আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (রহ.)-কে স্মরণ করে আবেগঘন পোস্ট করেছেন তার মেজো ছেলে শামীম সাঈদী। তিনি পিরোজপুর-২ (ভান্ডারিয়া, কাউখালী ও নেছারাবাদ) আসনের জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী ছিলেন।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দিনগত রাত ২টায় ফেসবুকে শামীম সাঈদী এ পোস্ট দেন।
শুক্রবার জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নায়েবে আমির, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী চিন্তাবিদ ও বিশিষ্ট মুফাসসিরে কোরআন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর (রহ.) ৩য় শাহাদাতবার্ষিকী।
৩ বছর আগে আজকের এই দিনে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার আল্লামা সাঈদীকে শহীদ করেছিল।
নিচে বাবাকে নিয়ে ছেলে শামীম সাঈদীর ফেসবুকে লেখা পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো—
এ যুগের মুজাদ্দিদ, কোরআনের পাখি, শহীদ আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী রহ.
رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
আজ তিন বছর হয়ে গেল, অথচ মনে হয়, যেন সেদিনই আপনি আমার মাথায় হাত রেখে বলছেন: ‘আব্বু, কেমন আছো?’
তিন বছর ধরে পৃথিবীটা আমার কাছে বড় অদ্ভুত, বড় বেশি নীরব। বড্ড কঠিন, চারপাশে সবকিছু আছে, মানুষ আছে, কোলাহল আছে, হাসি আছে, শুধু আপনি নেই। আর শুধু আব্বা ডাকার কেউ নেই বলে—আমাকে সান্ত্বনা দেয়ারও কেউ নেই। পৃথিবীটা যেমন গোল, তেমনই শূন্য। যে বটবৃক্ষের ছায়ায়, আদরে, মমতায় আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে, যে মানুষটির উপস্থিতি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ছিল, তিনি আজ দৃষ্টির আড়ালে।
রাতে বিছানায় শুয়ে যখন চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে যায়, তখন সবচেয়ে বেশি আপনার অভাব অনুভব করি। ইদানীং ঘুম আসেই না। বারবার মনে পড়ে—জেলখানায় সাক্ষাৎ শেষে আপনার সেই দরদমাখা কণ্ঠস্বর, ‘কীভাবে সংসার চালাও? কিছু লাগবে?’ আজ অনেক মানুষ খোঁজ নেয়, কিন্তু আপনার মতো করে কেউ জিজ্ঞেস করে না, কারণ খোঁজ নেয়া আর মায়া দিয়ে আগলে রাখা দুটো এক জিনিস নয়।
জীবনে কোনো সুখবর এলে আজও মনে হয়, সবার আগে আপনাকেই বলি। কোনো ছোট অর্জন, কোনো আনন্দ, কোনো সফলতা, ব্যর্থতা, শত্রুতা, ষড়যন্ত্রের কথা—সবকিছু নিয়ে ছুটে যেতে ইচ্ছে করে আপনার কাছে। কিন্তু হঠাৎ মনে পড়ে, আপনি তো আর এই পৃথিবীর ঠিকানায় নেই। বুকের ভেতরটা তখন কেমন হাহাকার করে ওঠে।
আজ আপনার নাতি-নাতনিরা বাসার চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। তাদের হাসি দেখি, তাদের দুষ্টুমি দেখি, আর আপনাকে খুঁজি। ভাবি, আপনি থাকলে হয়তো তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন, ভুল করলে শাসন করতেন, আবার একটু পরই বুকে টেনে নিতেন। দোয়া করতেন। আপনার শাসনের ভেতরেও ছিল মমতা, আপনার কঠোরতার ভেতরেও ছিল অফুরন্ত ভালোবাসা।
