ময়মনসিংহে ডেঙ্গুতে চলতি মাসেই হাসপাতালে ভর্তি ২২০ রোগী

আত্মীয়ের বাসায় দাওয়াতে যাওয়ার পর জ্বরে আক্রান্ত হন। প্রথমে সাধারণ জ্বর মনে হলেও পরে অজ্ঞান হয়ে গেলে পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ে। তখন তার প্লাটিলেট নেমে আসে ৬৮ হাজারে।

মো: সাজ্জাতুল ইসলাম, ময়মনসিংহ

Location :

Mymensingh
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ (মমেক) হাসপাতাল
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ (মমেক) হাসপাতাল |ফাইল ছবি

ময়মনসিংহে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। চলতি জুলাই মাসের মাত্র ২২ দিনেই ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত ২২০ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন, যা চলতি বছরের মোট আক্রান্তের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। রোগীর চাপ সামাল দিতে ২০ শয্যার পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হলেও সেখানে ভর্তি রয়েছেন ৩৯ জন। বিছানা সঙ্কটে অনেককে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে বুধবার (২২ জুলাই) সকাল পর্যন্ত মমেক হাসপাতালে মোট ৩৪৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ভর্তি ছিলেন ১২৬ জন, আর জুলাই মাসের প্রথম তিন সপ্তাহেই ভর্তি হয়েছেন ২২০ জন। চলতি বছর হাসপাতালে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচজন।

গত বছরের চিত্রও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ১৭৬ জন ডেঙ্গু রোগী, মারা গিয়েছিলেন মাত্র একজন। তবে আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসে রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় দুই হাজার ২২৭ জন এবং মৃত্যু হয় ২৮ জনের।

হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৭টা পর্যন্ত ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ভর্তি ছিলেন ৩৯ জন রোগী। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি হয়েছেন ১০ জন, ছাড়পত্র পেয়েছেন ১১ জন।

নগরের ৬ ওয়ার্ডকে ‘স্পেশাল জোন’ ঘোষণা
ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন নগরের ৬, ১০, ১১, ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর ওয়ার্ডকে ‘স্পেশাল জোন’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত নগরে মাত্র চারজন ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেও জুনে আক্রান্ত হন আটজন এবং ২১ জুলাই পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮ জনে। সব মিলিয়ে চলতি বছরে নগরে আক্রান্ত হয়েছেন ৭০ জন, মারা গেছেন একজন।

সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো: রুকুনোজ্জামান রোকন বলেন, গত বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে দিনে দুই দফা ফগিং ও স্প্রে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

সরেজমিন পর্যবেক্ষণ
স্পেশাল জোনের অন্যতম নওমহল এলাকায় সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন নালায় আবর্জনা জমে পানি আটকে আছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হলেও মশার উপদ্রব কমছে না।

স্থানীয় বাসিন্দা মো: বিল্লাল বলেন, ডেঙ্গুতে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, একজন নারীও মারা গেছেন। রাতে মশার কারণে ভয় লাগে। ওষুধ দিলেও মশা মরে না।

সাজিদা বেগম বলেন, মশার ভয়ে রাতে ঘুমাতে পারি না। ডেঙ্গুর ভয় সব সময় তাড়া করে বেড়ায়।

২০ শয্যার ওয়ার্ডে ৩৯ রোগী
রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় ২ জুলাই থেকে হাসপাতালের পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হয়। কিন্তু ২০ শয্যার এই ওয়ার্ডে বুধবার সকাল পর্যন্ত ভর্তি ছিলেন ৩৯ জন রোগী। অনেককে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, ২ জুলাই থেকে বুধবার দুপুর পর্যন্ত ওই ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছেন ২৪২ জন রোগী। এর মধ্যে ১০৩ জন ময়মনসিংহ জেলার বাসিন্দা। ভর্তি রোগীদের প্রায় ৫৬ শতাংশই সিটি করপোরেশন এলাকার। নওমহল, আকুয়া মাদরাসা কোয়ার্টার ও বাউন্ডারি রোড এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি।

আকুয়া দরবার শরিফ রোডের বাসিন্দা স্কুলশিক্ষক আবদুল আউয়াল জানান, আত্মীয়ের বাসায় দাওয়াতে যাওয়ার পর জ্বরে আক্রান্ত হন। প্রথমে সাধারণ জ্বর মনে হলেও পরে অজ্ঞান হয়ে গেলে পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ে। তখন তার প্লাটিলেট নেমে আসে ৬৮ হাজারে।

অন্যদিকে ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাকিব হোসেন গাজীপুরে কাজের সন্ধানে গিয়ে জ্বরে আক্রান্ত হন। পরে অবস্থার অবনতি হলে মমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় তাকে চার ব্যাগ রক্ত দিতে হয়েছে।

হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য বিভাগের প্রস্তুতি
মমেক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা: মো: মাইনউদ্দিন খান বলেন, ডেঙ্গুর রোগী বাড়ায় পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাও প্রস্তুত রয়েছে।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মমেক হাসপাতালের বাইরে জেলার ১২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও ২২ জুলাই পর্যন্ত ৩৫ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। বর্তমানে ভর্তি আছেন পাঁচজন।

সিভিল সার্জন ডা: ফয়সল আহমেদ বলেন, ডেঙ্গু মোকাবেলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। নতুন চিকিৎসকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। তবে মমেক হাসপাতালে শুধু ময়মনসিংহ নয়, আশপাশের বিভিন্ন জেলার রোগীও চিকিৎসা নিতে আসায় আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে।