ছিটমহল বিনিময়ে কতোটা বদলালো সীমান্তবাসীর ভাগ্য?

মানচিত্রের রেখা একদিনে বদলানো যায়। পতাকাও একদিনে বদলানো যায়। নাগরিকত্বের সনদও একদিনে দেয়া যায়। কিন্তু মানুষের আস্থা গড়ে তুলতে সময় লাগে। ভূমির ইতিহাস সংশোধন করতে সময় লাগে। রাষ্ট্রকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে আরো বেশি সময় লাগে।

রেজাউল করিম রেজা, কুড়িগ্রাম

Location :

Kurigram
অধূনালুপ্ত ছিটমহল
অধূনালুপ্ত ছিটমহল |নয়া দিগন্ত

সাহেব আলির মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল ২০১৫ সালের আগেই। কোচবিহারের দিনহাটার সাবেক ছিটমহল পোয়াতুরকুঠিতে বসে তিনি এখন এক অদ্ভুত প্রশ্নের মুখোমুখি— এসআইআর-এর (বিশেষ নিবিড় সংশোধন) নথিতে তার মেয়ের নাম উঠবে কী করে, যেখানে ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তাদের কারো নামই নেই? থাকার কথাও নয়— তারা তো নাগরিকই হয়েছেন ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে, ছিটমহল বিনিময়ের সেই ঐতিহাসিক রাতে। আজ থেকে ঠিক ১১ বছর আগে যে রাতে ভারতের পতাকা উঠেছিল তাদের উঠোনে, মোমবাতি জ্বলেছিল ৬৮ বছরের বন্দিদশার সমাপ্তি ঘোষণা করে— সেই রাতের স্মৃতি আজ তাদের কাছে একটা আতঙ্কের নথি-সংকট। জেলা প্রশাসনও স্পষ্ট করে বলতে পারছে না, কীভাবে সুরাহা হবে।

আর কিছুটা দূরে, মধ্য মশালডাঙ্গায় আবদুল্লা শেখের গল্পটা আরও করুণ। ছিটমহল বিনিময়ের সময় তিনি সদ্য কৈশোর পেরিয়েছেন। ভেবেছিলেন, এবার বুঝি নিজের গ্রামেই কাজ জুটবে। ১১ বছর পর আজ তিনি দিল্লির একজন পরিযায়ী শ্রমিক— সাথে তার বৃদ্ধ বাবা-মাও। কিছুদিন আগেই তুফানগঞ্জের এক পরিযায়ী শ্রমিককে হরিয়ানায় ‘বাংলাদেশী সন্দেহে’ আটকে মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিজের দেশের নাগরিকত্ব হাতে নিয়েও নিজ ভূমে পরবাসীর মতো বাঁচার এই বাস্তবতা— এটাই ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক স্থলসীমা চুক্তির ১১ বছর পূর্তির প্রকৃত ছবি, যা মধ্যরাতের মোমবাতি আর পতাকা উত্তোলনের ছবির আড়ালে থেকে যায়।

দু’টি চরম অবস্থানের মাঝামাঝি নয়— দু’টি ভিন্ন বাস্তবতা
ছিটমহল বিনিময় নিয়ে মূল্যায়ন করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই দুটি চরম অবস্থান দেখি। একদল একে নিখুঁত কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন। অন্যদিকে কেউ কেউ একে সম্পূর্ণ ব্যর্থতা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু সাহেব আলি আর আবদুল্লা শেখদের জীবনের দিকে তাকালে বোঝা যায়, বাস্তবতা এই দুই মেরুর মাঝামাঝি কোনো নিরপেক্ষ বিন্দুতে নেই— বরং সীমান্তের দুই পাশে এটি দু’টি সম্পূর্ণ আলাদা বাস্তবতা।

সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ২০১৫ সালের স্থলসীমা চুক্তি নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। দুই দেশের মধ্যে কয়েক দশকের সীমান্ত-সংক্রান্ত বিরোধের অবসান ঘটেছে। আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ইতিহাসে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হয়ে থাকবে। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি মৌলিক সত্য হলো, রাষ্ট্রের সীমানা নির্ধারণ আর রাষ্ট্রের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি একটি মানচিত্র সংশোধন করতে পারে। কিন্তু মানুষের জীবন বদলায় তখনই, যখন সেই মানচিত্রের সাথে প্রশাসন, ভূমি রেকর্ড, বিচারব্যবস্থা, উন্নয়ন এবং নিরাপত্তাও সমানভাবে পৌঁছে যায়। এই জায়গাতেই ১১ বছর পর ছিটমহল বিনিময়ের বাস্তব মূল্যায়ন প্রয়োজন— আর সেই মূল্যায়নে দুই দেশের ফলাফল সমান নয়।