আমি নিজেও একজন বাবা, কিন্তু যতই চেষ্টা করি, বারবার মনে হয়, আমি আপনার মতো করে ছেলে-মেয়েকে আদর করতে পারি না। হয়তো কখনো পারবও না। সন্তানদের ভালোবাসি, তাদের জন্য ভাবি, তবুও আপনার সেই ব্যক্তিত্ব, সেই ধৈর্য, সেই দায়িত্ববোধ আর সেই নিবিড় ভালোবাসার কাছে নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়।
কয়েক দিন আগে হঠাৎ অনেক পুরোনো একটি স্মৃতি মনে পড়ল। হয়তো ১৯৯৮ কিংবা ১৯৯৯ সাল। আপনার মেরুন রঙের প্রাডো গাড়িতে করে আমরা পিরোজপুর যাচ্ছি। ড্রাইভার জাহাঙ্গীর গাড়ি চালাচ্ছে। আর আমি আর আপনি পেছনের সিটে বসা। সামনের সিটে সম্ভবত রাফে ভাই। গাড়িতে উঠলে আমার ঘুম আসে, যথারীতি আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। আপনার কোলে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে শুয়ে আছি। গাড়ির ক্যাসেট প্লেয়ারে আপনার প্রিয় গজলের সুর ভেসে আসছে। আপনার সেই খয়েরি মোটা ফ্রেমের চশমার আড়ালে লুকানো প্রশান্ত চোখ দুটি আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন।
সেদিন বুঝিনি, কিন্তু আজ বুঝি, আপনার কোলের সেই উষ্ণতাই ছিল আমার পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। পৃথিবীর কোনো প্রাসাদ, কোনো সম্পদ, কোনো অর্জন সেই নিরাপত্তার অনুভূতি আমাকে আর কখনো দিতে পারেনি, পারবে না।
আব্বা, খুব ইচ্ছে করে আপনাকে একবার দেখি। স্বপ্নে দেখা দেন, একবার শুধু আপনার হাতটা ছুঁয়ে বলি, ‘আমি এখনো আপনার সেই ছোট্ট ছেলে হয়েই আছি।’ খুব ইচ্ছে করে দূর আকাশের ওপার থেকে একবার আপনার সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনি, ‘আব্বু!’
জানি, তা আর হবে না। তবুও মন মানতে চায় না। সন্তান যতই বড় হোক, বাবার কাছে সে চিরকালই ছোট্ট শিশু হয়ে থাকে। আর বাবা চলে গেলে সেই শিশুটার ভেতরে এক শূন্যতা জন্ম নেয়, যা কখনো পূরণ হয় না।
আজ তিন বছর পরও আপনার জন্য চোখ ভিজে যায়। প্রতিদিন অশ্রু ফেলে দোয়া করি। আমি পাপী বান্দা, আমার দোয়া কি কবুল হয়?
মানুষের ভিড়ের মাঝেও নিজেকে এত একা লাগে যে ভাষায় প্রকাশ করতে পারি না। ভীষণ একা লাগে। আসলেই আমার কেউ নেই। আমি যে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলতে পারি না, আমি তো তেলাইতে পারি না। আপনি যে বলতেন: এত স্পষ্টবাদী আর সরল বিশ্বাস ভালো নয়। এখন ওইটা আমার কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আপনার রেখে যাওয়া স্মৃতিগুলোই এখন আমার বেঁচে থাকার অবলম্বন।
জীবনে আর কিছু চাই না, শুধু আপনার নসিহত অনুযায়ী আপনার স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বদরবারে দাঁড় করিয়ে দিতে চাই।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা যেন দয়া করে, করুণা করে আপনার স্বপ্নগুলো আমাকে দিয়ে বাস্তবায়ন করান, আমিন।
আল্লাহ তায়ালা আপনাকে তার অসীম রহমত ও মাগফিরাতের ছায়ায় রাখুন। দুনিয়ার মানুষ আপনাকে কুরআনের পাখি বলে, আল্লাহ তায়ালা আপনাকে জান্নাতুল ফেরদাউসে সবুজ পাখি হিসেবে কবুল করুন, জান্নাতে বায়তুল হামদে স্থায়ী ঠিকানা বানিয়ে দিন, আমিন।
اللّٰهُمَّ اغْفِرْ لِأَبِي وَارْحَمْهُ وَاجْعَلْ قَبْرَهُ رَوْضَةً مِنْ رِيَاضِ الْجَنَّةِ.🤲🏻💔


