাজশাহী–১ (গোদাগাড়ী–তানোর) আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেছেন, ‘মৎস্যচাষীদের উৎসাহিত করতে সহজ শর্তে বিনা সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আধুনিক মাছ চাষে প্রশিক্ষণ, উৎপাদিত মাছের ন্যায্যমূল্য এবং মৎস্যসম্পদের যথাযথ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এ খাত দেশের খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে আরও বড় অবদান রাখতে পারবে।’
রোববার (১৬ আগস্ট) সকাল ১০টায় রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় জাতীয় মৎস্য পক্ষ–২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত র্যালি, পোনা মাছ অবমুক্তকরণ ও আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, ‘মহান আল্লাহ পৃথিবীর সব সৃষ্টির রিজিকের ব্যবস্থা করেছেন। বাংলাদেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস মাছ। নদী, খাল, বিল, পুকুরসহ বিভিন্ন জলাশয়ের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘ঋণের অতিরিক্ত আর্থিক বোঝার কারণে ক্ষুদ্র মৎস্যচাষীদের লাভের বড় অংশ নষ্ট হয়ে গেলে তারা দীর্ঘমেয়াদে মাছ চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন। তাই মৎস্যচাষীদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে সহজ শর্তে বিনা সুদে ঋণসহ চাষিবান্ধব অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।’
তিনি আরো বলেন, ‘শুধু আর্থিক সহায়তা দিলেই হবে না; মৎস্যচাষীদের আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ, সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা, রোগ প্রতিরোধ, পানির গুণগত মান রক্ষা এবং উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিতে হবে।’
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে এ কার্যক্রম আরো জোরদার করার আহ্বান জানান তিনি।
মৎস্যসম্পদ রক্ষায় নদী, খাল, বিল ও জলাশয় সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, ‘অব্যবহৃত ও ভরাট হয়ে যাওয়া জলাশয়গুলো প্রয়োজন অনুযায়ী সংস্কার ও পরিচর্যার মাধ্যমে মাছ উৎপাদনের উপযোগী করে তুলতে হবে। এতে মাছের উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে।’
তিনি মাছের প্রজনন মৌসুমে নির্বিচারে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট মৎস্য কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুসরণ করে প্রজননকালীন সময়ে মাছ সংরক্ষণ এবং উপযুক্ত সময়ে মাছ আহরণ করতে হবে। এতে প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ রক্ষা ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে।’
মৎস্যসম্পদ ধ্বংসে বিষ প্রয়োগ, অবৈধভাবে মাছ নিধন ও মাছ চুরির মতো কর্মকাণ্ড বন্ধে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু একজন মৎস্যচাষীর ক্ষতি করে না, দেশের সামগ্রিক মৎস্যসম্পদেরও ক্ষতি করে। তাই মৎস্যসম্পদ রক্ষায় প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, মৎস্যচাষী ও সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।’
মৎস্যচাষীদের উৎপাদিত মাছের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের ওপর গুরুত্ব দিয়ে এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘উৎপাদন খরচের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বাজারমূল্য না পেলে চাষীরা মাছ উৎপাদনে উৎসাহ হারাবেন। কৃষকের মতো মৎস্যচাষীরও শ্রম ও বিনিয়োগের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।’
বেকারত্ব দূরীকরণে মৎস্য খাতের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘যুবসমাজকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, জ্ঞান ও সহযোগিতা দিয়ে মৎস্যচাষে সম্পৃক্ত করা গেলে অনেক তরুণ-তরুণী উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন। একই সাথে পরিকল্পিত উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির মাধ্যমে মৎস্য খাত দেশের অর্থনীতিতে আরো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।’
এর আগে জাতীয় মৎস্য পক্ষ–২০২৬ উপলক্ষে উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে একটি সড়ক র্যালি বের করা হয়।
র্যালি শেষে উপজেলা পরিষদ পুকুরে পোনা মাছ অবমুক্ত করা হয়। পরে উপজেলা পরিষদ হলরুমে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইসরাত জাহানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো: অহেদুজ্জামান।
মৎস্যচাষী, মৎস্যজীবী ও উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন মৎস্যজীবী মো: নঈমুদ্দীন এবং মৎস্যচাষী মো: হাফিজুর রহমান ও মো: মিনহাজুল ইসলাম।
এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন রাজশাহী জেলা শিক্ষক ফেডারেশনের সভাপতি ড. মো: ওবায়দুল্লাহ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী গোদাগাড়ী উপজেলা আমির মাস্টার নোমান আলী, জুলাই যোদ্ধা মুরসালিন, এনসিপির আহ্বায়ক মো: জিয়াউর রহমান, সাইদুর রহমানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, মৎস্যচাষী, মৎস্যজীবী, উদ্যোক্তা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
অনুষ্ঠানে মৎস্যক্ষেত্রে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সফল মৎস্যচাষী ও উদ্যোক্তাদের পুরস্কৃত করা হয়। কার্পজাতীয় মাছ উৎপাদনে মো: বাসেদ আলী এবং মাছের পোনা উৎপাদনে মো: হাফিজুর রহমান (বাদশা) ও মো: দেলোয়ার হোসেনকে পুরস্কার দেয়া হয়।
অনুষ্ঠানে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান জাতীয় মৎস্য পক্ষ–২০২৬-এর কর্মসূচির উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
একই সাথে মৎস্যসম্পদ রক্ষা, উৎপাদন বৃদ্ধি, মৎস্যচাষীদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকারি কর্মকর্তা, মৎস্যচাষী ও সর্বস্তরের জনগণকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।