বাংলাদেশ অংশ : অসম্পূর্ণ হলেও কিছুটা অগ্রগতি
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রশাসনিক সংযুক্তির কাজ তুলনামূলক দ্রুত এগিয়েছে। কুড়িগ্রামের দাশিয়ারছড়ার মতো সাবেক ছিটমহলে শিক্ষা, যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা ও কৃষির সুযোগ-সুবিধা ধারাবাহিকভাবে পৌঁছেছে। যদিও অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দীর্ঘদিনের অনুন্নয়নের সমস্যা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি, তবু সাবেক ছিটমহলগুলো রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক সেবা কাঠামোর আওতায় এসেছে, নাগরিকত্ব নিয়ে নতুন করে কোনো সংকট তৈরি হয়নি।

ভারত অংশ : নাগরিকত্ব প্রমাণের দায় এখনো সীমান্তবাসীর কাঁধে
অন্যদিকে ভারতের কিছু সীমান্তাঞ্চল, বিশেষ করে দক্ষিণ বেরুবাড়ির অভিজ্ঞতা দেখায় যে ভূমি প্রশাসনের অসম্পূর্ণতা একটি আন্তর্জাতিক চুক্তির সুফলকেও দীর্ঘদিন ধরে সীমিত করে রাখতে পারে। নেহেরু-নুন চুক্তির পর ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের এক মামলার জেরে বেরুবাড়ির দক্ষিণাংশের হস্তান্তর কার্যত থমকে গিয়েছিল বহু দশক— জমির দলিল, মিউটেশন, ক্ষতিপূরণ ও সীমান্ত অবকাঠামো নির্মাণের মতো বিষয়গুলো প্রমাণ করে, রাজনৈতিক ঘোষণার চেয়ে প্রশাসনিক বাস্তবায়ন অনেক বেশি কঠিন— এবং সেই কঠিন কাজটি ভারত এড়িয়ে গেছে বারবার।

কোচবিহারের ৪৭টি ও জলপাইগুড়ির ৪টি— মোট ৫১টি সাবেক বাংলাদেশি ছিটমহলের বাসিন্দারা আজ সেই একই প্রশাসনিক উদাসীনতার ধারাবাহিকতা ভোগ করছেন। এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হতেই দেখা গেল, ২০০২ সালের ভোটার তালিকার শর্ত পূরণ করতে না পারা এই ‘নব্যভারতীয়দের’ নাগরিকত্ব আবারও প্রশ্নের মুখে। স্থানীয় বিজেপি নেতা মৌখিক আশ্বাস দিচ্ছেন হলফনামা জমা দিলেই সমস্যা মিটবে, কিন্তু প্রশাসনের তরফে কোনো লিখিত নিশ্চয়তা নেই। পোয়াতুরকুঠির বাসিন্দারা তাই এনুমারেশন ফর্মই ফিরিয়ে দিয়েছেন পরপর তিন দিন। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা নয়— এটা প্রমাণ করে, নাগরিকত্ব দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলেও রাষ্ট্র হিসেবে ভারত এই মানুষদের প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি ১১ বছরেও নিশ্চিত করতে পারেনি।

কর্মসংস্থানের চিত্রও একই কথা বলে। নাগরিকত্ব পাওয়ার পর এলাকাতেই যদি জীবিকার সংস্থান হতো, তাহলে মধ্য মশালডাঙ্গা বা পোয়াতুরকুঠির মতো এলাকার মানুষদের ভিনরাজ্যে পাড়ি জমাতে হতো না। বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা— নাগরিকত্বের কাগজ হাতে পাওয়ার পর তারা কেবল আইনি বাধা ছাড়াই পরিযায়ী শ্রমিকে পরিণত হওয়ার ‘স্বাধীনতা’ পেয়েছেন। আর সেই পরিযায়ী জীবনেও তাড়া করে ফিরছে বাংলাভাষী হওয়ার কারণে সন্দেহভাজন "বাংলাদেশি" তকমা লাগিয়ে দেয়ার আতঙ্ক।

একটি শিক্ষা, যা দুই সরকারই এড়িয়ে গেছে
দুই দেশের সরকারই ২০১৫ সালে স্বাভাবিকভাবেই চুক্তির ইতিবাচক দিকগুলো সামনে এনেছিল। সেটি রাজনৈতিকভাবে প্রত্যাশিতও ছিল। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়নের জন্য যে ধারাবাহিক নজরদারি, ভূমি প্রশাসনের সংস্কার এবং সীমান্তবাসীকেন্দ্রিক নীতি দরকার ছিল, সেটি দুই পাশে সমান গতিতে এগোয়নি। আর এই অসমতাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ। যদি ছিটমহল বিনিময় সত্যিই একটা মানবিক প্রকল্প হতো— শুধু কূটনৈতিক অর্জন নয়— তাহলে সীমান্তের দুই পাশেই প্রশাসনিক অন্তর্ভুক্তির গতি প্রায় সমান হওয়ার কথা ছিল।

