ময়মনসিংহের ফুলপুরে কংশ নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কাঠ-বাঁশের একটি সাঁকো—দেখতে সাধারণ, কিন্তু এর ভেতর লুকিয়ে আছে আট গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, সংগ্রাম আর আত্মমর্যাদার গল্প। সরকারি প্রতিশ্রুতি মিললেও বাস্তবায়ন না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত নিজেরাই নিজেদের ভাগ্য গড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
দীর্ঘদিন ধরে একটি পাকা সেতুর দাবিতে সংশ্লিষ্ট দফতরে ঘুরেও কোনো সুফল না পেয়ে স্থানীয়রা নিজেদের অর্থায়নে গড়ে তুলেছেন এই অস্থায়ী সাঁকো। প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয়ে বাঁশ, কাঠ ও গাছের খুঁটি দিয়ে নির্মিত এই কাঠামো এখন নিশুনিয়াকান্দা, সেনেরচর, ঝিলকি, চাতুলিয়াকান্দা, চকেরকান্দা, পুটিয়া, ঘোনাপাড়া ও মালিঝিকান্দা—এই আট গ্রামের মানুষের জীবনের প্রধান ভরসা।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভোর থেকে রাত পর্যন্ত এই সাঁকোতে মানুষের অবিরাম চলাচল। শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজে যাচ্ছে, কৃষকরা মাঠ থেকে ফসল নিয়ে বাজারে ছুটছেন। এমনকি মোটরসাইকেল, ভ্যান, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও কৃষি যন্ত্রপাতিও চলছে ঝুঁকিপূর্ণ এই কাঠের সাঁকোর ওপর দিয়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো: সিরাজুল ইসলামের কণ্ঠে ধরা পড়ে দীর্ঘদিনের বঞ্চনার আক্ষেপ। তিনি বলেন, ‘আমরা নিচু এলাকার মানুষ হওয়ায় সবসময়ই অবহেলিত। পাকা রাস্তা নেই, সেতু নেই—এভাবেই বছরের পর বছর কেটে গেছে।’
অন্যদিকে ঘোনাপাড়া গ্রামের আরিফুল ইসলাম জানান, এই সাঁকো শুধু চলাচলের পথ নয়, অর্থনৈতিক পরিবর্তনেরও দ্বার খুলে দিয়েছে। আগে কৃষিপণ্য বাজারে নিতে কষ্ট হতো, খরচও বেশি পড়ত। এখন সহজে পণ্য নিয়ে যেতে পারছি, ভালো দামও পাচ্ছি।’
তবে এই স্বপ্নের সাঁকোর মধ্যেও লুকিয়ে আছে শঙ্কা। বাঁশ ও কাঠের এই অস্থায়ী কাঠামো যে কোনো সময় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, আগামী দুই বছরের মধ্যে এটি নড়বড়ে হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে, ফুলপুর উপজেলা প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর হোসাইন জানান, এখানে একটি পাকা সেতু নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। তবে কবে নাগাদ সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তায় ভুগছেন এলাকাবাসী।
এই সাঁকো তাই শুধু একটি যাতায়াতের মাধ্যম নয়—এটি রাষ্ট্রীয় অবহেলার বিরুদ্ধে গ্রামীণ মানুষের নীরব প্রতিবাদ, নিজেরাই পথ তৈরি করার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।



