বৃদ্ধ মায়ের চোখে ঘুম নেই। ছেলের অপেক্ষায় দিন কাটছে অশ্রু আর উৎকণ্ঠায়। কখনো প্রতিবেশীদের কাছে ছেলের খবর জানতে ছুটে যান, কখনো হাত তুলে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। তার একটাই আকুতি—‘আমার আর কিছু লাগবে না, শুধু আমার ছেলেটারে আইনা দেন।’
ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ধানীখোলা ইউনিয়নের উজান ভাটিপাড়া গ্রামের জোসনারা বেগমের এই আকুতি। তার ছেলে শাহরিয়ার সুমন (৩৮) বর্তমানে ইউক্রেনের একটি বন্দিশিবিরে আটক রয়েছেন বলে দাবি করেছে তার পরিবার।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুপুরে শাহরিয়ারের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর উৎকণ্ঠা। ছেলের প্রসঙ্গ উঠতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা ওয়াজেদ আলী। নামাজ শেষে বাড়িতে ফিরে ছেলের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বিদেশ পাঠানোর জন্য জমিজমা বিক্রি করছি। বড় ছেলেরাও ঋণ কইরা টাকা দিছে। ভাবছিলাম, বিদেশে গিয়া কামাই কইরা সংসারের অভাব দূর করবো। কিন্তু দালালের খপ্পরে পইড়া যুদ্ধে চলে গেছে। এই অবস্থা জানলে কোনো দিন বিদেশ যাইতে দিতাম না। সরকার আমার পোলাডারে দেশে ফিরাইয়া আনুক।’
ভাগ্য বদলের আশায় বিদেশযাত্রা
শাহরিয়ার ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় কাটিং মাস্টার হিসেবে কাজ করতেন। সীমিত আয়ে দুই স্ত্রী, তিন সন্তান ও বৃদ্ধ মা-বাবার সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো তাকে। ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় গত বছরের ৫ জুন বৈধ ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় রাশিয়া যান তিনি।
পরিবারের ভাষ্য, বিদেশ যেতে তাদের প্রায় সাড়ে ১০ লাখ টাকা খরচ হয়। এ অর্থের একটি বড় অংশ জোগাড় করতে জমি বিক্রি করতে হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংক ও এনজিও থেকেও ঋণ নেয় পরিবারটি।
বিদেশ যাওয়ার আগে শাহরিয়ার পরিবারের সদস্যদের বলেছিলেন, কয়েক বছর পরিশ্রম করলেই ঋণ শোধ হবে, সংসারে সচ্ছলতা ফিরবে। কিন্তু তার সেই স্বপ্নই এখন পরিবারের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাশিয়ায় একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেন শাহরিয়ার। ছয় মাসের মাথায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। দেশে ফেরার সুযোগ থাকলেও ঋণের চাপের কারণে তিনি আর ফিরতে পারেননি। এরপরই দালালের খপ্পরে পড়েন বলে অভিযোগ পরিবারের।
ইতালির প্রলোভন, পাঠানো হয় যুদ্ধক্ষেত্রে
পরিবারের অভিযোগ, মস্কোতে এক দালাল প্রথমে আঙুরবাগানে কাজ দেয়ার কথা বলে শাহরিয়ারকে নিয়ে যায়। পরে ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে তার কাছ থেকে নেয়া হয় পাঁচ লাখ টাকা।
এ সময় রুশ ভাষায় লেখা কয়েকটি কাগজে তার স্বাক্ষর নেয়া হয়। সেসব কাগজে কী লেখা ছিল, তা শাহরিয়ার বুঝতে পারেননি বলে জানিয়েছে পরিবার।
পরবর্তীতে তারা জানতে পারে, ওই কাগজের মাধ্যমেই শাহরিয়ারকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পরিবারের দাবি, যুদ্ধে যাওয়ার বিষয়ে শাহরিয়ার সম্মত ছিলেন না। এরপরও নানা চাপের মুখে মাত্র কয়েক দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।