মোমবাতি প্রজ্জ্বলন, পতাকা উত্তোলন, কেক কাটা, ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরের মুহূর্ত— এসবই দারুণ প্রচার-উপকরণ। মিডিয়ার শিরোনাম হয়েছে, কূটনৈতিক ইতিহাসের পাতায় জায়গা হয়েছে, দুই নেতার রাজনৈতিক ভাবমূর্তিতে জমা পড়েছে ‘মানবিক সাফল্যের’ পালক। কিন্তু জমির মিউটেশন, ভোটার তালিকা হালনাগাদ, কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা— যেগুলো প্রকৃতপক্ষে একজন মানুষের জীবন বদলে দেয়, সেই কাজগুলোতে অগ্রাধিকার ছিল সীমিত ও অসম। অগ্রাধিকারই বলে দেয়, রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে আসল লক্ষ্যটা ঠিক কী ছিল।

ফলে ১১ বছর পরে এসে দেখা যাচ্ছে, কূটনৈতিক সাফল্যের ঘোষণার পরও কিছু প্রশাসনিক প্রশ্ন উত্তরহীন রয়ে গেছে— এবং সেই প্রশ্নগুলোর ভার বহন করছেন শুধু সীমান্তবাসী, কোনো রাষ্ট্রনায়ক নন।

সীমান্তবাসীর প্রশ্ন রাষ্ট্রের প্রশ্নের চেয়ে ছোট নয়
এটি শুধু ভারত বা বাংলাদেশের জন্য নয়, ভবিষ্যতের যেকোনো সীমান্ত চুক্তির জন্যও একটি শিক্ষা। আন্তর্জাতিক সমঝোতা তখনই সফল বলা যায়, যখন তার সুফল সীমান্তের শেষ প্রান্তের মানুষের জীবনেও সমানভাবে পৌঁছায়।

আজ দক্ষিণ বেরুবাড়ির একজন কৃষকের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নয়। তার প্রশ্ন, নিজের জমির বৈধ কাগজ কবে হাতে পাবেন। কোচবিহারের সাহেব আলির কাছেও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কূটনীতি নয়— তার প্রশ্ন, তার মেয়ের নাম এসআইআর-এর তালিকায় উঠবে কি না। মধ্য মশালডাঙ্গার আবদুল্লা শেখের কাছেও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ইতিহাস নয়— তার প্রশ্ন, নিজ রাজ্যে একটা কাজের সংস্থান কবে হবে, যাতে তাকে ভিনরাজ্যে গিয়ে সন্দেহভাজন ‘বাংলাদেশী’ তকমা নিয়ে বাঁচতে না হয়।

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে, ২০১৫ সালের স্থলসীমা চুক্তিকে ইতিহাস কীভাবে স্মরণ করবে।

রাষ্ট্রের কাছে সীমান্ত একটি সার্বভৌম রেখা। কূটনীতিকের কাছে এটি একটি সমঝোতা। জরিপ কর্মকর্তার কাছে কয়েকটি মৌজা, খতিয়ান ও মানচিত্র। নেতার কাছে এটি একটি ফটোসেশনের মুহূর্ত। কিন্তু সীমান্তবাসীর কাছে সীমান্ত মানে একটি বাড়ি, একটি ক্ষেত, একটি পুকুর, একটি মন্দির কিংবা মসজিদ, একটি পারিবারিক কবরস্থান, একটি আমগাছ, একটি শৈশব এবং আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ।

মানচিত্রের রেখা একদিনে বদলানো যায়। পতাকাও একদিনে বদলানো যায়। নাগরিকত্বের সনদও একদিনে দেয়া যায়। কিন্তু মানুষের আস্থা গড়ে তুলতে সময় লাগে। ভূমির ইতিহাস সংশোধন করতে সময় লাগে। রাষ্ট্রকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে আরো বেশি সময় লাগে।

১১ বছর আগে ছিটমহল বিনিময় একটি অসম্ভবকে সম্ভব করেছিল। সেই অর্জনের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে সমানভাবে সত্য, সেই অর্জনের মানবিক সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি— এবং সীমান্তের দুই পাশে সেই অবাস্তবায়নের মাত্রাও সমান নয়। সম্ভবত তাই ছিটমহলের ইতিহাস এখনো শেষ হয়নি।

তার শেষ অধ্যায় লেখা হবে সেদিন, যেদিন সীমান্তবাসীকে আর নিজের নাগরিকত্ব, নিজের জমি কিংবা নিজের অধিকার প্রমাণ করতে হবে না। যেদিন রাষ্ট্র শুধু মানচিত্রে নয়, মানুষের জীবনেও সমানভাবে উপস্থিত থাকবে— মোমবাতি নিভে যাওয়ার পরেও, ক্যামেরা সরে যাওয়ার পরেও। সেদিনই ২০১৫ সালের স্থলসীমা চুক্তি সত্যিকার অর্থে পূর্ণতা পাবে।