মহাদেবপুর (নওগাঁ) সংবাদদাতা
নওগাঁর মহাদেবপুরে ভুল চিকিৎসায় নাছিমা খাতুন (৪২) নামের এক নারীর মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালটি সিলগালা করা হয়েছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সিভিল সার্জন ডা: মো: আমিনুল ইসলাম অভিযান চালিয়ে উপজেলার আল মদিনা ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালটি সিলগালা ও বিষয়টি তদন্তের জন্য তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন।
মৃত নাছিমা উপজেলার উত্তরগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চকগৌড়া গ্রামের রেজাউল ইসলামের স্ত্রী।
রোগীর স্বজনরা জানায়, পাইলসের সমস্যায় আক্রান্ত নাছিমা খাতুনকে গত শনিবার দুপুরে আল মদিনা ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পাইলসের অপারেশনের জন্য ওই হাসপাতালের পরিচালক মো: আমিনুর রহমান মন্ডলের সাথে ১২ হাজার টাকা চুক্তি হয়। ওইদিন রাতেই মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিক্যাল অফিসার ডা: দেওয়ান আব্দুস সবুর রোগীর অপারেশন করেন। অপারশেনর পর থেকেই রোগীর অবস্থা খারাপ হতে থাকে। পরেরদিন রোববার সকালে নাছিমা খাতুনের মৃত্যু হয়।
পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মকবুল হোসেনের উপস্থিতিতে রোগীর স্বজনদের সাথে সমঝোতা করে। যদিও সেখানে কোনো টাকার কথা উল্লেখ নেই। তবে ৩০ হাজার টাকায় দফারফা শেষে নাছিমার লাশ নিয়ে যায় স্বজনরা।
রোগীর স্বজন জাকারিয়া জানান, রোগী ভর্তির পর তার রক্তসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। এ সময় নাছিমার হিমোগ্লোবিন ছিল সাত দশমিক চার গ্রাম/ডেসিলিটার। একই দিনে করা অন্য আরেকটি রিপোর্টে হিমোগ্লোবিন পাওয়া যায় সাত দশমিক পাঁচ গ্রাম/ডেসিলিটার। এরপর রোগীর অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত, রক্তস্বল্পতা বিবেচনা, অস্ত্রোপচার পরবর্তী পর্যবেক্ষণ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রোগীর স্বজনেরা। শুধু হিমোগ্লোবিন নয়, দুই রিপোর্টে রক্তের অন্য উপাদানেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে। একটি রিপোর্টে ডইং ১২ হাজার ২০০ ও প্লেটলেট তিন লাখ ৮৪ হাজার; অন্যটিতে ডইং ২৬ হাজার ২০০ ও প্লেটলেট ছয় লাখ পাঁচ হাজার উল্লেখ করা হয়েছে। এমন রিপোর্টের পর তার অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি কীভাবে নিয়েছিলেন এখন সেটিই বড় প্রশ্ন?
পরিবারের দাবি, শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে নাসিমাকে অপারেশন কক্ষে নেয়া হয়। সেখানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিক্যাল অফিসার ডা: মো: ইমরান আলী অ্যানেস্থেসিয়া দেন এবং ডা: দেওয়ান মো: আব্দুস সবুর অস্ত্রোপাচার করেন।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারের সময় বা পরে রক্তস্বল্পতার কারণে নাসিমাকে ‘বি’ পজিটিভ গ্রুপের এক ব্যাগ রক্ত দেয়া হয়।
মৃত নাসিমার স্বামী রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘অস্ত্রোপচারের পর রাতে তার স্ত্রীর অবস্থা মোটামুটি ভালোই ছিল। কিন্তু পরদিন সকাল ৮টার দিকে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মৃত্যু হয় তার স্ত্রীর।’
তিনি আরো অভিযোগ করেন, এ সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসককে ডাকতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে সকাল ৯টার দিকে অস্ত্রোপচার করা চিকিৎসক ডা: দেওয়ান মো: আব্দুস সবুর হাসপাতালে আসেন। তিনি রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র নেয়ার পরামর্শ দেন। তবে হাসপাতাল থেকে অন্যত্র নেয়ার আগেই নাসিমার মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে তাদের লিখিতভাবে মীমাংসা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ডা: দেওয়ান মো: আব্দুস সবুর বলেন, ‘তিনি প্রায় পাঁচ বছর ধরে অস্ত্রোপচার করছেন। রোগীর কাগজপত্র ও পরীক্ষার রিপোর্ট দেখেই অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।’
অস্ত্রোপচারের আগে হিমোগ্লোবিন সাত দশমিক চার থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অস্ত্রোপচারের সময় রোগীকে এক ব্যাগ রক্ত দেয়া হয়েছিল।’
আল মদিনা ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক মো: আমিনুর রহমান মন্ডল জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একজন মেডিক্যাল অফিসার দিয়ে অ্যানেস্থেসিয়া ও অস্ত্রোপচার করানো হয়েছে। রোগীর কাগজপত্র দেখেই চিকিৎসক অস্ত্রোপচার করেছেন। বিষয়টি চিকিৎসকই ভালো বলতে পারবেন।
রোগীর মৃত্যুর পর তার স্বজনদের সাথে লিখিতভাবে মীমাংসা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সিভিল সার্জন ডা: মো: আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘বিভিন্ন অভিযোগের কারণে এর আগেও ওই ক্লিনিক বন্ধ করা হয়েছিল। রোগীর মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পেরে তিনি হাসপাতালটি সীলগালা করেন এবং বিষয়টি তদন্তের জন্য তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন।’
তদন্ত প্রতিবেদন পেলে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
এ সময় তার সাথে ছিলেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: মো: খুরশিদুল ইসলাম, আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার মো: ইমরুল কায়েশ প্রমুখ।



