রংপুর মহানগরীতে নিজ বাড়ি থেকে স্কুলশিক্ষক (অবসরপ্রাপ্ত) গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলসহ তার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের লাশ উদ্ধারের ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ।
মহানগর পুলিশ কমিশনারের দাবি, ইয়াবা সেবনের সময় দেখে ফেলায় পরপর তাদের হত্যা করে দুই মাদকসেবী। পরে স্বর্ণালঙ্কার লুট করে নিয়ে যায়। হত্যাকাণ্ডের পর ভুক্তভোগীর বাড়িতে গোসল করে খুনিরা। পরে বয়ামে রাখা খেজুর খাওয়ার পর ইয়াবা সেবন করে।
রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে ব্রিফিং করেন মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ।
ব্রিফিংয়ে পুলিশ কমিশনার দাবি করেন, ঘটনার সাথে সাথেই আমাদের পুলিশের সকল সংস্থা, গোয়েন্দা সংস্থা, মিডিয়াকর্মী, সমাজকর্মী সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অল্প সময়ের মধ্যে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছি। গণপতি চক্রবর্তী ছিলেন একজন সম্মানিত ব্যক্তি। কারো সাথে কোনো কলহ-বিবাদ কিছু ছিল না। ওই এলাকার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেফতারের মাধ্যমেই স্পষ্ট হয় ঘটনার মোটিভ।
গ্রেফতার হওয়া দু’জনকে জিজ্ঞাসাবাদ ও বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের মাধ্যমে পুলিশ কমিশনার ঘটনার বর্ণনা দেন ব্রিফিংয়ে। তিনি দাবি করেন, বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দিবাগত শেষ রাতে পার্শ্ববর্তী দেবু চক্রবর্তীর বাসার ছাদ দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে যায় মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ। ওই ছাদে বসে তারা আড্ডা মারে এবং ইয়াবা সেবন করে।
ইয়াবা সেবনকালে গণপতি চক্রবর্তী শব্দ শুনে ছাদে যান। তিনি সে সময় খালি গায়ে ছিলেন, কাঁধে একটা গামছা ছিল। তিনি সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাসকে ছাদে বসে আড্ডা দেয়া এবং মাদক সেবনের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তারা ভয় পায়। আসামিরা তাদের পরিচয় প্রকাশ হওয়ার ভয়ে তাৎক্ষণিকভাবে গণপতি চক্রবর্তীর গলায় যে গামছাটা ছিল, সেই গামছা দিয়ে পেঁচিয়ে উনাকে সেখানে হত্যা করে।
কমিশনার আরো দাবি করেন, গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করার সময় তিনি বাঁচার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন এবং কিছু শব্দ হয়। শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ওরফে বোলা বাসারি নিচে থেকে উপরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। উপরে যাওয়ার সময় খুনি দু’জন তাকে সিঁড়ির মধ্যে গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করে।
পরে গণপতি চক্রবর্তীর ছেলে ও মেয়ের হত্যার বর্ণনা দিতে গিয়ে আবেগাল্পুত হয়ে পড়েন পুলিশ কমিশনার। তিনি বলেন, প্রীতিলতা চক্রবর্তীর চিৎকার-চেঁচামেচিতে উনার মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী এগিয়ে আসে। এ সময় তারা প্রার্থী চক্রবর্তীকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করে।
খুনিদের বক্তব্যে আমি যেটা শুনলাম, প্রার্থী চক্রবর্তী মারা যাচ্ছিল না। চার-পাঁচ মিনিট লাগে তার প্রাণ যাওয়ার ক্ষেত্রে। সেই সময়ে তারা রশি দিয়ে তার গলায় এবং মুখে পেঁচিয়ে ধরে। একটা প্যাঁচ গলার উপর দিয়ে যায়, একটা প্যাঁচ মুখের উপর দিয়ে যায়। তারা এত জোরে এই রশিটা টান দেয়, তার মুখের চোয়াল ভেঙে যায় এবং চোখটা ঠিকরে বের হয়ে যায়।
পুলিশ কমিশনার বলেন, প্রার্থী চকবর্তীকে মারার পরে খুনিরা নিচে যায়। নিচে গিয়ে ছোট ছেলে প্রিয়মকে হত্যা করে।
