ময়মনসিংহ বিভাগ ও আশপাশের ১২ জেলার প্রায় তিন কোটি মানুষের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এক হাজার শয্যার আধুনিক জেলা সদর হাসপাতাল স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠার প্রশাসনিক ও নীতিগত পর্যালোচনা শুরু করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
বুধবার (২২ জুলাই) স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (হাসপাতাল) এ এন এম মঈনুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক নীতিগত পর্যালোচনা সভায় বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় ময়মনসিংহের সিভিল সার্জনকে হাসপাতালটির প্রয়োজনীয়তা, যৌক্তিকতা ও সম্ভাব্য বাস্তবায়ন পরিকল্পনা উপস্থাপনের নির্দেশ দেয়া হয়।
ময়মনসিংহ মেডিক্যালের ওপর তিন কোটির মানুষের চাপ
বর্তমানে ময়মনসিংহ জেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রায় ৮০ লাখ মানুষ বসবাস করলেও, বাস্তবে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি। ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলার পাশাপাশি টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, গাজীপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জসহ অন্তত ১২ জেলার রোগীরা চিকিৎসার জন্য এখানে আসেন।
কিন্তু দেশের বেশির ভাগ জেলায় পৃথক জেলা সদর হাসপাতাল থাকলেও বিভাগীয় শহর ময়মনসিংহে এখনো কোনো স্বতন্ত্র জেলা সদর হাসপাতাল নেই। ফলে সাধারণ রোগী থেকে শুরু করে জটিল রোগী—সবাইকে একই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এতে বছরের পর বছর ধরে বাড়ছে রোগীর চাপ।
শয্যা সঙ্কটে নাজুক স্বাস্থ্যব্যবস্থা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে হাসপাতালের শয্যা রয়েছে গড়ে নয় দশমিক ২৫টি। অথচ ময়মনসিংহ জেলায় এ সংখ্যা মাত্র দুই দশমিক ৬৩টি। আর হাসপাতালটির ওপর নির্ভরশীল প্রায় তিন কোটি মানুষের হিসাব ধরলে শয্যার হার নেমে আসে মাত্র ০.৫২-এ, যা দেশের অন্যতম নিম্ন হার।
১৯৬২ সালে ৩০০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল বর্তমানে এক হাজার শয্যায় উন্নীত হলেও প্রতিদিন সেখানে অনুমোদিত শয্যার কয়েকগুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। অনেক রোগীকে মেঝে, বারান্দা ও করিডোরে চিকিৎসা নিতে হয়।
২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো মাসে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৩২ হাজার ছাড়িয়ে যায়। একই সময়ে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন এ লাখ ১৬ হাজারের বেশি মানুষ। এনআইসিইউ ও শিশু বিভাগেও ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে।
যে সুবিধা থাকবে নতুন হাসপাতালে
প্রস্তাবিত এক হাজার শয্যার হাসপাতালটিতে থাকবে—৫০ শয্যার আইসিইউ, ৫০ শয্যার সিসিইউ, ৫০ শয্যার ডায়ালাইসিস ইউনিট, এনআইসিইউ ও পিআইসিইউ, ১০ শয্যার ট্রমা ও জরুরি বিভাগ, প্রসূতি ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট, আইসোলেশন ইউনিট, ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি), কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, ভ্যাকসিনেশন হাব, আধুনিক ডায়াগনস্টিক হাব। যেখানে স্বল্প খরচে সিটি স্ক্যান, এমআরআই ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকবে।
এর ফলে রোগীদের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ওপর নির্ভরতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দু’টি স্থান বিবেচনায়
হাসপাতাল নির্মাণের জন্য প্রাথমিকভাবে দু’টি সরকারি খাস জমি বিবেচনায় রয়েছে।
প্রথমটি ব্রহ্মপুত্র নদের ওপারে চর জেলখানা মৌজার প্রায় ৯৫০ একর জমি। এখানে হাসপাতাল নির্মাণ হলে ময়মনসিংহের সাত উপজেলা ছাড়াও নেত্রকোনা, শেরপুর, কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের রোগীরা শহরের যানজট এড়িয়ে দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিতে পারবেন।
দ্বিতীয়টি খাগডহর ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ হাজার ৭৮০ একর সরকারি খাস জমি। এ স্থানে হাসপাতাল হলে জামালপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ সদরসহ আশপাশের জেলার মানুষের জন্য যাতায়াত সহজ হবে।
এসডিজি অর্জনে সহায়ক হবে
সংশ্লিষ্টদের মতে, হাসপাতালটি বাস্তবায়িত হলে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়ন এবং এসডিজি-৩ (সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ) অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পরিবেশবান্ধব নকশায় নির্মিত হাসপাতালটিতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেয়া হবে এবং আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে। একইসাথে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওপর দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
সিভিল সার্জনের প্রস্তাব
ময়মনসিংহের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা: ফয়সল আহমেদ গত ২৫ মার্চ স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের কাছে এক হাজার শয্যার জেলা সদর হাসপাতাল স্থাপনের প্রস্তাব পাঠান।
তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের সভায় কেন ময়মনসিংহে এক হাজার শয্যার জেলা সদর হাসপাতাল প্রয়োজন, তার বিস্তারিত উপস্থাপন করেছি এবং বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি।’
তার মতে, নতুন হাসপাতাল নির্মিত হলে জেলা পর্যায়েই উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত হবে, রেফারেল ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওপর চাপ কমবে এবং চিকিৎসা শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও দুর্যোগকালীন স্বাস্থ্যসেবাও আরো কার্যকর হবে।



