জ্যৈষ্ঠজুড়ে শ্রীমঙ্গলে আনারসের সুবাস

চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৪২৫ হেক্টর জমিতে হানিকুইন, জায়ান্ট কিউ ও এমডি-২ জাতের আনারসের চাষ হয়েছে। এসব বাগান থেকে মোট ছয় হাজার ৮২১ টন আনারস উৎপাদিত হয়েছে, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ১২ দশমিক ৪২ কোটি টাকা।

এম এ রকিব, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)

Location :

Sreemangal
আনারসের সুবাসে মৌ মৌ করছে শ্রীমঙ্গল
আনারসের সুবাসে মৌ মৌ করছে শ্রীমঙ্গল |নয়া দিগন্ত

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে এখন জ্যৈষ্ঠ মাস মানেই চারদিকে রসালো আনারসের মিষ্টি সুবাস। শহরের বাজার থেকে শুরু করে গ্রামের হাট সবখানেই চোখে পড়ছে পাহাড়ি বাগানের টাটকা আনারস। ভোরের আলো ফোটার আগেই উপজেলার বিভিন্ন টিলা ও পাহাড়ি এলাকা থেকে চাষিরা ঠেলাগাড়ি, অটোরিকশা, জিপ ও পিকআপভ্যানে করে বাজারে নিয়ে আসছেন মৌসুমি এই জনপ্রিয় ফল। বাম্পার ফলন আর জমজমাট বেচাকেনায় খুশি চাষি, আড়ৎদার ও পাইকাররা।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৪২৫ হেক্টর জমিতে হানিকুইন, জায়ান্ট কিউ ও এমডি-২ জাতের আনারসের চাষ হয়েছে। এসব বাগান থেকে মোট ছয় হাজার ৮২১ টন আনারস উৎপাদিত হয়েছে, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ১২ দশমিক ৪২ কোটি টাকা।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ৩৯১ হেক্টর জমিতে হানিকুইন জাতের আনারস চাষ করে উৎপাদন হয়েছে ছয় হাজার ২৫৬ টন। এছাড়া ৩০ হেক্টর জমিতে জায়ান্ট কিউ জাতের আনারস উৎপাদন হয়েছে ৪৯৭ টন এবং ৪ হেক্টর জমিতে এমডি-২ জাতের আনারস উৎপাদিত হয়েছে ৬৮ টন।

লেবু ও চায়ের পাশাপাশি শ্রীমঙ্গলের আনারসেরও রয়েছে দেশজুড়ে বিশেষ খ্যাতি। উপজেলার মোহাজেরাবাদ, বিষামণি, হোসেনাবাদ, বালিশিরা, ডলুছড়া, সাতগাঁও, নন্দরানী, সিন্দুরখান, রাজঘাট, কালিঘাট, মির্জাপুর ও মাইজদিহিসহ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় ব্যাপকভাবে আনারসের চাষ হয়। অনুকূল আবহাওয়া ও উর্বর মাটির কারণে এখানকার আনারস স্বাদ ও গুণে আলাদা পরিচিতি পেয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, ষাটের দশক থেকে শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ি টিলাগুলোতে আনারসের চাষ হয়ে আসছে। এখানকার উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু আনারস উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পাইকাররা সারা বছরই এখান থেকে আনারস সংগ্রহ করে নিয়ে যান।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পুরান বাজার ও নতুন বাজার এলাকায় ঠেলাগাড়িতে সারি সারি সাজিয়ে রাখা হয়েছে আনারস। আকর্ষণীয়ভাবে সাজানো এসব আনারস সহজেই ক্রেতাদের দৃষ্টি কাড়ছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাজারে চলছে কেনাবেচার ব্যস্ততা।

বিক্রেতারা জানায়, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ, শায়েস্তাগঞ্জ, মিরপুর, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও সিলেট বিভাগের নানা এলাকা থেকে পাইকাররা শ্রীমঙ্গলে এসে আনারস কিনে নিয়ে যান। এছাড়া মৌসুমি ব্যবসায়ীরাও এখান থেকে আনারস সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করেন।

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ থেকে আনারস কিনতে আসা অসীম দাস জানান, তিনি ১১০টি আনারস চার হাজার ৪০০ টাকায় কিনেছেন। প্রতি পিসের দাম পড়েছে ৪০ টাকা। নিজ এলাকায় নিয়ে তিনি সেগুলো ৫০ থেকে ৫৫ টাকা দরে বিক্রি করবেন।

এর কম দামে বিক্রি করলে পরিবহন ও অন্যান্য খরচ ওঠানো কঠিন হবে বলে জানান তিনি।

আনারস চাষি জসিম মিয়া জানান, তিনি দেশি জাতের টক-মিষ্টি স্বাদের আনারস চাষ করেছেন। বাজারে আনা এক ঠেলাগাড়ি আনারস নিলামের মাধ্যমে তিন হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি করেছেন। তবে পরিবহন বাবদ তার ২৭০ টাকা খরচ হয়েছে।

খুচরা বিক্রেতা সাজান মিয়া জানান, বড় আকারের আনারস প্রতি হালি (চারটি) ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়, মাঝারি আকারের হালি ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় এবং ছোট আকারের আনারস ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

শ্রীমঙ্গল নতুনবাজারের আড়ৎদার আশিক মিয়া জানান, উপজেলায় প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ নিবন্ধিত পাইকার রয়েছেন। চাষিদের কাছ থেকে নিলামের মাধ্যমে আনারস কিনে তারা পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন। প্রতি ঠেলাগাড়ি আনারস বিক্রিতে আড়ৎদারদের কমিশন থাকে ১০০ টাকা। প্রতিদিন তাদের আড়ৎ থেকে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকার আনারসসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য বিক্রি হয়।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা উজ্জ্বল সূত্রধর নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘আনারসের উৎপাদন বাড়াতে কৃষি বিভাগ নিয়মিত চাষিদের প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করেছে। এর ফলে এ বছর আনারসের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।’

তবে বাম্পার ফলনের মধ্যেও চাষিদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বন্য প্রাণীর উপদ্রব। চাষিদের অভিযোগ, পাহাড়ি বাগানগুলোতে আনারস পরিপক্ব হওয়ার আগেই বানর, বন্য শূকরসহ বিভিন্ন প্রাণী ফল নষ্ট করে দেয়। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের কারণে এসব প্রাণীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব না হওয়ায় অনেক চাষি আনারসের পরিবর্তে লেবু চাষে ঝুঁকছেন।

তাদের মতে, লেবু টক হওয়ায় বন্য প্রাণীরা সাধারণত তা নষ্ট করে না।

তবু সব প্রতিকূলতা পেছনে ফেলে এ বছরের বাম্পার ফলন ও ভালো বাজারদর শ্রীমঙ্গলের আনারস চাষিদের মুখে ফিরিয়েছে স্বস্তির হাসি। পাহাড়ঘেরা জনপদজুড়ে এখন তাই আনারসের সুবাসের সাথে মিশে আছে সফলতার গল্পও।