এ সময় বর্ণনা দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন পুলিশ কমিশনার। তিনি বলেন, প্রিয়ম নামে ছোট ছেলেটাকে মারার কারণ হলো সিদ্ধার্থের একটা ছোট ভাই আছে অপূর্ব। অপূর্ব এই খুন হওয়া নিষ্পাপ শিশু প্রিয়ের সাথে খেলাধুলা করে এবং প্রিয়ম এই খুনিদেরকে চেনে। তখন সিদ্ধার্থ সিদ্ধান্ত নেয় যে প্রিয়মকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেবে। না দিলে সে তাদের পরিচয় বলে দিতে পারে। পরে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দু’জনে একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিষ্পাপ শিশুর ওপর। কাপড় পেঁচিয়ে হত্যা করে, তার চোখ ঠিকরে বের হয়ে যায়। এরপরে বালিশ চাপা দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে।
পুলিশ কমিশনার বলেন, শুধু খুন করেই খুনিরা ক্ষান্ত হয়নি। পরে তারা ওই বাসায় প্রিয়মের বাথরুমে গোসল করে। প্রথমে সিদ্ধার্থ গোসল করে। সিদ্ধার্থ বের হওয়ার পরে মুগ্ধ গোসল করে। গোসল করার পরে তাদের ডাইনিং টেবিলে বসে তারা খেজুর খায়। সেখানে একটা বয়ামে খেজুর ছিল।
খেজুর খাওয়ার পরে তাদের কাছে এক পিস ইয়াবা ছিল। তারা ডাইনিং টেবিলে বসে সেটি সেবন করে। ইয়াবার আলামত আমরা পেয়েছি। ইয়াবা সেবনের পরে সকাল হয়ে যায়। জুমার দিন ছিল। তারা অপেক্ষা করতে থাকে বাইরে লোকজন যেন কমে যায়।
পুলিশ কমিশনার বলেন, যখন জুমার নামাজের সময় হয়, তখন মুসল্লিরা নামাজে ব্যস্ত ছিল, রাস্তাঘাট ফাঁকা ছিল। এ সময় দু’জন বাসা থেকে বের হয়ে যায়। বাসা থেকে বের হওয়ার আগে তারা লুট করে নিয়ে যায় বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার।
সিদ্ধার্থ একটা স্বর্ণের দোকানের কারিগর। পি কে পাল জুয়েলার্সে আট বছর ধরে স্বর্ণের কাজ করছে সিদ্ধার্থ। কাজেই সে কোনটা স্বর্ণ, কোনটা ইমিটেশন তা ভালো করে চেনে। সে কারণে একটা স্বর্ণের চুরি সে আগুন দিয়ে পরীক্ষা করে।
আমরা যখন কালকে আলামতটা পেলাম যে, একটা স্বর্ণের চুরি পরীক্ষা করার জন্য আগুন দিয়ে টেস্ট করা হয়েছিল। তখন আমরা অনুমান করেছিলাম স্বর্ণের কাজে অভিজ্ঞ হয়তো কেউ থাকতে পারে। আমাদের সে অনুমানটা সঠিক হয়, সিদ্ধার্থ স্বর্ণের কাজে অভিজ্ঞ।
তিনি বলেন, পুলিশ যেন ঘটনাটিকে ডাকাতি বলে মনে করে সেজন্য তারা ইচ্ছাকৃতভাবে জিনিসপত্র এলোমেলো করে। অর্থাৎ তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে এটা করে।
দুপুরের দিকে তারা বের হয়ে যাওয়ার আগে বাসায় থাকা দুইটা মোবাইলফোন ডিটারজেন্ট দিয়ে বালতিতে ভিজিয়ে রাখে। ফোনে যেন কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট না থাকে, সেই উদ্দেশ্যে তারা এটা পানিতে ভিজিয়ে রাখে। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে, অর্থাৎ শুক্রবার (২১ আগস্ট) ভোররাত থেকে শুরু হয়ে এই ঘটনাটা তারা সারাদিন ঘটায়।
তিনি আরো বলেন, আমরা কিছু স্বর্ণালঙ্কার ওদের দেখানো মতে উদ্ধার করেছি, যেগুলা তারা নিয়ে যায়। সেগুলো ওরা মন্দিরের পেছনে একটা পরিত্যক্ত জায়গায় রেখে দিয়েছিল। তাদের দেখানো মতে আজকে ওই জায়গা থেকে আলামতগুলা জব্দ করা হয়েছে।
পুলিশ কমিশনার বলেন, মুগ্ধর মামাতো ভাইয়ের ছেলে সিদ্ধার্থ, অর্থাৎ তারা দু’জনই আত্মীয়। এই ঘটনা ঘটানোর আগে তারা একটা বাসায় বসে ইয়াবা সেবন করে, সেটা হলো সীমান্তের বাসায়। সীমান্ত খুনের সাথে ছিল না, কিন্তু সীমান্তের বাসায় তারা বসে ইয়াবা সেবন করে। ইয়াবা সেবন করার পরে তারা এই বাসার ছাদে এসে ইয়াবা সেবন করে।
সিটি বাজারের রামনাথের মাছের দোকানে মুগ্ধর বাসার সামনে খুশি ওরফে প্রশান্ত নামে একজন ইয়াবা ব্যবসায়ীর নাম পাওয়া গেছে। যে ইয়াবা ব্যবসা করে এবং তার থেকে ইয়াবা কিনে নেয় খুনিরা। প্রতি পিস ৩৫০ টাকা ধরে তারা ইয়াবা ক্রয় করে।
তিনি বলেন, এরপরও আরো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তদন্ত কার্যক্রম এগোনো হচ্ছে। নতুন কোনো কিছু থাকলে তা ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে জানানো হবে।