মৃত্যুর খবর, পরে মিলল জীবিত থাকার প্রমাণ
গত ২০ জুন স্বজনদের কাছে খবর আসে, ইউক্রেনে ড্রোন হামলায় শাহরিয়ার নিহত হয়েছেন। এমন খবরে পুরো পরিবার শোকে ভেঙে পড়ে।
কিন্তু কয়েক দিন আগে ইউক্রেনের একটি বন্দিশিবির থেকে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে শাহরিয়ারকে জীবিত অবস্থায় দেখা যায়। এতে শোকের মধ্যে থাকা পরিবারে আবারও আশার আলো জ্বলে ওঠে।
ওই ভিডিওতে শাহরিয়ার জানান, মাত্র তিন দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। সেখানে পর্যাপ্ত খাবারও দেয়া হতো না। একপর্যায়ে তিনি আরেক বাংলাদেশী নাগরিক কামরুল হাসানকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে ইউক্রেন সীমান্তে পৌঁছান। পরে ইউক্রেনীয় বাহিনী তাদের আটক করে।
ভিডিও বার্তায় শাহরিয়ার বাংলাদেশ সরকারের কাছে আকুতি জানিয়ে বলেন, তাদের দ্রুত উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে নেয়া হোক। তারা সেখানে অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে রয়েছেন বলেও জানান তিনি।
বাবাকে দেখেনি নয় মাসের সন্তান
শাহরিয়ার রাশিয়ায় যাওয়ার পর তার দ্বিতীয় স্ত্রী খালেদা আক্তারের ঘরে জন্ম নেয় ছেলে ইরফান আহমেদ। বর্তমানে শিশুটির বয়স নয় মাস। কিন্তু জন্মের পর থেকে বাবাকে একবারও দেখেনি সে।
খালেদা আক্তার বলেন, ‘শেষ ফোনে বলছিল, আমার জন্য দোয়া করো। যদি বেঁচে থাকি, আবার দেখা হবে। এরপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। পরে শুনলাম মারা গেছে। এখন ভিডিওতে দেখলাম বেঁচে আছে। আমার স্বামী কাজ করতে গিয়েছিল, যুদ্ধ করতে নয়। আমি শুধু চাই, ও যেন দেশে ফিরে আসে।’
সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগ চান স্বজনরা
শাহরিয়ারকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ইতোমধ্যে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে লিখিত আবেদন করেছে তার পরিবার।
ভগ্নিপতি আনোয়ার হুসাইন জানান, যুদ্ধবন্দী বিনিময়ের মাধ্যমে শাহরিয়ারকে আবার রাশিয়ার কাছে হস্তান্তর করা হতে পারে—এমন তথ্য তারা পেয়েছেন। তাই বিষয়টি জটিল হওয়ার আগেই সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরাফাত সিদ্দিকী বলেন, ‘লিখিতভাবে বিষয়টি জানানো হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।’
একটাই অপেক্ষা—ফিরে আসুক শাহরিয়ার
উজান ভাটিপাড়ার ছোট্ট বাড়িটিতে এখন প্রতিটি দিন কাটছে অপেক্ষায়। মা তাকিয়ে থাকেন ছেলের ফেরার পথের দিকে। বাবার কণ্ঠে শোনা যায় অসহায়ত্ব। স্ত্রী অপেক্ষায় স্বামীর জন্য। আর নয় মাসের শিশু ইরফান অপেক্ষা করছে এমন একজন বাবার জন্য, যাকে সে কখনো দেখেনি।
জীবিকার সন্ধানে রাশিয়া গিয়ে যুদ্ধের বিভীষিকায় আটকে পড়া শাহরিয়ার সুমন এখন ইউক্রেনের বন্দিশিবিরে। পরিবারের দাবি, তিনি যুদ্ধ করতে যাননি; গিয়েছিলেন পরিবারের ভাগ্য বদলাতে।
স্বজনদের একটাই দাবি—কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে দ্রুত শাহরিয়ারকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা হোক।



