ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার রানাপাশা ইউনিয়নের ইসলামাবাদ গ্রাম উপজেলা মানচিত্রের এক বিচ্ছিন্ন জনপদ। এক সময়ের জনবহুল ও সমৃদ্ধ এই গ্রামটি বিষখালী ও গজালিয়া নদীর অব্যাহত ভাঙনে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এখন একটি দ্বীপে পরিণত হয়েছে। চারদিকে নদীর উত্তাল পানি, ভাঙনের অব্যাহত আতঙ্ক আর নিত্যদিনের দুর্ভোগ নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন গ্রামের পানিবন্ধী ৪৫টি পরিবারের মানুষ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা নদীভাঙনে গ্রামের বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, বসতভিটা, গাছপালা ও নানা স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অনেক পরিবার একাধিকবার ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। সামর্থ্যবানরা অন্যত্র আশ্রয় নিলেও অসহায় ও দরিদ্র পরিবারগুলো এখনো জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষক মো: কাইয়ুম বাদশা জানান, ২০১৬ সালে বিষখালী ও গজালিয়া নদীর ভয়াবহ ভাঙনের পর ইসলামাবাদ গ্রামটি সম্পূর্ণভাবে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বর্তমানে নৌকা ও ট্রলার ছাড়া এ গ্রামে যাতায়াতের কোনো ব্যবস্থা নেই।
ওই এলাকার বাসিন্দা ঢাকায় গণমাধ্যমে কর্মরত মো: নুরুল ইসলাম রকি খান বলেন, ‘প্রতিদিনই নদী একটু একটু করে গ্রামটিকে গিলে খাচ্ছে। একসময় যে গ্রামে শতাধিক শিক্ষার্থী নিয়ে প্রাণচঞ্চল পরিবেশ ছিল, সেখানে এখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৪০ জনে। যাতায়াতের দুর্ভোগ, নিরাপত্তাহীনতা এবং সুযোগ-সুবিধার অভাবে মানুষ এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। যারা রয়ে গেছে, তারা প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।’
গ্রামটিতে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও জরুরি সেবার সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নিতে কিংবা শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে নদীপথই একমাত্র ভরসা। বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ঝড়-জলোচ্ছ্বাস বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়াও হয়ে পড়ে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।
এদিকে, নদীভাঙন রোধে সরকারি উদ্যোগের সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এ কে এম নিলয় পাশা বলেন, ‘ইসলামাবাদ বর্তমানে নদীর মূল তীররেখার বাইরে, নদীর মধ্যবর্তী একটি দ্বীপসদৃশ এলাকায় অবস্থান করছে। বিদ্যমান সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ড মূলত নদীতীর সংরক্ষণ ও সুরক্ষার কাজ করে থাকে। ফলে এ ধরনের বিচ্ছিন্ন এলাকায় সরাসরি ভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্প গ্রহণে কিছু আইনি ও কারিগরি সীমাবদ্ধতা রয়েছে।’
তবে তিনি জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্যের ডিও লেটার (আধা-সরকারি পত্র) এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুমোদন সাপেক্ষে বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় নেয়ার সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, নলছিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) রিজবী আহমেদ সবুজ বলেন, ‘ইসলামাবাদ গ্রামের মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ও বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠির নিরাপত্তা এবং মানবিক সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে কাজ করা হচ্ছে।’
স্থানীয়দের দাবি, ইসলামাবাদ গ্রামকে রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর নদীশাসন, টেকসই ভাঙন প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হোক। অন্যথায় অচিরেই ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়ে পুরো গ্রামটি নদীগর্ভে হারিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
দ্বীপে পরিণত হওয়া ইসলামাবাদের মানুষের একটাই প্রশ্ন— রাষ্ট্রের উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় তাদের এই বিচ্ছিন্ন জনপদের মানুষগুলো কি আদৌ কোনোদিন নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা পাবে?