এদিকে এ ঘটনার বিচার দাবি করে রোববার দুপুরে মানববন্ধন করেছে রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। তারা পুলিশ কমিশনারের কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছে। একই দাবিতে মানববন্ধন করেছে কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থীরাও।
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) ভোররাতে নগরীর মাছুয়াপাড়ায় তালাবদ্ধ নিজ বাড়িতে খুন হন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে কারমাইকেল কলেজ থেকে ইংরেজি বিভাগের সদ্য মাস্টার্স পাশ করা প্রার্থী চক্রবর্তী ও ছেলে জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া প্রিয়ম চক্রবর্তী। অবসরে যাওয়ার পর নগরীর সমবায় মার্কেটে চেম্বার দিয়ে হোমিও চিকিৎসার প্রাকটিস করতেন গণপতি চক্রবর্তী।
শনিবার (২২ আগস্ট) রাত ১১টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে মাছুয়া পাড়ার মন্দিরের পাশে গণপতি চক্রবর্তীর তালাবদ্ধ দোতলা বাড়ি থেকে তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ সময় গণপতি চক্রবর্তীর (৬৫) লাশ দোতলার ছাদ থেকে, সিঁড়ির চিলেকোঠার নিচ থেকে স্ত্রী প্রীতিলতা বোলা চক্রবর্তী (৫৫) ও মেয়ে প্রার্থী ওরফে আগামী চক্রবর্তীর লাশ (২৫) এবং ঘরের খাটের নিচ থেকে ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর (১২) লাশ উদ্ধার করা হয়। তাদের গ্রামের বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর এলাকায়।
নিহত প্রীতিলতার বোন পূজা চক্রবর্তী বলেন, সবশেষ বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দিবাগত রাত দেড়টার দিকে বড় বোন প্রীতিলতা চক্রবর্তীর সাথে ফোনে কথা হয়েছিল। কিন্তু শনিবার (২২ আগস্ট) রাত পৌনে ৯টার দিকে দিদিকে ফোন দিলে বন্ধ পাই। পরপর জামাই বাবু, ভাগনি ও ভাগনেকে ফোন দেই। কিন্তু সবার ফোন বন্ধ থাকায় স্বামীকে নিয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে মাছুয়াপাড়ার দিদির বাড়িতে যাই।
তিনি আরো বলেন, সেখানে গিয়ে দেখি প্রধান ফটক তালাবদ্ধ। আশপাশের লোকজনকে জিজ্ঞাসা করি, তারাও কিছুই বলতে পারে না। পরে পাশের তিনতলা দেবুদার বাসায় নক করি। তারা গেট খুলে দিলে ভেতর দিয়ে দিদির বাড়িতে ঢুকে দেখি সব এলোমেলো। আলমিরাসহ সব আসবাবপত্র খোলা। মেঝেতে ছড়ানো-ছিটানো সবকিছু। সাথে সাথে আমার স্বামী বিপুল আচার্য্যকে থানায় পাঠাই।
নিহত গণপতি চক্রবর্তীর ভায়রা বিপুল আচার্য্য জানান, প্রথমে আমি ৯৯৯-এ ফোন করি। তারা আমাকে পরামর্শ দেন কোতোয়ালী থানায় যাওয়ার। পরে কোতোয়ালী থানায় গেলে পুলিশ, সিআইডি, পিবিআইসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন শাখার সদস্যরা আসেন। তারা সিল করে ফেলেন পুরো বাড়ি। এরপর বাসায় ছাদে ওঠার সিড়ির চিলেকোঠার নিচে মা প্রীতিলতা আর মেয়ে প্রার্থী ওরফে আগামী চক্রবর্তী, ছাদে উঠার দরজার বাম পাশে গণপতি চক্রবর্তী এবং দোতলার খাটের নিচে প্রিয়মের লাশ শনাক্ত করা হয়। এ সময় মশারি টানানো ছিল গণপতির বিছানায়। হয়তো শোয়ার প্রস্তুতি ছিল তার। পাশের টেবিলে ছিল প্রিয়মের স্কুলের আইডি কার্ড।
রাতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত রংপুর মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী বলেন, প্রত্যেকটি লাশের গলায় আঘাতের চিহ্ন আছে, এটা আসলে সুরতহাল রিপোর্ট এলে তখন বোঝা যাবে। তবে আমরা প্রাথমিকভাবে যেটা দেখেছি, সবাইকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে। সবার মুখের মধ্যে গামছা বা নাইলনের দড়ি পেঁচানো ছিল।
মহানগর কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল কাদির জানান, এ ঘটনায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপিনাথ চক্রবর্তী অজ্ঞাত পরিচয় আসামিদের নামে মামলা দায়ের করেছেন।



